মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক প্রবণতা ও এর ভবিষ্যৎ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে উৎখাত করেছে। এখন দেশে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এ সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক সংস্কারকার্যক্রম দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। আমরা আশা করছি, মুসলিম বিশ্বের নানাবিধ দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো ও সংস্কৃৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে যা হবে অন্য সবার জন্য উদাহরণ

ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব

রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনার ইতিহাস সুদীর্ঘ হলেও রাজনৈতিক দলের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। মাত্র অষ্টাদশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকায় রাজনৈতিক দল গঠনের সূচনা হয়। সপ্তদশ শতকে ব্রিটেনে হুইগ ও টোরি পার্টি জন্ম হলেও সেগুলোর তেমন প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব ছিল না। ব্রিটেনের বড় বড় ভূস্বামী ও ব্যবসায়ী নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে যে গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন তারাই পার্লামেন্টে হুইগ ও টোরি পার্টি হিসেবে ভূমিকা পালন করত। এ সময় গণতান্ত্রিক সংস্কৃৃতির তেমন বিকাশ ঘটেনি। ভোটাধিকার সীমিত ছিল উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার সাথে সাথে রাজনৈতিক দলগুলোও ক্রমান্বয়ে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে উঠতে থাকে। স্যার রবার্ট ফিলের নেতৃত্বে ব্রিটেনে ১৮৩০ সালে প্রথম কনজারভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় আসে। পুরো অষ্টাদশ শতকজুড়ে কনজারভেটিভ পার্টি ও লিবারেল পার্টির মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলে। ১৯২০ সালের দিকে লিবারেল পার্টি ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়লে লেবার পার্টির বিকাশ ঘটে। আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন রাজনৈতিক দল গঠনের বিরোধী ছিলেন। সপ্তদশ শতকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপরিচালনার বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক দেখা দেয়। এর ফলে দুটো রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ঘটে : ১. উত্তরাঞ্চলের নেতা হ্যামিল্টনের নেতৃত্বে ফেডারেলিস্ট পার্টি, এরা ছিল শক্তিশালী ফেডারেল/কেন্দ্রীয় সরকারের প্রবক্তা ও আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে ব্রিটেনের সমর্থক; ২. দক্ষিণাঞ্চলের নেতা জেফারসনের নেতৃত্বে গঠিত হয় রিপাবলিকান পার্টি। এরা ছিল দুর্বল ফেডারেল/কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষপাতী এবং আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে ফ্রান্সের সমর্থক। এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যুদয় ঘটে প্রধানত ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংঘবদ্ধ শক্তি হিসেবে। এদের বেশির ভাগ নেতা আবার পাশ্চাত্য দর্শনে শিক্ষিত ছিল; তবে তারা রাজনৈতিক সুবিধায় মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনাকে কাজে লাগান। অবশ্য কোনো কোনো দেশে ইসলামী আদর্শ ধারণ করে শুরু থেকে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়। লক্ষণীয় যে, প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে। কিন্তু এসব দলের রাজনৈতিক শক্তি অর্জনে যথেষ্ট সময় লেগেছে এবং বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। স্বৈরশাসক ও সামরিক শাসকদের আমলে ইসলামী দলগুলো বহু নির্যাতন ও নিষিদ্ধ হওয়ার শিকার হয়। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিশেষ করে ক্ষমতার হাত বদলে নির্বাচনী পদ্ধতি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সিস্টেম হিসেবে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আধুনিক যুগে একটি রাষ্ট্রের সরকার গঠনে জনগণের সম্মতি ও অংশগ্রহণ না থাকলে তাকে গণতান্ত্রিক বলার সুযোগ থাকে না। একইভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত। যথাযথভাবে নির্বাচন পরিচালনায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী ভূমিকা থাকা আরেকটি অপরিহার্য শর্ত। এ প্রসঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর রাজনৈতিক প্রবণতা পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। তুরস্ক, মিসর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দল ও সরকারগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং নির্বাচনে ভোটারদের আচরণে একটি অভিন্ন প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, মুসলিম দেশগুলোর বেশির ভাগের এক সময় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অধীনে দীর্ঘকাল শাসিত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তি শুধু শাসন করে ক্ষান্ত হয়নি; তারা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে গেছে যার নেতিবাচক প্রভাব