২৮ মার্চ ২০২০

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ভাষা আন্দোলন

-

মহান ভাষা আন্দোলনের যে ইতিহাস অনেকের জানা নেই তা হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠা ও মহান ভাষা আন্দোলন একই সূত্রে গাঁথা। সেনাবাহিনীর এ রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা, নির্ভীক ও দুঃসাহসী অফিসার মেজর মোহাম্মদ আবদুল গণি ও মেজর এম আই হোসেন ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন বলে কথিত রয়েছে।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট তদানীন্তন পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের পর অতি অল্প সময়েই বাঙালি মুসলমানদের বহুল প্রতীক্ষিত প্রাণের আকুতি, ক্যাপ্টেন গণির আজীবন লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করতে শুরু করে। সরকার ক্যাপ্টেন গণিসহ অনেকের ইচ্ছানুযায়ী বাঙালি মুসলমানদের জন্য একটি রেজিমেন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর নামকরণ করা হয় ‘দ্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেনাবাহিনীর সদর দফতর থেকে এ প্রথম ব্যাটালিয়ন ‘১ ইস্ট বেঙ্গল’ গঠন করা জন্য পত্র ইস্যু করা হয়। ক্যাপ্টেন গণি ও ক্যাপ্টেন এস ইউ খানকে দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকা সেনানিবাসে এ ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। মেজর এ ডব্লিউ চৌধুরী ও মেজর সাজাউয়াল খানকে নিযুক্ত করা হয় এ ইউনিটের দু’টি কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবে। ক্যাপ্টেন গণি ও অন্য অফিসারদের আপ্রাণ চেষ্টায় মাত্র পাঁচ মাসে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল গঠনের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে ব্রিটিশ সেনা অফিসার লে. কর্নেল ভি জে ই প্যাটারসনকে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক হিসেবে নিয্ক্তু করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বহু প্রতীক্ষিত সে স্মরণীয় ক্ষণ উপস্থিত হয়। ওই ঐতিহাসিক দিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন ১ ইস্ট বেঙ্গল, যা ‘সিনিয়র টাইগার’ নামে পরিচিত। তৎকালীন পাকিস্তানের ইতিহাসে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এ প্রদেশের গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক ব্রাবোর্ন, মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন, মন্ত্রী নবাব হাবিবুল্লাহ, মন্ত্রী হাসান আলী, মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন, মন্ত্রী এস এম আফজাল, মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, মন্ত্রী আবদুল হামিদ, সামরিক বাহিনীর উপ-আঞ্চলিক অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান (পরে প্রেসিডেন্ট), উচ্চপদস্থ সব সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের পর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পতাকা উত্তোলন করেন গভর্নর ফ্রেডারিক ব্রাবোর্ন। শুরু হয় বাঙালিদের গৌরবময় ইতিহাসের শুভযাত্রা এবং মার্শাল রেস (যোদ্ধা জাতি) হিসেবে তাদের নিজেদের প্রমাণ করার সুবর্ণ সুযোগ। অবমোচন ঘটে দুই শ’ বছরের গ্লানি ও অবমূল্যায়নের। এর মাধ্যমে বীজ বপন করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর সেনানীদের। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট শুরুতেই আত্মপ্রকাশ করে উজ্জ্বল সূর্যের মতো। এ যেন আমাদের জাতীয় পতাকারই রক্তিম সূর্যের প্রতিচ্ছবি। ‘সৌম্য, শক্তি ও ক্ষিপ্রতা’র মন্ত্রে দীক্ষিত এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার দীপ্ত আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল ‘বঙ্গ শার্দুল’ বাহিনী। তখন কে জানত, এ রেজিমেন্টই একদিন দেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমাদের বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে উন্নীত করবে?

সংশ্লিষ্ট পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের চা-চক্রে এক অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ যুগান্তকারী ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা হলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান সবার উদ্দেশে বলেন, “From now onwards Bengali Soldiers will speak in Urdu, not in Bengali.” সাথে সাথেই তার এ কথার তীব্র প্রতিবাদ করে মেজর এম আই হোসেন বলে ওঠেন, “Excuse me Sir, in West Pakistan Pathan soldiers have been allowed to speak in Pashtoo and Urdu. Similarly our Bengali soldiers should be allowed to speak in Bengali and Urdu. ক্ষুব্ধ আইয়ুব বলেছিলেন, “Nonsense, absurd, sit down.” ক্যাপ্টেন গণি আইয়ুব খানকে লক্ষ্য করে সবার সামনে আবেগতাড়িত হয়ে বলে উঠলেন, “Excuse me Sir, whatever Major M. I. Hossain has said is not correct. We Bengali soldiers will never speak in Urdu, but in our mothertongue Bengali.” এটা শুনে ক্রুদ্ধ আইয়ুব খান “Shut up. Sit down.” বলে বঙ্গ শার্দুল গণিকে থামিয়ে দেন। দুঃসাহসিক এ ভূমিকার জন্য তখন থেকেই তাকে ‘টাইগার গণি’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। এরকম সাহস ও স্পষ্টবাদিতার উদাহরণ আজকের দিনে একেবারেই বিরল, বিশেষত ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় অকল্পনীয়। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে এভাবেই ভাষা আন্দোলনের ‘সূচনা’ হয়েছিল এবং ‘মেজর গণি’ হলেন এ অদৃশ্য আন্দোলনের সূচনাকারী মহানায়ক।

[email protected]


আরো সংবাদ