১২ এপ্রিল ২০২১
`

দেশে বেকারত্ব রেখে বিদেশীদের কর্মসংস্থান

দেশে বেকারত্ব রেখে বিদেশীদের কর্মসংস্থান - ছবি : সংগৃহীত

সরকার বহুদিন থেকে দেশীয় কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণের কথা বলে এলেও বর্তমানে এর ফলাফল লক্ষ করা যায় না। সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বাংলাদেশের প্রায় সব খাতের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দাসহ বিভিন্ন কারণে মধ্যপ্রাচ্যসহ উন্নত দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র অনেকটা সঙ্কুচিত হয়ে আসায় আমাদের বহু কর্মক্ষম, শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির অনেকটাই দেশে ফিরে আসছে। তার ওপর, দেশীয় চাকরি ও কর্মসংস্থান ব্যবসায় বাণিজ্যের উন্নয়ন না হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্র সেভাবে তৈরি না হওয়ার কারণে যে হারে বেকার সমস্যা বাড়ছে, অপর দিকে শিক্ষার হার বাড়ার কারণে চাকরি না পাওয়া শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা খুব দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। এমতাবস্থায় দেশে বিপুল বেকারত্ব রেখে বৈধ-অবৈধভাবে বিদেশীদের কর্মসংস্থান একটি মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশ গড়ার ক্ষেত্রে কতটুকু যুক্তিযুক্ত, রাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তাসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা একবারও কি ভেবে দেখেছেন?

বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশী কর্মীর প্রকৃত সংখ্যা ও তাদের পাচার করা অর্থের পরিমাণ নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলেও গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে অর্থ পাচার ও রাজস্ব ক্ষতির যে চিত্র উঠে এসেছে তা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে বৈধভাবে বিদেশী কর্মী আনা হলে আটটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। অন্য দিকে অবৈধভাবে বিদেশী কর্মী আনা হলে তিন ধাপেই নিয়োগ শেষ হয়ে যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানে বিদেশী কর্মী নিয়োগ দিতে হলে নিয়মবহির্ভূতভাবে জনপ্রতি ২৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পর্যটক ভিসায় আসা লোককে নিয়োগ দেয়া হয়। সম্প্রতি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সাক্ষাৎকার এবং আইনি নথি-নীতিমালা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য, গবেষণা প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী কর্মীর ন্যূনতম সংখ্যা ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ যার মাধ্যমে বছরে সরকারের ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারানোসহ ন্যূনতম ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা তারা পাচার করে। দেশীয় জনশক্তি কাজে না লাগিয়ে বিদেশী কর্মীদের বৈধ-অবৈধভাবে নিয়োগের মাধ্যমে বেতন-ভাতার নামে প্রতি বছর দেশ থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়া দেশীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির জন্য অশনি সঙ্কেত।

কর্মানুমতি না নিয়ে পর্যটক ভিসায় এসে বাংলাদেশে কাজ করেছেন প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার কর্মী। তারা কোনো ধরনের কর না দিয়েই অর্থ নিয়ে চলে যান। এসব বিদেশী কর্মী প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেন। আবার কর্মানুমতি থাকা কর্মীরাও নানা পন্থায় অবৈধভাবে নিজ দেশে অর্থ নিয়ে যাচ্ছেন, এভাবেই পাচার হচ্ছে দেশের অর্থ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশীদের কর্মসংস্থান, সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণায়ও এসব তথ্য জানানো হয়েছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ গবেষণা করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরার অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

বাংলাদেশে কর্মরত বৈধ বিদেশী কর্মচারীর হিসাব নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্যে দেশে বিদেশী কর্মীর সংখ্যা ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বললেও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের হিসাবে কর্মোপযোগী ভিসার সংখ্যা ৩৩ হাজার ৪০৫। তিন সংস্থা (বিডা, বেপজা ও এনজিও ব্যুরো) এর দেয়া বৈধ কর্মানুমতির সংখ্যা ১১ হাজার ১৮০। বাংলাদেশে বিদেশী কর্মী নিয়োগের সঠিক কোনো নীতিমালা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকার কারণে বিদেশী কর্মী নিয়ন্ত্রণে নিয়োগকারী সংস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

পর্যটন করপোরেশনের এক জরিপে দেখা যায় ওই বছর ৮ লাখ পর্যটক ভিসা নিয়ে এর প্রায় ৫০ শতাংশ বা চার লাখ ভিসাধারী অবৈধভাবে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন যদিও পর্যটক ভিসায় কাজ করা নিষিদ্ধ। পর্যটক ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন মাস হলেও তিন মাস পরপর দেশে গিয়ে একই নিয়মে ভিসা নিয়ে তারা আবার আসেন। পুনঃ পুনঃ ভিসার হিসাবে পর্যটক ভিসায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি (৪ লাখ/২.৫) অবৈধ বিদেশীসহ বৈধ বিদেশী কর্মী প্রায় ৯০ হাজার যোগ করে মোট বিদেশী কর্মীর সংখ্যা ন্যূনতম আড়াই লাখ ধরা হয়েছে। প্রতি মাসে জনপ্রতি দেড় হাজার ডলার ধরা হলেও বিদেশী কর্মীদের মোট বার্ষিক আয় ৪৫০ কোটি ডলার। এ থেকে ৩০ ভাগ স্থানীয় ব্যয় বাদ দিলে মোট পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১৫ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে, বিদেশীদের ৩০ শতাংশ করহার ধরে ন্যূনতম রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ ডলারে ১৩৫ কোটি ডলারের সমতুল্য যা আমাদের মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে অগ্রসর হওয়ার পথে আর্থিক খাতে বিরাট ধাক্কা বলেই মনে হয়।

