২৩ জানুয়ারি ২০২১
`

শিক্ষকতা জীবন ও কিছু ঘটনা

-

১৯৮৩ সাল। ঢাকার জগন্নাথ কলেজে নাইট শিফটে শিক্ষকতা করছি। থাকি ‘সনাতনধর্মী’ অধ্যুষিত এলাকা লক্ষ্মীবাজারে। মা মারা গেছেন। তাই মন খারাপ। বড় বোন দু’দিন বাসায় রইলেন। এক বিকেলে পাশের সনাতনধর্মী ছোট ছেলেটা আমার বড় ছেলেটাকে ‘কিছু একটা’ করেছে। সে প্রায়ই তাকে উত্ত্যক্ত করে থাকে। সে ছেলের ডান গালে এক চড় বসালাম। এতে ওরা খুব চটে যান।

সন্ধ্যায় পাঁচ-ছয়জন যুবক এসে আমার বাসার সামনের পুবের দরজায় আমার সাথে তর্ক জুড়ে দিলো। আমার বড় বোন আমাকে ভেতরে ডেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। বাড়ির ভেতর থেকে ছেলের বোন ওদের বলছে, ‘দরজা ভাইঙ্গা ফালা, শাঁখারি বাজার খবর দে’। ছেলেগুলো দরজার সামনে দাঁড়ানো। আবার দরজা খুললাম। তাদের নাম জানতে চাইলাম। ওরা সবাই নিজেদের এমন সব নাম বলল যা শুনে বুঝা মুশকিল, এরা সনাতনধর্মী নাকি মুসলমান। বললাম, ‘তোমাদের ভালো নাম বলো’। তারা বলল না। একজন লম্বামতো ফর্সা যুবক স্যুট পরিহিত সবার চেয়ে বয়সে বড়। সে এগিয়ে এসে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘আপনি আর এমন করবেন না, শুধু এটুকু বলুন’।

বললাম, ‘সে কচি ছেলে, তার গায়ে হাত তোলার আমার দরকার কী। কিন্তু আমার ছেলে তো তার চেয়েও ছোট। সে প্রায়ই আমার ছেলেকে উত্ত্যক্ত করে। তাই এমনটা হলো। সে ছেলেকে বলে দিন সে যেন আর এমন না করে।’ ওদিকে ওই যুবতী চেঁচাচ্ছে- ‘এর কথা কী শুনছস? এরে লাগা’।

যুবকটি সনাতন ধর্মাবলম্বী। অ্যাডভোকেট বলে নিজের পরিচয় দিলেন। আবার বললেন, ‘শুধু আমাকে বলেন, আপনি আর ছেলেটাকে মারবেন না।’ আমি বললাম, ‘কেন তাকে মারতে যাব?’ যুবতী মেয়ে বাড়ির ভেতর থেকে চেঁচাচ্ছে, ‘এরে মার, শাঁখারি বাজার খবর দে’।

আমি আর দরজা খুললাম না। কিছুক্ষণ পর তারা সবাই চলে গেল। রাত ৮টার দিকে বোনকে বললাম, ‘কলেজ থেকে আসি’। কলেজে এ প্রসঙ্গে কারো সাথে কোনো কথাই বললাম না। ১০টার দিকে কলেজ থেকে ফেরার পথে দেখলাম সেই অ্যাডভোকেট লক্ষ্মীবাজার রোড ধরে উল্টো দিকে যাচ্ছেন। আমাকে দেখলেন কি দেখলেন না জানি না, আমি তাকে দেখলাম। একদিন সামনের সরু রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেই ছেলেটির মা আমার সামনে আমার বাসার আসবাবপত্রের দিকে চোখে ইশারা করে স্বগতোক্তির মতো উচ্চারণ করলেন, ‘এই বাসার সব আমাদের’। এ কথার কোনো অর্থ বা হেতু বুঝলাম না। চুপ করে রুমে চলে এলাম। ওই মহিলা প্রায়ই আমার কাছে টাকা চাইতেন। প্রথম প্রথম ক’দিন দিয়েছি। কিন্তু কাঁহাতক পারা যায়? আর দেবোই বা কেন? এরপর আর দেইনি বলে ওরা আমার ওপর ক্ষ্যাপা। সে কারণে তারা আমার ছেলেকে উত্ত্যক্ত করত এবং ওই ঘটনাটি ঘটেছিল। এরপর লক্ষ্মীবাজার থেকে ভূতের গলি চলে গেলাম।

এর মধ্যে আমাকে টাঙ্গাইল করটিয়া সা’দত কলেজে বদলি করা হয়েছে। থাকি টাঙ্গাইল শহরে আদালতপাড়ার এক টিনশেড ঘরে। এক সকালে বাসার কাছের দোকানে সিগারেট কিনতে গেলাম। দেখি, এক যুবকের সাথে দোকানি বচসা করছে। সে দোকানের ভেতর; আর যুবকটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাকে শাসাচ্ছে। একপর্যায়ে যুবকটি দোকানিকে গালি দিলে সে পানকাটার কাঁচিটা উঁচিয়ে বলে, ‘এক্কেবারে কাইট্টা ফালামু’। যুবকটি বলে, ‘রাখ, চলা দিয়া পিডাইয়া তক্তা কইরা ফালামু। অহন কি আর হেই দিন আছে’? যুবকটি চলে গেলে দোকানিকে জিজ্ঞেস করি, ‘কী হলো মুন্সি?’

সে বলে, ‘স্যার, একটা ছোট মাইয়া আইসা দেশলাই চাইছে। আমি বললাম, একটু দাঁড়াও। দোকানটা কেবল খুলছি স্যার। দোকানের ভেতরও যাই নাই। দোকানে বইসা দেখি, মেয়েডা চইলা গেছে। সে নাকি বাসায় যাইয়া বলছে তারে দেশলাই দেই নাই।’ এই ছেলেডা তার ভাই। সে আইসা আমারে রাজাকার, দালাল, দাড়ি কাইট্টা ফালামু, এই সব গালাগালি শুরু করছে।’ আমি বললাম, ‘ছেলেটা কে’? সে বলল, ‘চিনি না। এরা নাকি অন্য ধর্মী বইলা আমি দেশলাই দেই নাই। কত লোক আমার দোকান থাইকা সদাই নেয়। কে হিন্দু কে মুসলমান, আমি কি তা জানি? আমি দোকান করি, বেচলেই লাভ। এ সব বিচার করলে কি ব্যবসা চলে? তারে আমি বুঝাইয়া বললাম। তার এক কথা। ‘হিন্দু বইলা আমি মেয়েরে দেশলাই দেই নাই।’ বাকিটা তো আপনেই দেখলেন, স্যার।’

এই পরহেজগার দাড়িওয়ালা পাজামা পাঞ্জাবি পরা যুবকটি করটিয়া সা’দত কলেজে বাংলায় মাস্টার্স পড়ে। তাকে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ও পড়তে হয়। এর বিভাগে একাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক আছেন। এই ধর্মাবলম্বী যুবকের কাছে এই দোকানির ‘অপরাধ’, তার যুবক বয়সে দাড়ি, লেবাস এবং পরহেজগারিত্ব। বাংলাদেশে এখন সে ধর্মাবলম্বীদের নাম পরিচয় জেনে তোয়াজ করে চলতে হবে, কারণ এই যুবকের কথায় ‘অহন কি আর হেই দিন আছে?’

১৯৯০-এর দশক। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। থাকি শহরের উত্তর চর্থার একটি ভাড়া বাসার দোতলায়। পাশের দক্ষিণের বাসায় আমার বড় ছেলের স্কুলের এক সহপাঠী থাকে। ও বাড়িতে একটি করোগেটেড অ্যাজবেস্টস শিটের চালার ঘরে সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের বাস। আমার ছেলে তার সমবয়সী আরো ক’জন মিলে সে বাসার উঠোনে বিকেলে খেলে। এক বিকেলে ছেলে দৌড়ে এসে বাসার ভেতর ঢুুকল। পেছনে তাকে তাড়া করে নিয়ে এসে বাসায় ঢুকল এক তরুণী বধূ। বললাম, ‘কী হয়েছে?’

