পাহাড়ে নৌ-ভ্রমণ

Printed Edition
পাহাড়ে নৌ-ভ্রমণ
পাহাড়ে নৌ-ভ্রমণ

আব্দুর রহমান

শিরোনাম দেখে অনেকে বিস্মিত নিশ্চয়। পাহাড়ে আবার নৌ-ভ্রমণ! কিভাবে সম্ভব? হ্যাঁ সম্ভব, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি কাপ্তাই লেক। লেকের দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে এই লেক। পাহাড়, লেকের পানি আর মেঘের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম আমরা। ইঞ্জিনচালিত বোটে ঘুরে বেড়িয়েছি সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। এ এক অন্যরকম অনুভূতি, মনে হয়েছে- পাহাড়েই নৌ-ভ্রমণ করছি। লেক, ঝরনা, বিস্তীর্ণ নীল আকাশ, পাহাড় আমাদেরকে বিমোহিত করে।

সম্প্রতি ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে দু’টি গাড়িতে প্রায় শতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু-যুবক-বৃদ্ধ রাত ১০টায় যাত্রা শুরু করি। ভোর ৫টায় পৌঁছাই রাঙ্গামাটি শহরের দোয়েল চত্বরে। আনন্দ ভ্রমণ পরিণত হয় মুদ্রণশিল্পের কারিগরদের মিলনমেলায়।

কাপ্তাই লেক : দক্ষিণ এশিয়ার সবচাইতে বড় লেক এটি। ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত বিস্মৃত। এই লেক ভ্রমণে চোখে পড়ে ছোট-বড় পাহাড়, আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা, বাহারি রঙের নৌকা, সবুজের মিতালি। লেকের একপাশে আছে গাঢ় সবুজ বন গাছগাছালি, ফুল-ফল হরেক প্রজাতির প্রাণের আবাস। প্রকৃতি তার সমস্ত রূপ উজাড় করে দিয়েছে এই লেকে। পাহাড়ের কোলঘেঁষে লেকের অথৈ পানিতে নৌ-ভ্রমণ অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। ইঞ্জিনচালিত বড় একটি বোট ধীর গতিতে চলছে, আর আমরা অবলোকন করছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বোটেই চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেরা প্রতিভা প্রকাশে ছোট-বড় সবাই অংশগ্রহণ করে। কবিতা আবৃত্তি, কৌতুক আর গানে গানে মুখরিত। নিজেদের চাঙ্গা রাখতে চলে চা আর বিস্কুট। ভ্রমণের আনন্দ আর বিনোদন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

শুভলং ঝরনা : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত উঁচু পাহাড়ি ঝরনা। শুভলং ঝরনার নির্মল পানির ছোঁয়া হৃদয়ে এক ভিন্ন অনুভূতির কাঁপন তোলে। ঝরনার পানি পাহাড়ি সোপান বেয়ে নিচে নেমে এসেছে। প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু থেকে নিচে আছড়ে পড়ে এবং অপূর্ব সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ করে। চলতে চলতে অপার সৌন্দর্য চোখে পড়ে এবং আবেগময় করে তোলে। শুভলং ঝরনা রাঙ্গামাটি শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে বরকল উপজেলায় অবস্থিত।

পাহাড়ি গ্রাম : একেবারেই শান্ত নিরিবিলি নির্জন ছোট্ট একটি পাহাড়ি গ্রাম। পাহাড় দিয়ে ঘেরা গ্রামটি ছবির মতোই সুন্দর। কাঠ, বাঁশ, সন-টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরবাড়ি। রহস্য আর রোমাঞ্চে ভরপুর পাহাড়ি মানুষগুলোর জীবন। খুব কাছ থেকে ওদেরকে দেখে অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়। কিভাবে উপার্জন করে, কি খায়, জীবনযাপন পদ্ধতি ইত্যাদি। রাঙ্গামাটির পাহাড়ি গ্রামগুলোতে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মুরং, বোম, খুমি, খেয়াং, চাক, পাংখোয়া, লুসাই, সুজেসাওতাল, রাখাইন জনগোষ্ঠী বসবাস করে।

পেদাটিংটিং : একটি চাকমা শব্দগুচ্ছ, এর অর্থ- পেট টান টান। অর্থাৎ মারাত্মকভাবে খাওয়া-দাওয়ার পর পেটের যে টান টান অবস্থা থাকে সেটিকেই পেদাটিংটিং বলে। কাপ্তাই হ্রদের ভাসমান একটি পাহাড়ে অবস্থিত এই পেদাটিংটিং রেস্তোরাঁ। এখানেই আমরা দুপুরের ভোজ সম্পন্ন করি।