বাংলাদেশে প্রায় ৪৪টি দেশ থেকে আসা বিদেশী কর্মীরা বিভিন্ন খাতে কর্মরত আছেন যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিক। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন, ক্রমান্বয়ে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, নরওয়ে ও নাইজেরিয়া। সরকারি সেবা খাতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস না থাকার কারণে তারা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করছেন।

এসব বিদেশী কর্মীর ভিসার সুপারিশপত্র, নিরাপত্তা ছাড়, ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধিসংক্রান্ত সঠিক নীতিমালা না থাকায় তাদের সঠিক বেতন কত, তা জানান না। সরকারের সদিচ্ছার অভাবে দেশে বৈধ-অবৈধ বিদেশী কর্মীদের মোট সংখ্যা, ন্যূনতম বেতনসীমার সঠিক হালনাগাদ তথ্যাদি, ভ্রমণ ভিসায় নিয়োগ না দেয়ার তথ্যানুসন্ধানে বিভিন্ন অফিস বা কারখানায় এনবিআর, বিডা, এসবি এবং ডিবি-এর সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালিয়ে, স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার অভাব রয়েছে। সরকারের এসব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা তাদের অফিসের কিছু কর্মচারী ও দালালদের জোগসাজশে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে যারা ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে কাজ করছেন, যাদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে, বৈধ-অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের বেতনের সঠিক তথ্যসহ যারা রিটার্ন দিচ্ছেন, তারা সঠিকভাবে দিচ্ছেন কি না তা গোপন করা হচ্ছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর অঞ্চল ১১-তে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন সাড়ে ৯ হাজার বিদেশী, যাদের বার্ষিক আয় ৬০৩ কোটি টাকা। তাতে কর পাওয়া গেছে ১৮১ কোটি টাকা। তৈরী পোশাক খাতে কর্মরত বিদেশীদের আয়ের হিসাবে দেখা গেছে, একটি প্রতিষ্ঠানের বিদেশী প্রধান নির্বাহীর মাসিক বেতন ১০ থেকে ১২ হাজার মার্কিন ডলার। কিন্তু দেখানো হয়েছে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ডলার। আর একজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারের মাসিক বেতন তিন-ছয় হাজার ডলার হলেও দেখানো হয় মাত্র এক-দুই হাজার ডলার। এভাবে অবৈধ কর্মসংস্থান ছাড়াও বেতন-ভাতা কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া ও বিদেশে অর্থ পাচার, দেশের এক শ্রেণীর দায়িত্বশীল লোকের দায়িত্ববোধহীনতা, দেশপ্রেমের অভাব ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ ছাড়া কিছুই নয়।

টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার কিছু অনিয়ম রয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদে যোগ্য দেশী কর্মী না খুঁজে নিয়ম রক্ষার তাগিদে নামেমাত্র বিদেশী কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সারা হয়। এসব কর্মী নিয়োগে ভিসার সুপারিশপত্রের জন্য বেশ কয়েক হাজার টাকা অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসা নিতে ৪ থেকে সাড়ে ৮ হাজার, কাজের অনুমতি নিতে পাঁচ-সাত হাজার, পুলিশের বিশেষ শাখার ছাড়পত্র পেতে পাঁচ-সাত হাজার, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ছাড়পত্রের জন্য তিন-পাঁচ হাজার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের জন্য দু-তিন হাজার ও ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তিন-পাঁচ হাজার টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয়।

দেশের বেকারত্ব দূর করা, বহুমুখী কর্মসংস্থান, দ্রুত শিল্পোন্নয়ন, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ জীবনমান উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ভিশন-২০২০ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশ গড়ার যে মহাপরিকল্পনা সেটিকে এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ লোক লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে সরকারের ভেতর অদৃশ্য সরকার তৈরি করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কৌশলে প্রশাসনের দুর্বল স্থানগুলোকে কাজে লাগিয়ে, সরকারের বহুমুখী উন্নয়নকে ম্লান করে দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি, দুর্নীতি, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অপকর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করে আঙুলফুলে কলাগাছ হয়েছেন।

মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে কোনো রকম লেজুড়বৃত্তি এবং ভয়-ভীতির তোয়াক্কা না করে সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা নাটের গুরুদের আইন ও বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেশীয় কর্মসংস্থানসহ উন্নয়ন অবকাঠামো ঠিক রেখে বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে দেশকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে দেশের মানুষের বিশ্বাস।

লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, ‘অর্থনীতির ৩০ দিন’ ও মানবাধিকার কর্মী।



আরো সংবাদ