২৩ এপ্রিল ২০২১
`

মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যের ফাঁদে পড়ে মরোক্কোয় যুবকের মানবেতর জীবন-যাপন

মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যের ফাঁদে পড়ে মরোক্কোয় যুবকের মানবেতর জীবন-যাপন - ছবি : নয়া দিগন্ত

নোয়াখালীতে মানবপাচারকারী দলের এক সদস্যকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেফতার করেছে জেলা সিআইডি পুলিশ। গ্রেফতারকৃত মো: হানিফ প্রকাশ মাসুদ (৪০) বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউপির আট নম্বর ওয়ার্ড বসন্তেরবাগের মৃত আলী আজমের ছেলে। তিনি এবং তার সহযোগী মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের ফাঁদে পড়ে মরোক্কোতে এক যুবক মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

বুধবার দুপুরে জেলা সিআইডি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ধৃত আসামিসহ সংঘবদ্ধ মানবপাচারচক্রের অপর সদস্যদের ফাঁদে পড়ে উপজেলার একলাশপুর গ্রামের রফিকউল্যার ছেলে মো: আলাউদ্দিন (৩৯) বর্তমানে মরোক্কোর নাদোর শহরে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ওই ভিকটিম দেশে বেকার অবস্থার কারণে ২০১৯ সালে বিদেশে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য মো: হানিফ প্রকাশ মাসুদ ইউরোপের দেশ স্পেন যাওয়ার জন্য ভিকটিমকে প্ররোচিত ও প্রলুব্ধ করেন। বিনিময়ে ধৃত আসামি ভিকটিমের কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা দাবি করেন। ভিকটিম সরল বিশ্বাসে মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে নগদ ১১ লাখ টাকা মানবপাচারকারীদের দেন। টাকা পাওয়ার পর ২০১৯ সালের ২০ মার্চে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে এয়ার এরাবিয়ার বিমানযোগে ভিকটিম আলাউদ্দিকে দুবাই পাঠিয়ে দেন। দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে ভিকটিম আলাউদ্দিকে পাচারকারীদের অপর দুই সদস্য রিসিভ করে তাদের ভাড়া বাড়িতে নিয়ে রাখেন। ভিকটিম আলাউদ্দিনের সাথে থাকা ৩,০০০ (তিন হাজার) ইউরো পাচারকারীরা নিয়ে নেন। এরপরও পাচারকারীরা আরো টাকা তাদের মনোনীত ব্যাংক একাউন্টে দিতে বললে ভিকটিমের ছোট ভাই মনির হোসেন আজিম গত ২০১৯ সালের ২৫ মার্চে ওয়ান ব্যাংক লি: চৌমুহনী শাখায় নগদ ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা পাচারকারীদের একাউন্টে জমা করেন।

আরো জানা যায়, পাচারকারীরা দুবাই থেকে ভিকটিম আলাউদ্দিনের পাসপোর্টে আফ্রিকার দেশ মালির ভিসাইস্যু করে গত ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে ইউথোপিয়া এয়ারলাইন্সের বিমানযোগে আফ্রিকার দেশ মালিতে পাচার করে দেন। মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য আফ্রিকান ইউরো ও ইব্রাহিমরা মালির বামাকো এয়ারপোর্ট থেকে ভিকটিম আলাউদ্দিনকে রিসিভ করে তাদের বাড়িতে পণবন্দী করে অস্ত্রের মুখে আলাউদ্দিনের পাসপোর্ট নিয়ে যান। ভিকটিম আলাউদ্দিনসহ মানবপাচারের শিকার মোট ১৯ (উনিশ) জনের একটি দল তৈরি করেন। আফ্রিকার দেশ মালি থেকে ইউরো ও ইব্রাহিমের নেতৃত্বে পায়ে হেঁটে অনেকটা পথ যাওয়ার পর লরি গাড়িতে চড়ে সাহারা মরুভূমিও বড় বড় পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিয়ে ৫ (পাঁচ) দিন অনাহারে থেকে মরক্কোর নাদোর শহরে পাচার করে দেন।

মানবপাচারকারী চক্রের অপর সদস্যরা তাদেরকে রিসিভ করে আলাউদ্দিনসহ মোট ৯ (নয়) জনকে তাদের নাদোর শহরের ভাড়া বাড়িতে পণবন্দী করে রাখেন। তখন ভিকটিম আলাউদ্দিন পণবন্দীর বিষয়টি তার স্ত্রী সাবিনা আক্তার নুপুরকে (২৫) ফোনে জানালে তিনি ভিকটিমের মুক্তির জন্য তার স্ত্রী এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য ধৃত আসামি মো: হানিফকে মুক্তিপণ হিসেবে দেন।

এ ঘটনায় নুপুর বেগমগঞ্জ থানায় হাজির হয়ে ধৃত আসামিসহ মানবপাচারকারী চক্রের অপর সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় সিআইডি, নোয়াখালী মামলাটি অধিগ্রহণ করে। মামলা গ্রহণের পরপরই এজাহার নামীয় আসামিরা গ্রেফতার এড়াতে অজ্ঞাত স্থানে পলাতক হয়। সিআইডি‘র তদন্তকালে বাদির দেয়া তথ্য উপাত্ত ও প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে, তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টিম সিআইডি নোয়াখালী আসামিদের শনাক্ত ও তাদের অবস্থান খুঁজে পেতে সক্ষম হয়। পরে বিশেষ পুলিশ সুপার সিআইডি, নোয়াখালীর তত্বাবধানে দীর্ঘ প্রচেষ্টায় মো: হানিফ প্রকাশ মাসুদকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারের পর আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদকালে তিনি জানান, তিনি এবং তার ভাই আব্দুল ওয়াদুদ ও অপর আসামিরা একইসাথে অত্র মামলার ভিকটিমকে ইউরোপের দেশ স্পেনে পাঠানোর কথা বলে তাকে প্রথমে দুবাই নেন, সেখান থেকে মালি এবং সাহারা মরুভূমি পার করে ভিকটিমকে মরোক্কোর নাদোর শহরে নিয়ে আটক রেখে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অংকের মুক্তিপণ দাবি করে বাদিরকাছ থেকে বিভিন্ন একাউন্টের মাধ্যমে প্রায় ১৪,০০,০০০/-(চৌদ্দ লাখ) টাকা নিয়ে যান।

গ্রেফতারকৃত আসামি এলাকায় বেকার এবং বিদেশ গমনে ইচ্ছুকদের বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মোটা অংকের টাকা নিয়ে বিদেশ পাঠানোর কথা বলে বিভিন্ন লোকজনকে পাচার করে দিতেন।



আরো সংবাদ