০৮ মে ২০২১
`

কুড়িগ্রামে ২০ বছর আগের যে সঙ্ঘাতে ১৬ বিএসএফ নিহত হয়

কুড়িগ্রামে ২০ বছর আগের যে সঙ্ঘাতে ১৬ বিএসএফ নিহত হয় - ফাইল ছবি

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামের একটি গ্রাম বড়াইবাড়ি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের লাগোয়া এই গ্রামটি অবস্থিত। ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল এই গ্রামে ঘটে যায় দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ওই সংঘর্ষে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ১৬ জন সৈন্য নিহত হয়। বিপরীতে বাংলাদেশের তখনকার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (এখন বিজিবি) দু’জন সৈন্য নিহত হয়। বড়াইবাড়ি গ্রামে সীমান্তের অপর পাশে ভারতের আসাম রাজ্যের সীমান্ত।

১৮ এপ্রিলের 'বড়াইবাড়ি যুদ্ধ'
১৮ এপ্রিল ভোর রাতে বড়াইবাড়ি গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা তাদের কৃষিজমিতে সেচ কাজ দেখতে যান। এ সময় তারা দেখতে পান ধানক্ষেতে বহু সৈন্য অস্ত্র নিয়ে হাঁটছে। এই সৈন্যদের মধ্যে কয়েকজন এসে গ্রামবাসীর কাছে হিন্দি ভাষায় জানতে চান, বিডিআরের ক্যাম্প কোথায়? তখন গ্রামবাসী বুঝতে পারেন এরা ভারতের বিএসএফের সদস্য।

বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে বিএসএফ ঢুকে পড়ার খবরটি বেশ দ্রুত বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে পৌঁছে দেন সাইফুল ইসলাম লাল। তিনি নিজেও আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সাইফুল ইসলাম লাল যখন বিডিআর ক্যাম্পে যান তখন ওই ক্যাম্পে মাত্র আটজন বিডিআর সদস্য ছিল।

সাইফুল ইসলাম লাল বলেন, ‘ক্যাম্পের ভেতরে গিয়ে আমি বিডিআরকে বললাম যে বিএসএফ আমাদের এলাকায় ঢুকে পড়েছে। তখন বিডিআর সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুতি নেয়। কিছুক্ষণ পরে আমি প্রস্রাব করার জন্য বাইরে এসে পুকুরের অপর পাড়ে বিএসফ সদস্যদের দেখি। দৌড়ে ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে এ খবর জানাই। সাথে সাথে শুরু হয় ফায়ার। শত শত গুলি, চারিদিক থেকে গুলি। আমিও তখন অস্ত্র হাতে তুলে নিলাম।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে ভোর ৫টা থেকে তীব্র গোলাগুলির আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে উঠে বড়াইবাড়ি গ্রাম ও তার আশপাশের এলাকা। প্রচণ্ড গোলাগুলিতে গ্রামবাসী তাদের বাড়িঘর ফেলে পালিয়ে যেতে থাকে। এ ঘটনা খুব কাছ থেকেই দেখেছেন স্থানীয় রুহুল আমিন। তিনি ২০১৪ সালে ওই এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। যে দিন বিএসএফ বড়াইবাড়ি আক্রমণ করে ওইদিন স্থানীয় মানুষজনকে সংগঠিত করার কাজ করেছিলেন রুহুল আমিন। বিএসএফ-কে প্রতিরোধ করার জন্য বিডিআরের সহায়তায় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১২ জন সদস্যকে একত্রিত করেন তিনি।

রুহুল আমিন বলেন, বিএসএফ যখন বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকে তখন অনেক গ্রামবাসী পালিয়ে গেলেও পরে আবার ফিরে আসে। এরপর তারা বিডিআরের সাথে মিলে বিএসএফের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ভোর ৫টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বড়াইবাড়ি গ্রামে বিভীষিকা মুহূর্ত ছিল। দু’পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়।

বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পের ভেতরে থাকা সাইফুল ইসলাম লাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, ক্যাম্প থেকে তিনি দেখেছেন আনুমানিক কয়েক শ’ বিএসএফ সদস্য বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করেছিল। সাইফুল ইসলাম লালের বর্ণনা মতে, বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পের আটজন সদস্য প্রচণ্ড মনোবল ও সাহস নিয়ে প্রথম চার ঘণ্টা লড়াই চালিয়ে গেছেন।

এরই মধ্যে আশপাশের আরো দু’টি বিডিআর ক্যাম্প থেকে ২০ জন সদস্য বড়াইবাড়িতে আসেন। তারা গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিয়ে বিএসএফ সদস্যদেরকে প্রতিহত করে।

বড়াইবাড়িতে যখন তীব্র সংঘর্ষ চলছে তখন ঢাকায় তখনকার বিডিআর সদর দফতরের নির্দেশনায় জামালপুর ও ময়মনসিংহ থেকে আরো বিডিআর সদস্য পাঠানো হয় কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়িতে। ময়মনসিংহ ও জামালপুর থেকে সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ বিডিআর সদস্যরা বড়াইবাড়িতে গিয়ে পৌঁছায়।

রুহুল আমিন বলেন, ১৮ এপ্রিল ভোর ৫টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত একটানা গোলাগুলি হয়। এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবারো শুরু হয় গোলাগুলি। এভাবে ১৮ এপ্রিল সারাদিন ও রাত গড়িয়ে ১৯ এপ্রিল রাত পর্যন্ত থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। বড়াইবাড়ি সংঘাতে ১৬ জন বিএসএফ সদস্যের লাশ পাওয়া যায় বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও তখনকার বিডিআর সদস্যদের দাবি, ওই ঘটনায় বিএসএফের আরো বেশি সৈন্য মারা গেলেও অনেকের লাশ তারা ভারতে নিয়ে গেছে। বড়াইবাড়ির বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম লাল বলেন, যে ১৬ জন সৈন্যের লাশ নিতে পারেনি তাদেরকে বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে ধানক্ষেতে পাওয়া যায়। ওই ঘটনাটিকে ‘বড়াইবাড়ির যুদ্ধ’ হিসেবেই স্থানীয়রা জানেন।

কেন এই আক্রমণ?
কুড়িগ্রাম সীমান্তে বিএসএফ আক্রমণ করার একটি পটভূমি রয়েছে। বিডিআরের ওই সময়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান ২০১২ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সিলেটের পদুয়াতে। যেখানে বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে ভারতের বিএসএফ একটি ক্যাম্প করে দীর্ঘ দিন ওই জায়গা দখল করে আছে। সিলেটের পদুয়ায় বিএসএফের ওই ক্যাম্প নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কোনো উত্তেজনা ছিল না। ২০০১ সালের প্রথম দিকে ভারতের বিএসএফ তাদের পাশের আরেকটি ক্যাম্পের সাথে সংযোগ সড়ক নির্মাণ শুরু করে বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতর দিয়ে। ওই রাস্তা নির্মাণ নিয়ে বাংলাদেশের বিডিআর আপত্তি তুললেও ভারতের বিএসএফ তাতে কর্ণপাত না করে তাদের কাজ অব্যাহত রাখে। এমন অবস্থায় বিডিআরের ওই এলাকায় তাদের একটি অস্থায়ী অপারেশনাল ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়।

‘আমরা পদুয়াতে যাই। ওইখানে তিনটা ক্যাম্প স্থাপন করি। বিএসএফ ওইখানে ছয়টা ফায়ার করে। এরপর তারা প্রায় ৭০ জনের মতো ওইখানে সারেন্ডার করে। আমরা পদুয়া দখল করে নিয়েছি।’

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান বলেন, পদুয়ার ঘটনার জের ধরে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের বড়ইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্প দখলের জন্য বিএসএফ বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকে।

