০১ ডিসেম্বর ২০২০

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে

সাক্ষাৎকারে এইচআরপিবির প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ
-

আলু, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে তার সংখ্যা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। গতকাল শুক্রবার নয়া দিগন্তকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মনজিল মোরসেদ বলেন, আমাদের গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত মনিটরিং দরকার। তবে সেই মেকানিজম আমাদের সরকারের নেই। বাজার লেভেল পর্যন্ত মনিটরিং করার মেকানিজম কোথায়? তিনি বলেন, আলু, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে ইতোমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। আর এই মুহূর্তে মোবাইল কোর্ট ছাড়া আমাদের কোনো হাতিয়ার নেই। তবে সেই মোবাইল কোর্ট যথেষ্ট নয়। মোবাইল কোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে আমাদের প্রত্যেকটা সেক্টরের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। সেই সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, আসল যে টেকসই উন্নয়ন, মনিটরিংয়ের মাধ্যমে, সুশাসনের মাধ্যমে বিষয়গুলোকে ভালোভাবে জনগণের উপকারে নিয়ে আসা সেই জায়গাটার প্রস্তুতিগুলো দেখছি না।
করোনাভাইরাসের মধ্যে যেখানে সব মানুষের আয় কমে গেছে, সেখানে আলু, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার মূল্য নির্ধারণ করছে, মোবাইল কোর্টও পরিচালিত হচ্ছে তার পরও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কিভাবে এসব পণ্যের দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে আসতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে এইচআরপিবি প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ব্যবসায়ীদের যদি মূল্য কমাতে বলা হয়, তারা তো মূল্য কমাবে না। ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন। তারা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাবেন। আজ আলু, কাল পেঁয়াজ, তার পরের দিন লবণ, তার পরে মসলা। সারা বছর ধরে তারা এক সময় না এক সময় এক একটি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করবে। আর ব্যবসায়ীরা তো একজনের সাথে আরেকজন রিলেটেড। বড় বড় হাউজের সব ব্যবসায়ী আছেন। ভাইয়ের আছে তা না হলে বন্ধুর আছে। এক এক সময় হাজার হাজার শত শত কোটি টাকা ওই এক একটি আইটেম থেকে জনগণের পকেট কেটে তারা নিয়ে যাবেন। এটা হবে, এটা চলতে থাকবে। ব্যবসায়ীদের যত দিন ক্ষমতা দেয়া হবে, মন্ত্রিত্ব দেয়া হবে, এটাই চলতে থাকবে। এটা তো কন্ট্রোল করার কেউ নেই। কে কন্ট্রোল করবে? কাজেই আমার দৃষ্টিতে যত দিন ব্যবসায়ীদের দায়িত্বে দিয়ে রাখা হবে, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে তত দিন এটা চলতে থাকবে, কেউ এটা রোধ করতে পারবে না। তারা রাজনীতিতে এসেছেন ব্যবসা করার জন্য। ব্যবসা নিশ্চিত করার জন্য, ব্যবসায় যাতে কোনো সমস্যা না হয়। ভালোভাবে করতে পারে, এ জন্যই তো তারা রাজনীতিতে এসেছেন। এখানে আইনগতভাবে কিছু করার নেই।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিতে পারেন। যেমন সয়াবিনের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলো। তবে ফ্রি অর্থনীতিতে সরকার বা আদালত ইচ্ছা করলেই বলে দিতে পারে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের মূল্য নির্ধারণের আইন আছে। যেমন কৃষি মন্ত্রণালয় আলুর মূল্য নির্ধারণ করল।
আলুর মূল্য নির্ধারণ করার মধ্য দিয়ে মন্ত্রণালয় যারা ব্যবসায়ী তাদের এক লাফে ৩০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে তাদের লাভ দিয়ে দিলেন। সেই জায়গায় কারা নির্ধারণ করছে। নির্ধারণ যারা করছে তারা ব্যবসায়ীদের স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত। যারা সিদ্ধান্তদাতা, সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষেত্রে যদি তাদের স্বার্থসম্পর্কিত থাকে সেখানে নিঃস্বার্থ কোনো সিদ্ধান্ত পাবেন না। ফ্রি অর্থনীতিতে মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া যায় না। তবে বিভিন্ন মেকানিজম যেটা যেমন, মোবাইল কোর্টে আছে মূল্য বৃদ্ধি করতে পারবেন না। বেশি করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ওই সব আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। সরাসরি এত দামে বিক্রি করতে হবে সেটা তো করা যাবে না। যারা এক্সপোর্ট ইমপোর্ট করে তারা কি দামে আনল, তারা কত ইনকাম করবে। এই জন্য মনিটরিং দরকার হয়। গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত। সেই মেকানিজম তো আমাদের সরকারের নেই। বাজার লেভেল পর্যন্ত মনিটরিং করার মেকানিজম কোথায়? ভোক্তা অধিকার একটি সংস্থা আছে। কিন্তু তাদের কতজন লোক আছে। আমাদের কতগুলো বাজার, আর কতজন ভোক্তা অধিকারের লোক আছে? এটা হিসাব করলেই বোঝা যায় যে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা চূড়ান্তভাবে করা হয়নি। এগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত না করা হবে, আজ পেঁয়াজের দাম বেড়েছে, ১৫ দিন পরে কমে যাবে, আমরা স্বস্তি পাবো। আবার সাত দিন পরে আবার রসুনের দাম বাড়বে। কাজেই ব্যবসা যারা করে তাদের টার্গেটই থাকে একটার পর একটা থেকে তারা নিয়ে নেবে।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আরো বলেন, আলু, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে ইতোমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে তারা। এ ছাড়া এই মুহূর্তে কোনো হাতিয়ার নেই। এই হাতিয়ার আছে যে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে। কিন্তু সেই মোবাইল কোর্ট যথেষ্ট নয়। কতজন ম্যাজিস্ট্রেট আছে বলেন, ঢাকা শহরে কতগুলো বাজার আছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে সাপোর্ট লাগে, পুলিশ লাগে। ঢাকা শহরের ১০০ জায়গায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সেই লোকবল নেই। সক্ষমতার অভাব আছে। সেই জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেকটা সেক্টরে সক্ষমতার অভাব রয়েছে। সেই জায়গাগুলোতে বড় ধরনের প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু বড় বড় প্রজেক্ট এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসল যে টেকসই উন্নয়ন, মনিটরিংয়ের মাধ্যমে, সুশাসনের মাধ্যমে বিষয়গুলোকে ভালোভাবে জনগণের উপকারে নিয়ে আসা সেই জায়গাটায় এই যে প্রস্তুতিগুলো আমি দেখছি না।


আরো সংবাদ