২৬ অক্টোবর ২০২০

হঠাৎ অধিকার আদায়ে তৎপর সঙ্গীত সংশ্লিষ্টরা

হঠাৎ অধিকার আদায়ে তৎপর সঙ্গীত সংশ্লিষ্টরা - ছবি : সংগৃহীত

চলতি বছরের জুন মাসের শেষ দিকে কপিরাইট আইন অমান্যের কারণ দেখিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৩ ধারায় দেশের জনপ্রিয় নায়ক ও প্রযোজক শাকিব খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন সঙ্গীতশিল্পী দিলরুবা খান। অভিযোগে একটি মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কর্মকর্তার নামও রয়েছে। দিলরুবা খানের গাওয়া ‘পাগল মন’ গানের কিছু অংশ হুবহু শাকিব খান প্রযোজিত ছবি ‘পাসওয়ার্ড’ ছবিতে ব্যবহার করা এবং তা বাণিজ্যিকভাবে মোবাইলের ইন্টারনেট প্যাকেজে অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করায় এই অভিযোগ করা হয়েছে। যেখানে কপিরাইট আইন ভঙ্গের জন্য ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। দিলরুবা খানের অভিযোগ, শাকিব খান তার প্রযোজিত ছবিতে গানের কিছু অংশ ব্যবহার করার কোনো অনুমতি নেননি।

কয়েক বছর আগে দেশের চার মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সঙ্গীতশিল্পী প্রিতম আহমেদ। এ ছাড়া শিল্পীরা প্রায় সময়ই মেধাস্বত্ব সংরণ এবং রয়্যালটি আদায় যথাযথভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগের সুরাহা করতে শিল্পীদের পক্ষ থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন বা অভিযোগ করতে দেখা যায়নি কখনো। কিন্তু করোনার এই সময়ে এসে হঠাৎ করেই অধিকার আদায়ে শিল্পীদের তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

কপিরাইট আইন সংশোধনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে চিঠি দিয়েছে গীতিকবি সংঘ। যে চিঠিতে রয়েছে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা। ২৩ আগস্ট রোববার সন্ধ্যায় কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীর সাথে গীতিকবি সংঘ সমন্বয় কমিটির চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাাৎ করে ওই চিঠি হস্তান্তর করেন। প্রতিনিধিদলে ছিলেন দেশের চারজন নন্দিত গীতিকবি হাসান মতিউর রহমান, আসিফ ইকবাল, কবির বকুল ও জুলফিকার রাসেল।

গীতিকবি সংঘের অন্যতম নেতা কবির বকুল জানান, ওই আলোচনা সভায় কপিরাইট আইনে গীতিকবিসহ সব সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, প্রযোজক ও মিউজিক লেবেলের ন্যায্য স্বার্থ রার বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ হয় কপিরাইট রেজিস্ট্রারের সাথে। পাশাপাশি লিখিত আকারে দেয়া হয় ১০টি প্রস্তাবনা। সংঘ মনে করছে, ওই প্রস্তাবনাগুলো সংশোধিত কপিরাইট আইনে প্রতিফলিত না হলে সঙ্গীতাঙ্গনে ফিরবে না শৃঙ্খলা। অন্য দিকে রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী কপিরাইট আইন নিয়ে গীতিকবি সংঘের এমন আগ্রহ ও পর্যালোচনার প্রশংসা করেন। সঙ্গীতাঙ্গনে গীতিকবিসহ সব পরে স্বার্থ নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। আলোচনা শেষে গীতিকবি সংঘের প্রতিনিধিরা প্রস্তাবিত কপিরাইট আইনে গীতিকবি সংঘের ১০টি প্রস্তাব সন্নিবেশিত করার জন্য একটি চিঠি কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীর কাছে হস্তান্তর করেন।

বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে গত ৪৯ বছরেও গড়ে ওঠেনি সর্বস্তরের কোনো সংগঠন। এ নিয়ে সঙ্গীতস্রষ্টাদের মধ্যে রয়েছে হতাশা। কারণ, অধিকার নিয়ে কথা বলার কেউ নেই, নেই কোনো প্লাটফর্ম। সেটি কাটিয়ে তোলার লক্ষ্যে চলমান করোনাকাল উপলক্ষ্য করে জোটবদ্ধ হলেন দেশের সর্বস্তরের গীতিকবিরা। সামাজিক মাধ্যমে কয়েক দফা বৈঠক শেষে গত ২৪ জুলাই সৃষ্টি হলো ‘গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশ’ নামের সংগঠন।

