বাংলাদেশে ফতোয়ার ভূমিকা নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। দেশে এর দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি সত্ত্বেও ধর্মীয় পণ্ডিত ও ইমামদের জারি করা ফতোয়া তদন্ত ও আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, এ ধর্মীয় মতামত মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের জটিলতা নিষ্পত্তি করতে সাহায্য করেছে, ব্যক্তিগত আচরণ থেকে শুরু করে বৃহত্তর সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। তবে, প্রযুক্তি ও সমাজের অগ্রগতির সাথে সাথে মুসলমানরা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা নবী মুহাম্মদ সা:-এর সময়ে অকল্পনীয় ছিল।
শূকরের মতো প্রাণী থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বিষয়ে ইসলামের অবস্থান কী অথবা কোম্পানির সম্পদের উপর জাকাত প্রদান কিভাবে নির্ধারণ করা যায়, যেটি আইনত এক ‘কৃত্রিম ব্যক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এমন প্রশ্নগুলোর কুরআন বা সুন্নাহতে কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। এসব আধুনিক সমস্যা ফতোয়াকে প্রয়োজনীয় করে তোলে। তবু, বাংলাদেশের সমাজে কিছু মহলের ফতোয়া জারি সীমাবদ্ধ বা নিষিদ্ধের চেষ্টা করা হয়েছে এ যুক্তিতে যে, এটি দেশের আইনি কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক। এ নিবন্ধে আমরা সমাজের একটি নির্দিষ্ট চক্রের এ ধরনের একটি বড় প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করব; যারা বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টকে ব্যবহার করে সব ফতোয়া নিষিদ্ধের চেষ্টা করেছিল, এমনকি সম্মানিত মুসলিম পণ্ডিতদের জারি করা ফতোয়াও।
বাংলাদেশে ফতোয়াকে দুর্বল প্রশিক্ষিত ধর্মীয় পণ্ডিত বা মাদরাসা শিক্ষকদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে এর বৈধতা নষ্টের নানা অপচেষ্টা করা হয়েছে। আখ্যানটি প্রায়ই বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত এনজিওসহ সমাজের কিছু অংশ দিয়ে প্রচার করা হয়। এর ফলে, ফতোয়ার আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে আগ্রহী বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বিষয়টি আদালতের সামনে আনার সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ২০০০ সালে এমন একটি সুযোগ আসে। ২ ডিসেম্বর ২০০০ তারিখে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা নওগাঁ জেলার আটিথা গ্রাম থেকে একটি উদ্বেগজনক ঘটনা প্রকাশ করে। খবরটি ছিল সাইফুল ও সাহিদা নামের এক দম্পতির। ১৯৯৯ সালে সাইফুল রাগের মাথায় ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও এ দম্পতি স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসাথে থাকতেন। তবে, স্থানীয় একজন ধর্মীয় ব্যক্তি হাজী আজিজুল হক তাদের বিয়ে ভেঙে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে একটি ফতোয়া জারি করেন। ফতোয়াটির পরিণতি গুরুতর ছিল : সাহিদাকে তার স্বামীর পৈতৃক চাচাতো ভাই সামশীলকে বিয়ে করতে চাপ দেয়া হয়েছিল, যা একটি অন্তর্বর্তী অস্থায়ী বিয়ে হিসেবে পরিচিত (যা হিল্লা বিয়ে নামে পরিচিত)। এ মামলা, যারা ফতোয়ার কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিলেন তাদের জন্য মোক্ষম সুযোগ হিসেবে হাজির হয়।
দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর পত্রিকাটির সম্পাদক নিজে হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করেন, যাতে সাহিদার উপর হস্তক্ষেপমূলক বিয়ে (হিল্লা বিয়ে) চাপিয়ে দেয়ার ফতোয়াটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। বিচারপতি মো: গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটি দায়ের করা হয়। সম্পাদকের প্রতিনিধিত্ব করেন ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম এবং আইন ও সালিশকেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করেন বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। প্রসঙ্গত, হাইকোর্ট বিভাগ ইসলামী পণ্ডিতদের মতামত চাননি, যদিও আদালতের শরিয়াহ আইনের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে ধর্মীয় পণ্ডিতদের সাথে পরামর্শের প্রথা ছিল।
