হাসিনাকে ফেরত চাইল বাংলাদেশ

ব্যাংককে ইউনূস-মোদি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition
ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক : পিআইডি
ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক : পিআইডি
  • সীমান্ত হত্যা বন্ধ
  • তিস্তা চুক্তি সইয়ের তাগিদ

ভারতের আশ্রয়ে থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়া তিনি শেখ হাসিনাকে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত রাখা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই করার তাগিদ দিয়েছেন।

গতকাল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা এসব ইস্যুতে তাগিদ দেন। ব্যাংককের সাংরিলা হোটেলে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রসচিব জসীম উদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে ভারতের পক্ষে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ছিলেন। গত বছর আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এটিই দুই প্রতিবেশী দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রথম বৈঠক।

বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের জানান, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হয়েছে। এতে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো নিয়ে কথা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারতের আশ্রয়ে থেকে তার উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া, সীমান্ত হত্যা, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই করা নিয়ে কথা বলেছেন। বিমসটেকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস সাত সদস্য দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির জন্য ভারতের সমর্থন চান। ৪০ মিনিটের বৈঠকটি খুবই গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় অধ্যাপক ইউনূসকে অভিনন্দন এবং ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে না। মোদি বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে’।

প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ১০২তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে অধ্যাপক ইউনূসকে স্বর্ণপদক প্রদান করেছিলেন। সেই মুহূর্তটি ধারণ করা একটি ছবি এদিন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন প্রধান উপদেষ্টা।

এ ছাড়া শীর্ষ বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে উভয় নেতা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা সার্বভৌমত্ব, সমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যার ঘটনাগুলোর ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম ও সীমান্ত হত্যা বন্ধের জন্য উভয় পক্ষ সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনায় চরমপন্থা ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ইস্যুটিও উঠে আসে। এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোপাগান্ডাগুলোর যথার্থতা পরীক্ষার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সব নাগরিকের সুরক্ষা দেয়ার ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিক্রম মিশ্রির ব্রিফিং : বৈঠকের পর ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি সাংবাদিকদের বলেন, ড. ইউনূসের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। এ সময় মোদি হিন্দুসহ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়টি উত্থাপন করেন। এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

বিক্রম মিশ্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রগতিশীল, শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি অধ্যাপক ইউনূসকে বাংলাদেশের সাথে ভারতের ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক তৈরির আকাক্সক্ষার কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, ভারত এই সম্পর্ককে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে চায়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ফলে উভয় দেশের মানুষই এর সুফল পেয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো জরুরি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিয়ে ভারতের চিন্তার বিষয়টি উত্থাপন করে তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাগুলো তদন্তের অনুরোধ করেন। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার উত্তর-পূর্ব ভারত নিয়ে মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলে এমন কথাবার্তা এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক পত্র দিয়েছে। তবে হাসিনার প্রত্যর্পণের ব্যাপারে এ মুহূর্তে এরচেয়ে বেশি বলা ঠিক হবে না।

মোদির টুইট : প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বৈঠকের পর এক টুইট (এক্স) বার্তায় নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। ভারত বাংলাদেশের সাথে একটি গঠনমূলক ও জনকেন্দ্রিক সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা রোধের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য আমাদের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ওই সময় থেকেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আসছে দিল্লি। অপরদিকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে ফেরত চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ ব্যাপারে শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।

এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, বাংলাদেশের সাথে চীনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার প্রতি ভারত সতর্ক নজর রাখছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে শীতলতা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবরে ভারত উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে ঢাকা জোর দিয়ে বলেছে, সংখ্যালঘু ইস্যুটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো নিয়ে ড. ইউনূসের সাম্প্রতিক এক মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। চীন সফরের সময় একটি ভিডিওতে ড. ইউনূসকে বলতে শোনা যায়, ভারতের সাতটি রাজ্য, যাদের সেভেন সিস্টার্স বলা হয়, তারা মূলত স্থলবেষ্টিত। তাদের সমুদ্রে যাওয়ার কোনো পথ নেই। বাংলাদেশই তাদের জন্য সমুদ্রের দরজা খুলে দিতে পারে। এটি চীনের অর্থনীতির জন্য বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, বাংলাদেশের নেতার এই বক্তব্য আপত্তিকর ও নিন্দনীয়। এটি ভারতের কৌশলগত ‘চিকেন নেক’ করিডোরকে নাজুক অবস্থানে ফেলার চেষ্টা। তিনি উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে ভারতের মূল ভূখণ্ডের আরো শক্তিশালী রেল ও সড়ক সংযোগ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

এদিকে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ড. ইউনূস থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সাথেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন।