০৫ মার্চ ২০২১
`

প্রকৃতির কাছে লাজে মুখ ঢাকি

প্রকৃতির কাছে লাজে মুখ ঢাকি - ছবি : প্রতীকী

করোনাভাইরাস, অন্যান্য ভাইরাসের মতোই একটি ভাইরাস মাত্র। কিন্তু এর যে মহাশক্তি তথা বিশ্বশক্তি তার পেছনে মানব নামের কোনো মহাদানবের হাত আছে কি না এখন পর্যন্ত আমাদের জানা নেই। মানবকুলের ওপর এই ভাইরাসের যে প্রবল দৌরাত্ম্য তার পেছনে কিন্তু মানুষই দায়ী। নয় কি? এটির মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার কারণ তো মানুষই। করোনাভাইরাস বন্যপ্রাণীর ভাইরাস। জানা যায়, বাদুড়, সাপ কিংবা বনরুই থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। কিভাবে? চীনারা বাদুড়, সাপ প্রভৃতিসহ প্রায় সব বন্যপ্রাণীর মাংস খেয়ে থাকে। এই খাদ্যাভ্যাসের কারণে মানুষের ভেতর আসার সুযোগ হয়েছে করোনাভাইরাসের এবং পরে গোটা বিশ্বকেই গ্রাস করে ফেলেছে। এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ কোটির উপরে এবং মৃতের সংখ্যা এ পর্যন্ত প্রায় ২১ লাখ। আমাদের দেশে যদিও সঠিক তথ্য জানা যাচ্ছে না বলে অনেকে মনে করেন। তার পরেও আক্রান্তের সংখ্যা এ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা আট হাজার ছুঁই ছুঁই। বিশ্বকে এ ভাইরাস কখনোই ক্ষমা করবে বলে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে না। কেননা দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগ্রাসন প্রথমবারের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। কোনো কোনো দেশের পক্ষে মোকাবেলা করা তো দূরের কথা, রোগীদের হাসপাতালে জায়গাও দিতে পারছে না। হিমঘরে স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না, কবরস্থানে লাশের গাড়ি সারি সারি, চার দফায় চব্বিশ ঘণ্টাব্যপী হচ্ছে দাফন। আমাদের মতো দেশের কথা তো বাদ।

এমনই একটি ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটেছিল এখন থেকে ১০০ বছর আগে, স্পেনিস ভাইরাস। মারা গিয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ। দুর্ভাগ্য যে মাত্র ১০০ বছর আগের ইতিহাস আমাদের ভালোভাবে জানার সুযোগ হলো না। তবে এটুকু জানা যায় যে, তার স্থায়িত্ব ছিল চার বছর, ছিল পাঁচটি ঢেউ। মৃত্যুর হার ছিল দ্বিতীয় ঢেউয়ে সর্বোচ্চ। জানা যায় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কে কত শক্তির অধিকারী, কত শক্তিশালী অন্যের উপরে, কে কত বেশি শক্তি খাটাতে সক্ষম হয়েছিল সেই খতিয়ান বিশ্লেষণেই ব্যস্ত ছিল দাম্ভিক মনুষ্য সমাজ, ভাইরাসকে আমলে নেয়নি।

‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। বন্যপ্রাণী তথা বনের জীবনে থাবা মেরে মানুষকে বন্যপ্রাণী খেতে হবে এমন কোনো শিক্ষা তো প্রকৃতি মানুষকে দেয়নি। বরং মানুষের জন্য প্রকৃতির সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। আদিকাল থেকে কিছু প্রাণীকে পোষ মানিয়ে গৃহপালিত করা সম্ভব হয় যুগের পর যুগ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণার মাধ্যমে। আবার অনেক বন্যপ্রাণীকে পোষ মানানোর শত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সেগুলো গৃহপালিত হয়ে ওঠেনি। হাতেগোনা কয়েকটি প্রজাতির প্রাণীই কেবল পোষ মেনেছে এবং গৃহপালিত হয়ে মানুষের উপকারে এসেছে। এসব গৃহপালিত প্রাণী ঘরে ঘরে পালনই নয় শুধু, বড় বড় ফার্মের মাধ্যমে বিশাল আকারে এসবের চাষও বিশ্বে গড়ে উঠেছে। সেসব প্রাণীতে আমাদের পেট ভরল না, আমাদের ক্ষুধা মিটল না। লালসা হলো বন জঙ্গল থেকে ধরে ধরে বন্যপ্রাণীগুলো খাদ্য তালিকায় আনতে হবে। বিশ্বে বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে এটাও জানাও গেল যে, বন্যপ্রাণীর রোগব্যাধির জন্য যেসব জীবাণু দায়ী তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করার ক্ষমতাও রয়েছে ওই সব প্রাণীর দেহে। যেমন মানুষের বিভিন্ন রোগের জন্য যেসব জীবাণু দায়ী তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরির ক্ষমতাও রয়েছে মানুষের শরীরে। বন্যেরা বনের জীবন যাপন করবে, এক প্রাণী প্রয়োজনমাফিক অন্যপ্রাণীর ওপর নির্ভরশীল হবে। সেখানেও প্রকৃতি মানুষের অলক্ষ্যে চিরাচরিত বিধিবিধানের মাধ্যমে বনের তথা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষা করে থাকে। যেমন প্রাণিকুলের মধ্যে একে অপরকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। যেমন বাঘ হরিণ খায়, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নয়। আবার শিকারি প্রাণীর শিকার ধরার মধ্যেও অপূর্ব সুন্দর এক প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে, সিস্টেম রয়েছে। বাঘ যখন হরিণ ধরে তখন সচরাচর সেসব হরিণই ধরতে সক্ষম হয় যেগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল, অসুস্থ অথবা বিকলাঙ্গ। ফলে হরিণ পালের সুস্থতা বজায় থাকে। তা না হলে অসুস্থ কিংবা জীবাণু আক্রান্ত হরিণ থেকে বনের অন্য সব হরিণ আক্রান্ত হতো, একসাথে হরিণকুলে মহামারী দেখা দিত এবং তারা রাতারাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। অন্যান্য প্রাণীও হয়তো আক্রান্ত হতো। বিপর্যয় দেখা দিত ইকোসিস্টেমে। এভাবে অন্যান্য প্রাণী তথা জীবকুলের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য।

বন-জঙ্গল প্রকৃতির ফুসফুস। বন্যপ্রাণীও প্রকৃতির দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসম। একটি নির্দিষ্ট এলাকার তথা দেশের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ থাকতে হবে বন-জঙ্গল, থাকবে যথাযথ সংখ্যক স্থানীয় বিভিন্ন প্রজাতির আনুপাতিক হারের বন্যপ্রাণী। বন ও বন্যপ্রাণীর বিভিন্ন প্রজাতিরও কম-বেশি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকৃতি প্রাকৃতিক নিয়মেই সুনির্দিষ্ট করে ধারণ ও লালন করে থাকে। এই যে সুনির্দিষ্ট পরিমাপ তা-ও প্রকৃতি নানা প্রাকৃতিক উপায়েই সুরক্ষা করে যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপ বাঞ্ছনীয় নয়।

আমরা মানুষের অপরিণামদর্শী চিন্তা ও কর্মকা- যদি বিচার করি তাহলে কী দেখতে পাই? দেখতে পাই, বনের গাছ কেটে পাচার করে অবৈধ ব্যবসা যেমন চলছে তো চলছেই, ঠিক তেমনি বন্যপ্রাণীর বেলায়ও। বন্যপ্রাণী ধরা, মারা, শিকার করা, অবৈধ ব্যবসা, চোরাচালান চলছে তো চলছেই। এসব ব্যবসা এতই সুখের যে তাতে তেমন কোনো মূলধনের প্রয়োজনই হয় না। আর তার সাথে আছে দেশীয় প্রভাবশালীদের ব্যবসায়িক যোগসাজশ, আছে বিদেশী ক্রেতাও। এসব কেনে কারা? পৃথিবীজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চোরাকারবার। আমাদের দেশের মতো দেশগুলোর কথা তো সবাই জানে। এখানে রক্ষকই ভক্ষক। রক্ষকদের সবাই উন্নত বিশ্বে সেকেন্ড হোম খোঁজার নেশায় টালমাটাল। তাতে দেশ থাকলেই কী আর না থাকলেই কী!

বন্যপ্রাণীর ব্যবসায় ক্রেতাদের মধ্যে চীনের জুড়ি নেই। চীনারা না খায় এমন কোনো প্রাণী নেই। এরা শুধু খায়ই না, বরং Traditional Chinese Medicine (TCM) তৈরির জন্য কাঁচামাল হিসাবে নানান প্রাণী ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মজুদ করে রাখছে শত বছরের জন্য। বিশ্বে বাঘের সংখ্যা শূন্যের দিকে ধাবিত। সেটাও দেখা যাবে চীনের মতো দেশের কারণেই ঘটছে। শত বছরের জন্য চীনের স্টোরে বাঘ ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগৃহীত হচ্ছে। অথচ বিশ্বে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের আইন রয়েছে। তার পরও চীনের কাছে কোনো বন্যপ্রাণীরই রক্ষা নেই। তা খাওয়াই বলি আর জমা রাখাই বলি।

করোনার মতো ভয়াবহ ভাইরাস বন্যপ্রাণী থেকেই এসেছে প্রথমে চীনের উহানে, ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে। প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ, বিশ্ব আজ নিথর নিস্তব্ধ। থমকে গেছে বিশ্বের গতি, স্থবির শিক্ষা, বাণিজ্য। চলাচল হয়েছে বন্ধ। প্রকৃতির কোল থেকে জীবন বাঁচাতে মানুষ নিজেকে করেছে ঘরবন্দী। অত্যন্ত লজ্জার বিষয় যে, এই করোনাকালেও পিশাচরা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, বন্যপ্রাণী নিয়ে ধরা, মারা, ব্যবসা, চলছে বিশ্বজুড়েই। আমাদের দেশের তো কথাই নেই। এই সে দিনও ৭০০-এর উপরে বুনো পাখি সাভারে ধরা পড়ল অবৈধ ব্যবসায়ীদের হাতে। এনে ছেড়ে দেয়া হলো কার্জন হল ক্যাম্পাসে। মোহাম্মদপুর থেকে ধরা হলো তক্ষক ব্যবসায়ীকে। তক্ষককে এখন তো আর শুধুই তক্ষক বলা হয় না, বলা হয় ‘মিলিয়ন ডলার তক্ষক’। কারণ চীন TCM তৈরির জন্য তক্ষক লাখ লাখ ডলারে কিনে নিচ্ছে, বন থেকে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তক্ষক, আমাদের দেশে প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ বাংলাদেশের সর্বত্রই তক্ষকের আধিক্য ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচুর তক্ষক ছিল, তাদের অনবরত ডাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এক অন্যরকম আমেজে ভরে রাখত। বাংলাদেশের মধ্যেই পাঁচ থেকে ২৫ লাখ টাকায় চোরাকারবারিরা কিনে নিচ্ছে প্রতিটি তক্ষক যা আমাদের বন্যপ্রাণী ব্যবসার ওপরে এক গবেষণার মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে।

বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা তো চলছেই। করোনাকালে এ ব্যবসা কত গুণ বেড়েছে তার হিসাব কে রাখে! এ সময়, বিশেষ করে লকডাউনের সময় মানুষ হয়ে যায় ঘরবন্দী। সুযোগ বুঝে চোরাকারবারিরা লেগে যায় বন উজাড় করে বন্যপ্রাণী ধরা, মারা, বেচাকেনা ও পাচারের কাজে। অতএব মনে হচ্ছে না করোনা প্রশমিত হবে, আমাদের মরণ রোধ হবে। বরং মৃত্যু পর্যন্ত প্রকৃতির কাছে লজ্জায় মুখ ঢেকেই রাখতে হবে। প্রকৃতি কাউকে ক্ষমা করে না, বরং প্রতিশোধ নিতে জানে। মানুষ তুমি লজ্জা ঢাকো, মরণ পর্যন্ত মাস্কে মুখ ঢেকে রাখো।

লেখক : পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ



আরো সংবাদ