আজও বহন করতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রায় প্রতিটি দেশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তরকালে স্বাধীনতা অর্জন করে। এরূপ আন্দোলন সংগ্রামের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা। কোনো কোনো দেশের আন্দোলনে আলেমসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তৃতীয়ত, প্রায় সব দেশ ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে গ্রহণ করে স্বাধীন দেশের কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু পরে কোনো দেশে তা টেকসই হয়নি। স্বৈরতান্ত্রিক ও সামরিক শাসনের জাঁতাকলে প্রায় প্রতিটি দেশকে নিষ্পেষিত হতে হয়েছে। একমাত্র মালয়েশিয়া বহু বাধা-বিপত্তির মধ্যেও পার্লামেন্টারি পদ্ধতি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যেতে পেরেছে। অন্যান্য দেশে চড়াই-উতরাইয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তেমন একটা আসেনি। অবশ্য সাম্প্রতিককালে তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি কিছুটা স্থিতিশীলতা পেয়েছে। চতুর্থত, একমাত্র মালয়েশিয়া ছাড়া অন্যান্য দেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল, সংবিধান বাতিল বা স্থগিতকরণ, জরুরি অবস্থা জারীকরণ, নানা ছলছুতায় দীর্ঘকাল ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা ইত্যাদির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত করা মুসলিম দেশগুলোর সাধারণ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। পঞ্চমত, সব দেশ পার্লামেন্টারি পদ্ধতির আওতায় বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে যাত্রা শুরু করে। মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনাসংবলিত দলগুলোর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে উদার গণতান্ত্রিক, সমাজতন্ত্রী-কমিউনিস্ট, ইসলামপন্থী সব মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটে। এর মধ্যে ইসলামপন্থী ও কমিউনিস্টরা আবার অপেক্ষাকৃত অধিকতর নিপীড়নের শিকার হতে হয়। ষষ্ঠত, প্রায় প্রতিটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পেয়ে আসছে। একমাত্র ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরে যুক্তরাষ্ট্রের চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে এখনো মাথা উঁচু করে চলেছে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক মর্যাদাপূর্ণ নয়। মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর ওপর মার্কিন প্রভাব সবার কাছে দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে মিসর ও তুরস্ক ইসরাইলের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। অবশ্য সাম্প্রতিককালে তুরস্কের ইসরাইলবিরোধী নীতি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার অ্যাগেইন্ট টেরোর’ নীতির অন্যতম সহযোগী হিসেবে গণ্য করা হয়। মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান না হলেও এক সময় ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর সাথে ‘ওয়ার অ্যাগেইন্ট টেরোর’ কর্মসূচিতে সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষর করে। মালয়েশিয়ার নেতা মাহাথির মোহাম্মদ পাশ্চাত্যকে তেমন পাত্তা দিতেন না; বরং কখনো কখনো কঠোর সমালোচনা করতেন। এক সময় সুদানের প্রেসিডেন্ট বশির পাশ্চাত্যের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন। এর আগে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফিস আল-আসাদ ও পরবর্তীতে তার ছেলে প্রেসিডেন্ট বাশারও পাশ্চাত্যের কাছে অপ্রিয়ভাজন বলে চিহ্নিত হয়েছেন। তুরস্কের এরদোগান সরকার পাশ্চাত্যের সাথে কৌশলগত আপস করে চলেছেন। তবে সাম্প্রতিককালে তিনি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সাহসী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সব ক’টি দেশ ইউএসএআইডি, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে উন্নয়নকার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন সহায়তা নিয়ে থাকে। সপ্তমত, প্রায় প্রতিটি দেশে জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তুরস্কে সাংবিধানিকভাবে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। মিসর ও তুরস্কে ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠন করা যায় না। তুরস্ক ব্যতীত সব দেশে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। প্রায় সব দেশে শক্তিশালী ইসলামী রাজনৈতিক দল রয়েছে। আবার সব দেশে আইনের উৎস হিসেবে শরিয়াহকে কমবেশি স্বীকৃতি দেয়া হয়। অষ্টমত, প্রায় প্রতিটি দেশে আঞ্চলিক, নৃতাত্ত্বিক বা ধর্মীয় কারণে গোষ্ঠীগত সঙ্ঘাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং এ জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে বা হচ্ছে। তুরস্কের কুর্দি বিদ্রোহী, সুদানের দারফুর বিদ্রোহী, ইন্দোনেশিয়ার পূর্বতিমুর ও আচেহ প্রদেশের সঙ্ঘাত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জাতিগত বিবাদ (১৯৭১), ইরাক ও সিরিয়ায় শিয়া-সুন্নি বিরোধ, মালয়েশিয়ায় চীনা ও