মহিলা বলল, ‘আপনার ছেলে পায়ে পাড়া দিয়া আমার একটা মুরগির বাচ্চা মাইরা ফালাইছে।’ আমি বললাম, ‘ছেলেরে মারলে কি এখন মুরগির বাচ্চাটা ফেরত আসবে। তাহলে আমি নিজেই তারে মারি। ছোট ছেলে খেয়াল করেনি। সে ইচ্ছা করে মুরগির বাচ্চাটা মারেনি। যান, বোন। আর এমন হবে না। ছেলেকে বলে দেবো।’ আমাদের কাছে নালিশ না করে ছেলেকে মারার জন্য নিজেই ছেলেকে তাড়িয়ে এনে পারলে আমার বাসার ভেতরই মারেন। মহিলা রাগে গড় গড় করতে করতে চলে গেলেন।

ভিক্টোরিয়া কলেজে যোগদান করতে এসে এ কলেজে আমার প্রথম অধ্যক্ষ পরহেজগার ড. আবদুুল কাদেরকে তুচ্ছ কারণে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজে লিপ্ত একই ধর্মী যুবকের সাহস দেখেছি। আজ বাসার পাশের অভিন্ন ধর্মী যুবতী বধূর সাহস দেখলাম। ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে তাদের ধমনীতে নব জীবনধারার কী সঞ্চার হয়েছে। তখন আর তারা কাউকে কেয়ার করার কথা না।

আমার ছেলে দক্ষিণের বাসার সহপাঠীর সাথে খেলতে গিয়ে তাদের ছাদের ওপর থেকে লাফ দিয়ে পাশের ঘরের করোগেটেড অ্যাজবেস্টস শিটের চালে পড়লে চালের একটি শিট খানিকটা ভেঙে যায়। এ পরিবারের ১৭-১৮ বছর বয়সের ছেলেটি গিয়ে এ কথা আমাদের বাসার খানিক উত্তরে, তাদের বাড়িওয়ালাকে জানায়। বাড়িওয়ালা আমার মতোই মুসলমান। বাড়িওয়ালার যুবক শ্যালক এসে আমার ছেলেকে বাসায় আক্রমণ করতে উদ্ধত হলো। ভয়ে আমার স্ত্রী দরজা বন্ধ করে রাখে। তখন কলেজে ছিলাম। বাসায় এসে এ ঘটনা শুনতে পাই। সে বাসায় গিয়ে সনাতনধর্মী ছেলেটিকে বললাম, ‘আমাকে জানানোর আগে বাড়িওয়ালাকে বলতে গেলে কেন?’ সে চুপচাপ তাদের দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। কিছুই বলল না। আমার বাড়িওয়ালাকে ১৫০ টাকা দিয়ে বললাম, ‘আমি তো তাদের চিনি না। তাদের এ টাকাটা দেবেন যেন সেটা সেরে ফেলে।’ বাড়িওয়ালা বললেন, ‘তারা যদি এতে রাজি না হয়’? বললাম, ‘এর বেশি লাগার কথা নয়। আপনি বলেই দেখেন না’। বাড়িওয়ালা ফিরে এসে বললেন, ‘তারা আসবে। টাকা আরো বেশি চায়।’

বিকেলে তারা এলেন। তারা ৩০০ টাকা দাবি করলেন। তাদের ২৬০ টাকা দিয়ে বিদায় করলাম। তারা ভাঙা শিটটা সরিয়ে নতুন শিট লাগান। এর সপ্তাহখানেক পর আমার ছেলের দক্ষিণের বাসার সহপাঠীর ফুফাতো ভাই এই নতুন শিটটা পাড়া দিয়ে ভেঙে ফেলে। তবে সেই ছেলের বিরুদ্ধে পরিবারটির কেউ নালিশও করতে গেল না। এবার আর তাদের এটা মেরামত করা প্রয়োজন পড়ল না? সেই শিটটি ভাঙাই রয়ে গেছে। এ রহস্য আমার বোধগম্য হলো না কিছুতেই।

২ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে কলেজের প্রাক্তন ছাত্র অধ্যাপক সুবীর কুমার চক্রবর্তী ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে এলেন। ২৪ নভেম্বর (১৯৯৯ সাল) কলেজের একই ধর্মী প্রতিষ্ঠাতার জন্মবার্ষিকী পালনের উদ্দেশে উচ্চমাধ্যমিক শাখার স্টাফ রুমে এক সভার আয়োজন করেছিলেন। কলেজের কোনো সভাই মিস করি না। অবশ্য এ জাতীয় অনুষ্ঠান এর আগে-পরে আর হতে দেখিনি। সভায় উপস্থিতির সংখ্যা মাত্র ২০-২৫ জন। সংখ্যাগরিষ্ঠই অনুপস্থিত। আমি এ সম্পর্কে কিছু জানি না বলে আলোচনায় অংশগ্রহণ করিনি। আলোচনা শেষে স্থির হলো, স্টাফ কাউন্সিলের সামনের বাগানে প্রতিষ্ঠাতার আবক্ষ মূর্তির পাদদেশে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করা হবে। এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বলি, ‘ইসলাম ধর্ম যাবতীয় পৌত্তলিকতাকে উৎখাত করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তা এই আবক্ষ মূর্তির পাদদেশে পুষ্পার্ঘ্য তাই অর্পণ করতে আমরা পারি না।’

সে সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও কোনো মুসলমান সদস্যই আমার কথায় কর্ণপাত করলেন না। রোজা নামাজের ব্যাপারে যারা অতি উৎসাহী তাদেরও দেখলাম অধ্যক্ষের পেছনে পেছনে আবক্ষ মূর্তির পাদদেশে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করার জন্য হন্যে হয়ে ছুটছেন। স্টাফ রুমে একা রয়ে গেলাম। সবাই বাগানে মূর্তিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের জন্য চলে গেলেন। ইসলামিক স্টাডিজের পরহেজগার শিক্ষকও। স্টাফ রুমের পশ্চিম পাশে একটি হাতলহীন চেয়ারের ওপর রক্ষিত অ্যালুমিনিয়ামের কলসি থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে মুখে দেয়ার সময় লক্ষ করলাম, কী দারুণ উৎসাহে মুসলমান ভাইয়েরা অধ্যক্ষের হাতে ফুলের ডালাটি এগিয়ে দিচ্ছেন এবং নিজেরাও ফুল দিচ্ছেন।

পুষ্পার্ঘ্য পর্ব শেষ করে অধ্যক্ষ স্টাফ রুমে ফিরে বললেন, ‘তাকে পুষ্পার্ঘ্যরে মাধ্যমে সম্মানিত করে আমরা নিজেদেরই সম্মানিত করলাম।’ পারিষদ মাথা নেড়ে তার কথার সায় দিলেন। আরেকদিন কলেজে সরস্বতী পূজা হচ্ছে। ভিক্টোরিয়া কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শাখার স্টাফ রুমের উত্তর পাশের দেয়াল ঘেঁষে কলেজের শতবর্ষ উদযাপন প্রস্তুতি তদারকি করছি। সনাতনধর্মী এক শিক্ষক এসে আমাকে অনুরোধ করলেন, ‘স্যার, চলেন পূজামণ্ডপে। ওখানে অনেকেই আছেন। উনি যাদের নাম বললেন, তাদের অধিকাংশই নামাজি মুসলমান। নামাজ রোজা করি না বলে জনান্তিকে আমার নিন্দা করেন তারাই। বললাম, ‘আমি যাবো না’। উনি আমার হাত ধরে টানাটানি শুরু করলেন ‘স্যার, চলেন’। বললাম- ‘যাবো না বললাম। এমন করছেন কেন? তিনি নাখোশ হয়ে চলে গেলেন। এমন আরো ঘটনার উল্লেখ করা যায়।

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপাল, মহিলা সরকারি কলেজ, কুমিল্লা



আরো সংবাদ