গাজায় ১৮ মাস ধরে ইসরাইলের গণহত্যা চলছে। এখন আর কেউ হতবাক হয় না। মানবতাবিরোধী অপরাধ এখন স্বাভাবিক। বিশ্বশক্তিগুলো কিছুই করে না। কেবল উদ্বেগের দুর্বল বিবৃতি দেয়। এমনকি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চিন্তিত নয়। তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর অনাহার ও জনসংখ্যা হ্রাসের যুদ্ধাপরাধে পুরোপুরি সহমত।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র গাজার জাতিগত নির্মূল পরিকল্পনা করছে। তারা জানে, কেউ তাদের থামাবে না।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নীরব। অথচ, গত বছর আইসিসি ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে রায় দিয়েছিল। আইসিজে গণহত্যার ‘প্রকৃত ঝুঁকি’ স্বীকার করেছিল।
ইসরাইলি ইহুদিবাদ-বিরোধী ভাষ্যকার অ্যালন মিজরাহি এই সপ্তাহে এক্স বার্তায় লিখেছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ শুরু করেছে, মনে রাখা উচিত- আইসিজে গত ২৪ মে গণহত্যার বিষয়ে শেষবার আলোচনা করেছিল। তারপর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত ও লক্ষাধিক আহত হয়েছে। শিশুরা অনাহারে মারা যাচ্ছে। অঙ্গহীন হচ্ছে। আইসিজে থেকে একটি শব্দও আসেনি। ইহুদিবাদ ও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ আন্তর্জাতিক আইনকে বাতিল করেছে।’
নৃশংসভাবে লক্ষ্যবস্তু
গত সপ্তাহে প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (পিআরসিএস) নাগরিক প্রতিরক্ষা ও জাতিসঙ্ঘের কর্মীরা দক্ষিণ গাজায় আহতদের উদ্ধারে যায়। ইসরাইলি বাহিনী তাদের লক্ষ্যবস্তু বানায়।
পিআরসিএস আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের স্থানীয় শাখা। এটি গাজায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেয়। কিন্তু ইসরাইল বারবার তাদের আক্রমণ করেছে।
২৩ মার্চ ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে আটজন পিআরসিএস সদস্য, ছয়জন নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্মী ও এক জাতিসঙ্ঘ কর্মীকে হত্যা করে।
এক সপ্তাহ পর তাদের লাশ রাফায় গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়। গাড়িগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় ছিল। কিছু লাশ বিকৃত, একটির শিরচ্ছেদ করা।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, কিছু লাশের হাত বাঁধা ছিল। মাথা ও বুকে ক্ষত ছিল। বেসামরিক প্রতিরক্ষা মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, ‘ইসরাইলি বাহিনী তাদের হত্যা করে গর্তে ফেলে দিয়েছে। এটি গাজার ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার একটি।’
জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তা জোনাথন হুইটল বলেন, ‘ঈদের প্রথম দিনে আমরা নিহতদের লাশ উদ্ধার করেছি। তারা চিকিৎসাকর্মী ছিলেন। স্পষ্ট চিহ্নিত যানবাহন চালাচ্ছিলেন। তাদের হত্যা করা উচিত ছিল না।’
ইসরাইল এক বছর আগে ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাতজন কর্মীকেও হত্যা করেছিল। নিহতদের মধ্যে ব্রিটিশ, পোলিশ, অস্ট্রেলিয়ান ও একজন মার্কিন-কানাডিয়ান নাগরিক ছিলেন।
ইসরাইল ২০২৩ সালের অক্টোবরে উনআরওয়াকে উগ্রবাদী গোষ্ঠী ঘোষণা করে। তারা ২৮০ জনেরও বেশি কর্মী হত্যা করেছে।
সরকারি নীরবতা
সেভ দ্য চিলড্রেন, মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টাইনিস ও ক্রিশ্চিয়ান এইড ইউকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের বিতাড়নে। ইসরাইলের বর্বরতার বিষয়ে তিনি নীরব।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যামি মিয়ানমারের ভূমিকম্প, ন্যাটো ও ইউক্রেন নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু ইসরাইল-গাজা প্রসঙ্গে তিনি শেষবার মন্তব্য করেছেন ২২ মার্চ। তার বিবৃতিতে ১৮ মার্চ ইসরাইলের হাতে ৪০০ ফিলিস্তিনির হত্যার কোনো উল্লেখ ছিল না। ২০০ শিশুর মৃত্যুর নিন্দাও করেননি। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতর শুধু বলেছে, ‘আমরা ক্ষুব্ধ। আমরা স্বচ্ছ তদন্ত চাই।’
ল্যামি এক্সবার্তায় লিখেছেন, ‘গাজা এখন মানবিক কর্মীদের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক স্থান। দায়ীদের জবাবদিহি করতে হবে।’ কিন্তু দায়ী কারা, তা উল্লেখ করেননি।
অনাচারের যুগ
২০২৫ সালে বিশ্বব্যবস্থা আইনহীন। বড় শক্তি মানচিত্রের সহিংস পুনর্বিন্যাস করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরাইল ফিলিস্তিনকে গ্রাস করবে। রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্ব অঞ্চল দখল করবে। ছোট দেশগুলো দায়মুক্তির সাথে আক্রান্ত হচ্ছে। ইয়েমেন থেকে লেবানন পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তালিকা আরো দীর্ঘ হচ্ছে।
আগে, অন্তত বড় শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক আইন মানার ভান করতো। এখন তারা তা ছুড়ে ফেলেছে। ইসরাইল কখনও আইন মানেনি। এখন সবাই সেই পথ অনুসরণ করছে।
গত সপ্তাহে লন্ডনে একদল যুবক গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছিল। পুলিশ ভবনে হামলা চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে।
এটি অনাচারের যুগ। মানবাধিকার রক্ষাকারীরা এখন রাষ্ট্রের শত্রু। হোক তা ফিলিস্তিনে, লন্ডনে বা কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই



