আদালতে বিচারাধীন মামলার পাহাড়

দীর্ঘসূত্রতা আসলে বিচারহীনতাই

Printed Edition

আমাদের দেশে কেউ একবার মামলার জালে জড়ালে তার আর রক্ষা নেই। কবে এ থেকে মুক্তি মিলবে, কবে বিচারপ্রার্থীরা স্বল্পতম সময়ে দ্রুত বিচার পাবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাদি-বিবাদি উভয়পক্ষের বেলায় বাস্তবতা একই। তবে গত সাড়ে ১৫ বছরে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অপব্যবহার করে ভিন্নমত দমনে গণহারে মামলা দিয়ে যে অনাচার করা হয়েছে, তা ছিল নজিরবিহীন। মূলত ফ্যাসিবাদী সরকার আদালত, পুলিশ ও প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া মামলার মাধ্যমে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। এটি ছিল শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার মোক্ষম হাতিয়ার। বিশেষ করে দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে হাজারো বিরোধী নেতাকর্মীকে ভুয়া মামলায় জেলে পোরা হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ফ্যাসিবাদবিরোধী অনেক গুণী ব্যক্তিও জেল-জুলুম থেকে রেহাই পাননি।

লক্ষণীয়, গত দেড় দশকে বিরোধী দলের একেকজন নেতাকর্মীর নামে শতাধিক মামলা ঠুকে দেয়া হয়। হাসিনার শাসনামল এত নিকৃষ্ট ছিল যে, জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন দমাতে হত্যা করে লাশ গুমের নির্দেশও দেন তিনি। তার নৃশংসতার প্রমাণ খোদ জাতিসঙ্ঘের অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দেশের সব আদালতে পুঞ্জীভূত মামলার সংখ্যা এখন ৪৫ লাখের মতো। আসলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হয়রানি করতে হাসিনার সময় লাখো ভুয়া মামলা দেয়া হয়। এ কারণে বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাপক হারে বেড়েছে মামলার সংখ্যা। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে করা এসব হয়রানি ও নিপীড়নমূলক মামলা নিয়ে চরম বিপাকে আছেন বিচারকরা। এসব মামলা আদালতে জঞ্জাল তৈরি করেছে। প্রকৃত বাস্তবতায় আওয়ামী জমানায় করা বেশির ভাগ মামলার বিচার নিষ্পত্তিতে বিচারপ্রার্থীরা বছরের পর বছর আদালতে ঘুরে হয়রান হচ্ছেন।

ভুয়া-হয়রানিমূলক মামলার বিচার বিলম্বিত হওয়ায় এক দিকে মামলা পরিচালনা ব্যয় বাড়ছে, অন্য দিকে বাড়ছে জনভোগান্তি। এভাবে চলতে থাকলে দেশের বিচারব্যবস্থায় অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে।

শেখ হাসিনা বিচার বিভাগ এবং পুরো রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে জনগণকে ভীতিকর অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছিলেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ভেঙে পড়া বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এ উপলক্ষে গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশে মামলা বেড়ে রেকর্ড ভঙ্গ করে।

শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সাত মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তবু বিগত সময়ের বেশির ভাগ ভুয়া মামলা এখনো ঝুলে আছে। সঙ্গত কারণে আমরাও মনে করি, বিপুলসংখ্যক ভুয়া রাজনৈতিক মামলা বিচার বিভাগের জন্য বিরাট বোঝা। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে বিচার বিভাগে গতি আনতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সুফল পেতে মামলাজট কমাতে রাজনৈতিক এবং লঘু অপরাধের মামলা বাছাই করে তা দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা জরুরি। কারণ, বিচার বিলম্বিত হওয়া প্রকৃতপক্ষে বিচারহীনতারই নামান্তর। বিচারের এই আপ্তবাক্য মনে রেখে সরকার আদালতের মামলাজট নিরসনে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেবে এটিই কাম্য।