১৫ এপ্রিল ২০২১
`

নির্দোষ ব্যক্তির সাজা কেন?

নির্দোষ ব্যক্তির সাজা কেন? - ফাইল ছবি

মামলা শব্দটি শুনলে কমবেশি সবারই গা শিউরে ওঠে। কারণ মামলার ফাঁদে পড়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রে যদি আইনের শাসন বিরাজ করত, তাহলে মামলা নিয়ে মানুষের এত ভয় থাকত না। পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি মামলা মোকদ্দমা আছে। কিন্তু ভুয়া, গায়েবি কিংবা ভুল তদন্তে নির্দোষ মানুষের সাজা খাটার ঘটনা কম। কারণ ওইসব দেশে রাজনীতি আছে। কিন্তু প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসার রাজনীতি আমাদের দেশের মতো এত প্রকট নয়। কেউ অপরাধ করলে শাস্তি পাবে। অপরাধ প্রমাণিত না হলে অব্যাহতি পাবে। এটাই আইনের আসল কথা। কিন্তু আমরা দেখছি ঠিক তার উল্টোটা। অপরাধ না করেও কেউ কেউ অপরাধী হয়ে যাচ্ছে। কেউবা ভুল তদন্তের ফলে সাজা খাটছে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। ভুল তদন্তে সাজা পাওয়া মানুষগুলোর জীবনের যন্ত্রণা কত নির্মম কত বেদনাদায়ক তা ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারে না। অথচ আইনের উক্তি হচ্ছে, দশজন দোষী ব্যক্তি মুক্তি পেলেও একজন নির্দোষ ব্যক্তি কোনো ক্রমেই যেন শাস্তি না পায়।

আদালত হচ্ছে মানুষের জীবনে শেষ আশ্রয়স্থল। মানুষ যখন কোথাও ন্যায্য বিচার পায় না তখনই আদালতের দ্বারস্থ হয়। অথচ বিচারব্যবস্থার দক্ষতা, দুর্বলতা ও সংস্কারের অভাবের ফলে বহু নিরীহ মানুষকে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। একজন মানুষ আইনের দৃষ্টিতে তখনই অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হয় যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আদালত তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। এর আগে অভিযুক্ত হলেও কাউকে অপরাধী হিসেবে ট্যাগ লাগানো যায় না। অথচ অপরাধ না করেও কিছু মানুষ কারাভোগ করছে। তাদের জীবনের একটা লম্বা সময় জেলখানায় কাটছে। এসব ঘটনা কারো কাছে সিনেমার কাহিনীর মতো মনে হতে পারে! কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। তদন্তে অনিচ্ছাকৃত বা ইচ্ছাকৃত ভুল, মিথ্যা সাক্ষ্যদানসহ নানা কারণে নির্দোষ কিছু মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। নির্দোষ মানুষের সাজার ঘটনা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। দুদকের ভুল তদন্তের কারণে বিনা অপরাধে সাজার দুটো ঘটনা নিচে উল্লেখ করলাম।

নিদোর্ষ কামরুলের সাজা বাতিল ও তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগ। এ খবরটি গত ২৮ জানুয়ারি একটি পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, এসএসসির মার্কশিট ও সনদপত্রে জালিয়াতি করে নোয়াখালীর মাইজদী কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন পশ্চিম রাজারামপুরের কামরুল ইসলাম। কিন্তু জালিয়াতির ঘটনা নজরে আসায় কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সনদ জালিয়াতের অভিযোগে ২০০৩ সালে শহীদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি মামলা করেন। কিন্তু মামলার এজাহারে আসামির ঠিকানা ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। যে কারণে পশ্চিম রাজারামপুর থেকে হয়ে যায় পূর্ব রাজারামপুর। এই ভুল ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ মামলায়ও দুদকের এক ব্যুরো কর্মকর্তা তদন্ত করে ভুল আসামির বিরুদ্ধে নোয়াখালীর বিচারিক আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এর ফলে আদালত ভুল চার্জশিটের ভিত্তিতে পূর্ব রাজারামপুরের মো: কামরুল ইসলামকে ১৫ বছরের সাজা ও অর্থদণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু এই ভুল সাজার বিরুদ্ধে পূর্ব রাজারামপুরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি কামরুল ইসলাম হাইকোর্ট বিভাগে রিট করেন। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পূর্ব রাজারামপুর গ্রামের মো: কামরুল ইসলামকে দেয়া সাজার রায় বাতিল এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করতে সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেন। এ ছাড়া আদালত মামলাটির তদন্তকারী দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো: মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

জাহালমের ঘটনাটি পাঠকের মনে থাকার কথা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভুল তদন্তে এবং এক ব্যাংক কর্মকর্তার ভুল সাক্ষ্যের কারণে নির্দোষ জাহালমকে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ গ্রেফতার করে। এর ফলে জাহালমকে তিন বছর জেল খাটতে হয়েছিল। অথচ একটি মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ার নমুনা কেমন হবে তা আইনে স্পষ্ট বলা আছে। তার পরও কেন ভুল হচ্ছে? এটা কি ইচ্ছাকৃত ভুল নাকি অনিচ্ছাকৃত ভুল। সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

অপরাধ করেছে সালেক আর শাস্তি পেয়েছে জাহালম। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৬ এ বিচারকের উদ্দেশে জাহালম বলেছিল, স্যার আমি সালেক না আমি জাহালম। আমি নির্দোষ। কিন্তু তার কথা তখন কেউ বিশ্বাস করেনি।

২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি একটি পত্রিকা শিরোনাম করেছিল স্যার, আমি জাহালম, সালেক না। এরপর মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে আসে জাহালম নিরপরাধ। পরে আদালতের নির্দেশে সব মামলা থেকে জাহালম ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ১ হাজার ৯২ দিন কারাভোগ করার পর মুক্তি পান। এই ভুলের দায় দুদক এড়াতে পারে না। দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এরকম ভুল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দুদক কি পারবে জাহালমের জীবন থেকে ঝরে যাওয়া তিনটি বছর ফিরিয়ে দিতে? অথচ তারা বলছে এটা নাকি সরল বিশ্বাসের ভুল। এটা সরল বিশ্বাসের ভুল কোন যুক্তিতে হতে পারে তা বোধগম্য নয়! সরল বিশ্বাসের ভুল কোনগুলো তা ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ হাইকোর্ট বিভাগ জাহালমকে ১৫ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত রায়ে এও বলেছেন, জাহালমের মতো আর কোনো নিরীহ লোক যেন ভবিষ্যতে দুদকের মামলায় জেল না খাটে। দুদককে যথাযথভাবে তদন্ত করারও নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আদালতের এমন আদেশ দেশবাসীর জন্য স্বস্তিদায়ক।

আদালতের এ মহতী উদ্যোগে অন্তত একজন নির্দোষ মানুষ প্রতিকার পেয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে যাদের গাফিলতির কারণে জাহালম এবং কামরুলের জীবন বিপন্ন হয়েছে সেসব কুশীলবকেও শাস্তির আওতায় আনা হোক। যেন ভবিষ্যতে এরকম ভুল করার পুনরাবৃত্তি দ্বিতীয়টি আর না ঘটে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।



আরো সংবাদ