আর্মি ও নেভি ক্যাম্প : কাপ্তাই লেকের পাড়ে বিশাল এলাকা নিয়ে সেনা ও নৌবাহিনীর ক্যাম্প এবং বিনোদন স্পট আছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক কাপ্তাই বাঁধের অদূরে গড়ে তুলেছে পর্যটন কেন্দ্র। এখানে পাহাড়ের আড়ালে নিজেকে হারিয়ে অনুভব করা যাবে অনাবিল প্রশান্তি। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার অন্যতম একটি জায়গা, প্রকৃতির বৈচিত্র্যতা আর নজরকাড়া সৌন্দর্য। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বানৌজা শহীদ মোয়াজ্জম ঘাঁটিতে অবস্থিত আড়াই হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে লেক প্যারাডাইস পিকনিক স্পট অ্যান্ড রিসোর্ট। এখানকার বেঞ্চে বসে কাপ্তাই লেকের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। নানা জাতের পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখরিত। জাহাজের আদলে তৈরি করা পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে হ্রদ ও পাহাড়ের সবুজ বনানীর অপূর্ব নিসর্গ উপভোগ করেছি।

রাতে হোটেলে গিয়ে খাবার খেয়ে চলে যায় পূর্ণ বিশ্রামে। ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই এক ঘুমে সকাল। শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের যাত্রা। সড়ক পথে সিএনজিতে ঘুরে বেড়াই দর্শনীয় স্থানগুলোতে।

ঝুলন্ত ব্রিজ : সিম্বল অব রাঙ্গামাটি। রাঙ্গামাটি শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ৩৩৫ ফুট লম্বা ঝুলন্ত সেতু। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ১৯৮৬ সালে এই সেতুটি নির্মাণ করে। শহরের শেষ প্রান্তে দু’টি বিচ্ছিন্ন পাহাড়ের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে দিয়েছে রঙিন এই ঝুলন্ত সেতু।

পলওয়েল পার্ক : পলওয়েল পার্কের প্রবেশমুখ ও টিকিট কাউন্টার মুখোশের আদলে তৈরি করা। রাঙ্গামাটির প্রাণকেন্দ্রে জেলা পুলিশের তত্ত্ব¡াবধানে নির্মিত এই পার্কে বাঙালি জীবনের সাথে মিশে থাকা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। ঢেঁকিঘর, গ্রামীণ নারীদের ঢেঁকিতে ধান ভানার ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যের স্থাপত্যশৈলী এতটাই সুনিপুন, প্রথম দেখায় মনে হয়েছে বাস্তব কোনো দৃশ্য। একটু এগিয়েই কলসি কাঁখে নারীর ভাস্কর্যে ঝরনাধারা প্রবাহিত। পার্কের শেষপ্রান্তে আছে লাভ পয়েন্ট, ক্রোকোডাইল ব্রিজ পার হয়ে যেতে হয় এই পয়েন্টে। আরো আছে সুইমিংপুল, লেকে ঘোরার জন্য বোট, জেট স্কিইং এবং কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা। লেকের পাড়ঘেঁষে রাখা আছে বিচ চেয়ার। এখানে বসলে কাপ্তাই লেকের মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। সামনে যতদূর দৃষ্টি যায়, লেকের অথৈ পানির সীমানা যেন দূরের আকাশে গিয়ে মিশেছে।

আরণ্যক হলিডে রিসোর্ট : স্নিগ্ধ বিকেল বেলায় চলে যায় আরণ্যক রিসোর্টে। কাপ্তাই হ্রদে ঘেরা শান্ত ও ছিমছাম পরিবেশের ছবির মতো সাজানো গোছানো। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত এই রিসোর্টে রয়েছে ছোটদের জন্য বিভিন্ন রাইড, হ্যাপি আইল্যান্ড, ওয়াটার ওয়ার্ল্ড, পেডেল বোট, সুইমিংপুল, পানিতে ভাসমান রেস্টুরেন্ট ও খেলাধুলার ব্যবস্থা। রিসোর্টটি সবুজ ঘাসে মোড়ানো, আছে নান্দনিক ফুলের বাগান ও নানা রকম ভাস্কর্য।

ভ্রমণে আমাদের সাথে ছিলেন দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের অডিট কমিটির চেয়ারম্যান পরম শ্রদ্ধেয় খন্দকার এনায়েত হোসেন, ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার জাকির হোসেন, এজিএম অপারেশন্স বদরুজ্জামান, ম্যানেজার এডমিন রাকিবুল ইসলাম, নয়া দিগন্তের আইটি ম্যানেজার মিজানুর রহমান এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা। সবসময় সাথে থেকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন নয়া দিগন্তের রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি পুলক চক্রবর্তী, নানিয়ারচর সংবাদদাতা মেহেদি হাসান।

ঘোরাঘুরি আর মার্কেট শেষে সমাপনী অনুষ্ঠান হয় হোটেলের হলরুমে। হাতঘড়ি উপহার পেয়ে সবাই উচ্ছ্বসিত। এরপর গাড়িতে চেপে বসি আমরা, ভোরবেলা ঢাকা পৌঁছে যাই। অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের সেই মুহূর্ত মনে থাকবে সবসময়। স্মরণীয়, অসাধারণ, রোমাঞ্চকর, প্রাণবন্ত এই আনন্দ ভ্রমণ ছিল প্রতীক্ষা আর মেলবন্ধনের বোঝাপড়া।

ছবিতে লেখক