হাইকোর্ট বিভাগ, ১ জানুয়ারি ২০০১ দেয়া রায়ে সিদ্ধান্ত দেন, বাংলাদেশের আইনে সাহিদা ও সাইফুলের মধ্যে কোনো বৈধ বিয়েবিচ্ছেদ নেই। আদালত দেখেছেন, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিয়েবিচ্ছেদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ফলে সাহিদা ও সাইফুলের বিয়ে আইনত অটুট রয়েছে বলে আদালত সিদ্ধান্তে উপনীত হন। ফতোয়া, যা তাদের বিয়ে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল এবং একটি হস্তক্ষেপকারী বিয়ে চাপিয়েছিল, উভয়ই ভুল এবং অননুমোদিত বলে বিবেচিত হয়।
হাইকোর্ট বিভাগ যদি একজন ইসলামী পণ্ডিতের সাথে পরামর্শ করতেন, তবে এটি উন্মোচিত হতো যে- শরিয়াহ পূর্বপরিকল্পিত হিল্লা বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে। একটি পূর্বপরিকল্পিত হিল্লা বিয়ে ঘটে যখন একজন মহিলা তার স্বামীকে তালাক দেন, তারপর তার পূর্ববর্তী স্বামীর জন্য তাকে হালাল করার একমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে অন্য পুরুষকে বিয়ে করেন। এ ধরনের বিয়ে ইসলামে অবৈধ ও পাপ বলে বিবেচিত হয়। নবী মুহাম্মদ সা: স্পষ্টভাবে অভিশাপ দিয়েছেন, ‘যে ব্যক্তি এ ধরনের একটি পূর্বপরিকল্পিত হিল্লা বিয়েতে প্রবেশ করে এবং এর সাথে জড়িত সাবেক স্বামী যে এ ধরনের বিয়ে থেকে লাভবান হয় উভয়ের ক্ষেত্রে। বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইবনে তাইমিয়া আরো জোর দিয়েছিলেন, একটি পূর্বপরিকল্পিত হিল্লা বিয়ে আল্লাহর আদেশকে উপহাস করে। সেই সাথে এটি বৈধ বলে বিবেচিত হবে না। অতএব, হাজী আজিজুল হকের জারি করা ফতোয়া, যা সাহিদার জন্য হস্তক্ষেপমূলক বিয়ের (হিল্লা বিয়ে) আদেশ দিয়েছিল, তা কেবল ধর্মনিরপেক্ষ আইনের পরিপন্থী নয়; বরং শরিয়াহ আইনের মৌলিক নীতিগুলোর লঙ্ঘন ছিল। এটি একটি ভুল বোঝাবুঝি বা ইসলামী শিক্ষার অপপ্রয়োগের উপর ভিত্তি করে ছিল, যা হাইকোর্ট বিভাগ সঠিকভাবে পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
হাজী আজিজুল হকের ফতোয়া ঘিরে সুনির্দিষ্ট আইনি ও ধর্মীয় সমস্যা সমাধানে মামলাটি ব্যবহারের পরিবর্তে, হাইকোর্ট বিভাগ একটি হালকা উপায় গ্রহণ করেন। হাজী আজিজুল হকের জারি করা ফতোয়াকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে সম্মানিত বা যোগ্য ধর্মীয় পণ্ডিতদের কাছ থেকে আসা নির্বিশেষে সব ফতোয়া বেআইনি ঘোষণা করেন। রায়টি একটি বিতর্কিত নির্দেশনাও চালু করে : যে কেউ ফতোয়া জারি করলে এটি বাস্তবায়িত হয়েছে কি-না তা নির্বিশেষে তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এ রায় কার্যকরভাবে যোগ্য মুসলিম পণ্ডিতদের কুরআন ও সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে আইনি মতামত প্রদানের ক্ষমতা সীমিত করে, ফলে দেশে ইসলামী আইনশাস্ত্রের বিকাশকে এটি সীমাবদ্ধ করে দেয়। এ আইনি চ্যালেঞ্জের পেছনে উদ্দেশ্যগুলো স্পষ্ট ছিল : বাংলাবাজার পত্রিকা সম্পাদকের সমর্থকরা জনসাধারণের চাঞ্চল্য সৃষ্টিতে একজন অযোগ্য ব্যক্তির জারি করা একটি ভুল ফতোয়া কাজে লাগানোর অপচেষ্টা করেছিলেন। এটি করার মাধ্যমে, তারা ফতোয়ার সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান, এমনকি জ্ঞানী ধর্মীয় পণ্ডিতদের জারি করা সব ফতোয়া দুর্বল করার লক্ষ্য ছিল। এভাবে ফতোয়ার বৈধতাকে আক্রমণ করে, তারা বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থায় ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের মধ্যে ভারসাম্য পরিবর্তন করতে চেয়েছিল।