এ দিকে গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীদের মেধাস্বত্ব সংরণ এবং রয়্যালটি আদায়ের লক্ষ্যে নতুন সদস্য নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে সঙ্গীতের সিএমও (কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন) বিএলসিপিএস। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম সদস্য হামিন আহমেদ। তিনি আরো জানান, ২২ আগস্ট থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এ দিন বিকেল ৪টায় সংস্থাটির গুলশানের কার্যালয়ে বসেছিল গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও বিভিন্ন ব্যান্ড দল নিয়ে সাধারণ বৈঠক। এ বৈঠক থেকেই প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়।

কার্যক্রমের প্রথম দিনে ফিডব্যাক, ওয়ারফেইজ, সোলস, পেন্টাগন, লালন, আর্টসেল, শূন্য, পাওয়ার সার্জ, ট্রেইনরেক, পরাহ, ওনড, দৃক ব্যান্ডগুলো নিবন্ধন করে। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বিএলসিপিএসের বর্তমান সদস্য ফোয়াদ নাসের বাবু, হামিন আহমেদ ও মানাম আহমেদ। করোনা পরিস্থিতির কারণে ওই সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হন সংস্থাটির চেয়ারম্যান সাবিনা ইয়াসমীনসহ শেখ সাদী খান ও সুজিত মোস্তফা। সরাসরি বৈঠকে এতে আরো উপস্থিত ছিলেন ব্যান্ড তারকা পার্থ বড়ুয়া, বাপ্পা মজুমদার, সঙ্গীত পরিচালক শওকাত, নাভেদ পারভেজ, কণ্ঠশিল্পী পারভেজ সাজ্জাদ প্রমুখ।

বিএলসিপিএসের আইন পরামর্শক ব্যারিস্টার এ বি এম হামিদুল মিসবাহ এই সময় নতুন নিবন্ধিত সদস্যদের সদস্যভুক্তির বিভিন্ন উপকারিতা এবং সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন।

গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীদের ন্যায্য অধিকার আদায় ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্য রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টনে বিএলসিপিএস সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে প্রতিক্রিয়া জানান সংগঠনটির অন্যতম সদস্য ‘মাইলস’ লিডার ও ‘বামবা’ সভাপতি হামিন আহমেদ। বাংলাদেশের গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীদের সিএমও হিসেবে বিএলসিপিএস (বাংলাদেশ লিরিসিস্ট, কমপোজার অ্যান্ড পারফরমার্স সোসাইটি) সরকারি অনুমোদন পায় ২০১৪ সালে।

সঙ্গীত সংশ্লিষ্টদের হঠাৎ অধিকার আদায়ের তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী প্রিতম আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমি একা ছিলাম, আপনারা কেউ একা নন। চারদিকে গীতিকারদের তাদের প্রাপ্য সম্মানী না পাওয়ার প্রচুর অভিযোগ। একই অধিকারে বিচার চেয়ে আমি যখন মামলা করেছিলাম, তখন অনেকেই বলেছিলেন আমি নাকি সবার মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করতে এসব অভিযোগ করেছি। সব অপবাদ একা সয়েছি, কোনো গীতিকার আমার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। অথচ আজ আমার কাছেই সেসব ভুক্তভোগীরা ফোন করে পরামর্শ চান। আমিও তৃপ্তি নিয়ে যতটুকু পারি সাহায্য করি। সেই দিনটির কথা মনে পড়ে, যেদিন একদিকে আমি একা আর বাংলাদেশের চার মোবাইল অপারেটরের চার সিইও কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। তাদের সাথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেয়া অন্তত ২০ জন ব্যারিস্টার। অপর দিকে আমার আইনজীবী আর আমি। আমার সঙ্গীত পেশার একটি মানুষও আমার পাশে ছিল না।

আমি বিশ্বাস করি। একদিন বাংলাদেশের সব গীতিকার ও সুরকার তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরে পাবেন।


আরো সংবাদ