ভারতীয়দের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাÑ ইত্যাদি এসব দেশের রাজনীতিতে মতপার্থক্য ও স্বার্থগত দ্বন্দ্বকে মাঝে মধ্যে জটিল করে তুলে। বিদেশী শক্তি তা থেকে সুবিধা নেয়। নবমত, প্রতিটি দেশে শক্তিশালী ইসলামী আন্দোলন বা রাজনৈতিক দল রয়েছে। এরা ক্রমান্বয়ে অধিকতর জনভিত্তি গড়ে তুলছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দক্ষতা অর্জন করছে। এদের এ শক্তি বৃদ্ধি আবার এদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোনো কোনো দেশে এরা সরকারি নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। মিসরের ব্রাদারহুড, সুদানের হাসান আল তুরাবির ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি এবং তুরস্কে ইসলামী পার্টিকে সামরিক সরকারের কোপানলে পড়ে বারবার নাম পাল্টাতে হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে এরদোগানের নেতৃত্বে একে পার্টি তুরস্কে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তুরস্কের সক্রিয় ভূমিকা দেখা যাচ্ছে। সুদান ও পাকিস্তানের ইসলামী দল সামরিক সরকারের সাথে ক্ষমতার অংশীদার হলেও এর ফল ভালো হয়নি। দশমত, আলোচ্য দেশগুলোর পার্লামেন্ট নির্বাচন পদ্ধতি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বলে গণ্য করার সুযোগ কম থাকলেও স্পষ্টত লক্ষণীয় যে, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ দলগুলো নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে বিশেষ একটি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারছে না। এ পর্যন্ত কোনো দেশে ইসলামী দলগুলো গড়ে ২০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। কোনো এক নির্বাচনে মোটামুটি ভালো ফল করলেও তা আর টেকসই হয়নি। অধিকাংশ দেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ভোটার সংখ্যা মাত্র ৫-৭ শতাংশের বেশি নয়। সেক্যুলার বা জাতীয়তাবাদী দলগুলোর প্রতি ভোটারদের আকর্ষণ বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। পাশাপাশি প্রায় সব দেশে সমাজতন্ত্রী বা কমিউনিস্ট মতাদর্শের দলগুলোর ভোট প্রাপ্তির হার অনুল্লেখযোগ্য। একাদশত, প্রচলিত পুরোনো ধাঁচের ইসলামী দলগুলোর চেয়ে যেসব ইসলামী দল সমাজকল্যাণমূলক কাজ এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বেশি বলছে ভোটাররা এদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। তুরস্কের একে পার্টি ও মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মালয়েশিয়ায় আনোয়ার ইবরাহিমের নবগঠিত জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির কথাও বলা যেতে পারে। তবে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘকাল অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিবেশে কাজ করেও কেন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারছে না তা এক গবেষণার বিষয়। একইভাবে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী কেন দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকা সত্ত্বে¡ও অতীতে নির্বাচনে খুব ভালো করতে পারেনি, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। যদিও দলটি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখে জনগণের মধ্যে একটি ইতিবাচক ইমেজ গড়ে তুলেছে। দ্বাদশত, মুসলিম দেশগুলো বহু সমস্যা মোকাবেলা করে পার্লামেন্ট নির্বাচনপদ্ধতি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষতার সাথে এগিয়ে নিতে চাইলেও পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র ও দেশীয় কুচক্রীদের কারণে তা টেকসই হতে পারছে না। বিভিন্ন সময়ে মিসর, তুরস্ক, আলজেরিয়া, ফিলিস্তিন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বিদেশী ষড়যন্ত্র নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে নানাভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিপুল রক্ত-ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের সম্মিলিত অভিপ্রায় ছিল একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল। সেটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এ নীতি ও মূল্যবোধ বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল সার্বভৌম জাতীয় সংসদ, সুদক্ষ নির্বাহী বিভাগ এবং স্বাধীন বিচার বিভাসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি অতিক্রান্ত হলেও সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আজও সুদৃঢ় ভিত্তির উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শাসনের মধ্য দিয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে উৎখাত করেছে। এখন দেশে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এ সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক সংস্কার কার্যক্রম দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। আমরা আশা করছি, মুসলিম বিশ্বের নানাবিধ দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো ও সংস্কৃৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে যা হবে অন্য সবার জন্য উদাহরণ।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব [email protected]