বাংলাবাজার পত্রিকার সম্পাদক কেন বিচারপতি রাব্বানীর বেঞ্চের দ্বারস্থ হলেন তা পুরোপুরি বুঝতে বিচারকের পটভূমি এবং তার আগের রায়গুলো বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিশেষ বিচারকের সামনে মামলাটি আনার সম্পাদকের সিদ্ধান্তটি বুঝতে মো: হেফজুর রহমান বনাম শামসুন নাহার বেগমের মামলায় ১ জানুয়ারি ১৯৯৫-এ বিচারপতি রাব্বানীর প্রদত্ত একটি রায়ে ফিরে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে, বিচারপতি রাব্বানী এক রায় দিয়ে প্রতিষ্ঠিত শরিয়াহ আইন থেকে একটি উল্লেখযোগ্য প্রস্থান করেছেন যে, একজন সাবেক স্বামী তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে শুধু ইদ্দতের সময় নয়; বরং এ মহিলা পুনরায় বিয়ে না করা পর্যন্ত ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
এ রায়ের প্রভাব যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম দেয়, কারণ এটি কার্যকরভাবে শরিয়াহ আইনের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলো পরিবর্তন করে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করা হয়। আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে বিচারপতি রাব্বানীর রায় বাতিল করে ইসলামী আইনের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণের ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা ফের নিশ্চিত করেন। এ পটভূমিতে, বাংলাবাজার পত্রিকার সম্পাদক বিশ্বাস করেছিলেন, বিচারপতি রাব্বানী, প্রতিষ্ঠিত শরিয়ার নীতি থেকে সরে যাওয়ার রায় প্রদানের ট্র্যাক রেকর্ডের সাথে ফতোয়া বেআইনি ঘোষণা করতে উদ্যোগী হবেন। এ কারণে সম্পাদকের কৌশল ছিল বিচারপতি রাব্বানীর রুল জারির ইচ্ছার সুযোগ নেয়া যা বাংলাদেশের ইসলামী আইনের সম্ভাব্য পরিবর্তন করতে পারে।
২০০১ সালে, বিচারপতি রাব্বানীর ‘ফতোয়া’ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে দু’জন মুসলিম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আপিল দায়ের করেন। কিন্তু আপিলকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বিষয়টি আপিল বিভাগে শুনানির জন্য আনতে অবিরাম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আইন ও সালিশকেন্দ্রের আইনজীবীরা বারবার এর মুলতবি চান। তারা কৌশলগতভাবে সময় পার করছিলেন, নিজেদের সুবিধাজনক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে, মামলার শুনানিতে ‘সঠিক’ বিচারিক বেঞ্চ সন্ধান করছিলেন। বাংলাবাজার পত্রিকার সম্পাদকের আইনজীবীরা যেমন যত্নসহকারে বিচারপতি রাব্বানীর বেঞ্চকে মামলার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, আইন ও সালিশকেন্দ্রের আইনজীবীরা তখন এমন একজন প্রধান বিচারপতির অপেক্ষায় মনোনিবেশ করেছিলেন যিনি তাদের অবস্থানের প্রতি আরো সহানুভূতিশীল হতে পারেন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে, এমনকি ২০০৭ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত জরুরি অবস্থার সময়কালে, আইন ও সালিশকেন্দ্রের আইনজীবীরা বিশ্বাস করেছিলেন, এমন কোনো বেঞ্চ নেই যা তাদের পক্ষে অনুকূল হবে। ২০১০ সালে, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, যিনি আগের আওয়ামী লীগ আমলে অন্য দুই বিচারপতিকে ডিঙিয়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এ নিয়োগের সাথে সাথে বিচারিক ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তিত হয়। বিচারপতি হকের নিয়োগের সাথে, আইন ও সালিশকেন্দ্রের আইনজীবীরা অবশেষে অনুভব করলেন, তাদের আপিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তার নেতৃত্বে এই আপিল বিভাগ তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সুযোগ দেবেন।
২০১১ সালে আপিলের চূড়ান্ত শুনানি হয়; যখন আপিল বিভাগে মামলায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। আপিল বিভাগের আগে, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক একটি যুক্তি দিয়েছিলেন, হাইকোর্ট বিভাগ যখন সব ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন; তখন আদালত তার এখতিয়ার লঙ্ঘন করেন। তিনি জোর দিয়েছিলেন, হাইকোর্ট বিভাগ বিধির আওতার বাইরে চলে গেছেন, যা বিশেষভাবে সাহিদার হিল্লা বিয়েতে জারি করা ফতোয়া মোকাবেলা করতে ছিল। ব্যারিস্টার রাজ্জাক যুক্তি দিয়েছিলেন, সব ফতোয়া বেআইনি ঘোষণা করে, রায়টি দেশের ইসলামী পণ্ডিতদের বাকস্বাধীনতা, পেশা এবং ধর্মের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে। তিনি স্বীকার করেছেন, প্রশ্নবিদ্ধ ফতোয়া, যা হিল্লা বিয়ে আরোপ করেছিল, প্রকৃতপক্ষে ভুল ছিল এবং ইসলামী আইনের ভুল ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে এটি দেয়া হয়। তবে, তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন- ফতোয়া যখন যোগ্য ধর্মীয় পণ্ডিতরা জারি করেন, তখন অঙ্গ প্রতিস্থাপন, অঙ্গ দান, এমনকী সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের মতো ব্যাপক পরিসরে মতামত ও নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে তা একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে আইন ও সালিশকেন্দ্রের প্রতিনিধিত্বকারী তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ড. কামাল হোসেন আরো কঠোর অবস্থান নেন। তারা সব ফতোয়া নিষিদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন।
আপিল বিভাগ অবশ্য হাইকোর্ট বিভাগের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার সাথে একমত হননি। যোগ্য ধর্মীয় পণ্ডিতদের জারি করার সময় ফতোয়া যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে; তা আপিল বিভাগ স্বীকার করেন। এটি স্বীকৃত যে, আধুনিক জীবনে উদ্ভূত বিষয়গুলোর উপর ধর্মীয় নির্দেশনা প্রদানে ফতোয়া গুরুত্বপূর্ণ। এর ভূমিকা সরাসরি খারিজ করা যায় না। ১২ মে ২০১১-এ প্রদত্ত একটি যুগান্তকারী রায়ে, আপিল বিভাগ ফতোয়ার উপর পাইকারি নিষেধাজ্ঞা আরোপের হাইকোর্ট বিভাগের সিদ্ধান্ত পাল্টে দেন।
বাংলাদেশে ফতোয়া নিষিদ্ধ করার এবং ধর্মীয় স্কলারশিপকে হেয় করার প্রচেষ্টা একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল না। বিচারপতি রাব্বানীর হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চের সতর্ক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সুচিন্তিত কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। আপিল বিভাগে আপিলটি তখন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল; যখন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন, এ বিশ্বাসে যে ফতোয়ার বিরুদ্ধে রায় এখন অনিবার্য। একটি ভুল ফতোয়া বাছাই করা যার কাছে কোনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ কর্তৃত্ব নেই, সেই ইস্যুটি চাঞ্চল্যকর করতে একটি হিসেবি পদক্ষেপ ছিল। এ ছাড়া ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা করে এমন একটি রায়ের জন্য চাপ দেয়া তা সহজ করে তোলে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল একটি পূর্বনির্ধারিত ফল অর্জনে জনসাধারণের উপলব্ধি এবং বিচারিক মতামতকে পরিচালিত করা। শেষ পর্যন্ত, এ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আপিল বিভাগ চাঞ্চল্যের পরিবর্তে সঠিক আইনি যুক্তির ভিত্তিতে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন। আদালত শেষ পর্যন্ত ফতোয়ার বৈধতা বহাল রেখেছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় স্কলারশিপের ভূমিকা পুনর্নিশ্চিত করেছেন। এটিকে ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছেন। রায়টি যারা আইনি সংস্কারের আড়ালে ধর্মীয় স্বাধীনতা সীমিত করতে চেয়েছিলেন, তাদের অশুভ উদ্দেশ্য উন্মোচিত করেছে। সেই সাথে এটি মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় অনুশীলন রক্ষায় আইনি ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতার উপর জোর দিয়েছে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