ভারতের ক্ষোভ ও সঙ্কট সমাধানের চেষ্টা
রৌমারী সঙ্ঘাতের পর বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু সংবাদপত্রে ছবি প্রকাশিত হয়। একটি ছবিতে দেখা গেছে, গুলিতে নিহত একজন ভারতীয় সৈন্যের হাত-পা বেঁধে একটি বাঁশের সাথে ঝুলিয়ে গ্রামবাসী কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে। ওই ছবি ভারতে সাঙ্ঘাতিক ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। ২০০১ সালের ৭ মে ভারতের ইন্ডিয়া টুডে সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এটা এমন এক ছবি যেটি বাংলাদেশ-ভারতে সম্পর্ককে ভবিষ্যতেও তাড়িয়ে বেড়াবে।

ঘটনার দু’দিন পরে বাংলাদেশের ভেতরে নিহত ১৬ জন বিএসএফ সৈন্যের লাশ ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু শুরুতে ভারত ওই লাশ গ্রহণ করতে চায়নি। কারণ লাশগুলো অনেকটাই বিকৃত হয়ে পড়েছিল। বিএসএফের এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে ২০০১ সালের ২০ এপ্রিল ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর যেসব লাশ এনেছিল প্রায় সবগুলোই এতোটা বিকৃত হয়ে গেছে যে তা চেনা যাচ্ছে না। কিন্তু পরবর্তীকালে এক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ওই সঙ্কটের সুরাহা করা হয়। লাশগুলো গ্রহণ করে বিএসএফ।

ভারতের ওই সময়ের স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল পান্ডেকে উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটজন সৈন্যকে একেবারে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। এ ঘটনাকে একটি বর্বর হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেন ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব।

এ দিকে ভারতের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিং দেশটির পার্লামেন্টে বলেন যে এই ঘটনার জন্য বাংলাদেশের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। অন্য দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন যে বাংলাদেশের সৈন্যরা আত্মরক্ষার্থে গুলি করেছে। তবে এই ঘটনায় প্রাণহানির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসাথে তিনি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন।

এই ঘটনার পর বাংলাদেশের তখনকার পররাষ্ট্র সচিব মোয়াজ্জেম আলীকে সঙ্কট সমাধানের জন্য দায়িত্ব দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মোয়াজ্জেম আলী তখন ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে প্রতিদিনই টেলিফোন সংলাপ করেন।

এ দিকে কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ি সীমান্তের সাধারণ মানুষজন মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যে ভারতীয় বাহিনী হয়তো বড়াইবাড়ি দখল করে নেবে। তবে বাংলাদেশের দিক থেকে ক্রমাগত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে সীমান্ত শান্ত হয়ে আসে।

রৌমারী সঙ্ঘাত ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
রৌমারী সঙ্ঘাতের পর অনেকে বিডিআরের ভূমিকাকে ‘সাহসী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। আবার কেউ কেউ তখন এর ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। অনেকে মনে করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যই এই ঘটনা হয়েছিল।

রৌমারীর ঘটনার পর মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানকে বিডিআরের প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনা হয়। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয় মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানকে।

২০১২ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান বলেন, ওই ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করা হলেও এর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘অনেকে বলেন যে শেখ হাসিনার সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য আমি এটা করেছিলাম। কেউ কেউ বলেন যে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে গণ্ডগোল সৃষ্টির জন্য আমি এটা করেছিলাম।’

জেনারেল ফজলুর রহমান বলেন, ‘আপনারাই বিচার করুন। বর্ডারে রক্ষণাবেক্ষণ করবার দায়িত্বেই আমাকে নিয়োজিত করা হয়েছে। আমি যদি ওই সময়ে আপোস করতাম, তাহলে এই সমালোচনা আমাকে শুনতে হতো না। আমার তো কাজই হলো সীমান্ত রক্ষা করা ও সীমান্তের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া।’

সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