শহীদ তাহির ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর

১৮ জুলাই সকালে তাহির মাকে বলেন, ‘আমরা আর ঘরে বসে থাকতে পারি না মা, শহীদ আবু সাঈদের রক্তের মর্যাদা রাখতে হবে। আমাকে যেতে দাও।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন

Location :

Rangpur
শহীদ আবদুল্লাহ আল তাহির (৩২)
শহীদ আবদুল্লাহ আল তাহির (৩২) |বাসস

মা-বাবা, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, ছাত্র কিংবা তাকে জানতেন এমন সকলের চোখে আবদুল্লাহ আল তাহির (৩২) ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর। রাজপথে ন্যায়ের পক্ষে লড়াকু সৈনিক।

গত বছরের ১৯ জুলাই শুক্রবার রংপুর শহরের রাজা রামমোহন রায় মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তাহির।

সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী ধার্মিক তরুণ তাহির ছিলেন আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থাবান একজন মানুষ। শৈশব থেকেই তিনি দারিদ্র্য, শারীরিক অসুস্থতা ও নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জীবনের বন্ধুর পথে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

তার ধৈর্য ও অধ্যবসায় ছিল অসাধারণ, তিনি যেন এক জীবন্ত উপন্যাসের মতো-যেখানে একের পর এক মানবিক গুণের পাঁপড়ি দল মেলে। শহীদ তাহির ছিলেন সকলের নির্ভরতার স্থল, আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু, ভালোবাসার এক বিশাল সাগর।

তিনি ছিলেন বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব, প্রাণবন্ততা, গাম্ভীর্য, দায়িত্বশীলতা, সৃজনশীলতা, সুস্থ সংস্কৃতিমনস্কতা, সংগঠক, পরামর্শদাতা, চিন্তাবিদ, সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ ও পরিশ্রমী এমন অগুণিত গুণাবলির এক বিরল আধার।

মা শিরীনা বেগমের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান ছিলেন তাহির, তার প্রাইভেট পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে ভালো শিক্ষক, বন্ধুদের কাছে সবচেয়ে আপনজন। অনেকের কাছেই নিজের ভাইয়ের থেকেও কাছের ছিলেন তিনি।

তাহির ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিবিরোধী আন্দোলন এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনবিরোধী নানা আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেন।

তিনি কলম, কবিতা, অভিনয় ও গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ করতেন। দেশের দুর্যোগকালে নিজেকে নিয়োজিত করতেন মানুষের সেবায় ও বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে। তবে তাহিরকে শেষমেশ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস লিখতে হলো নিজের বুকে তাজা রক্ত ঢেলে।

ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি ভ্রমণের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, পাহাড় ও সমুদ্র ছিল তার খুব প্রিয় গন্তব্য।

বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের সাথে কথা বলতে গিয়ে তাহিরের মা মোছা: শিরীনা বেগম (৬০) বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বর্তমানে রংপুর শহরের পূর্ব শালবনের একটি ভাড়া বাসায় একা বসবাস করছেন।

তাহের ছিলেন শিরীনা বেগম ও আবদুর রহমান দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তার বড় বোন রেবেকা ইয়াসমিন রুচি (৩৮) স্বামী ও তিন সন্তানসহ আলাদা থাকেন। ছোট ভাই আবদুল্লাহ আল তাইয়্যিব (২৯) সফটওয়্যার বিষয়ে পড়াশোনা করছেন এবং টঙ্গী পোস্ট অফিসে চাকরি করছেন। তিনি বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক। ছোট বোন আফসানা ফেরদৌসী আঁখি (২৪) চাঁদপুর জেলার ব্যবসায়ী মো: নয়নের স্ত্রী। তিনি স্বামী ও দুই কন্যাসন্তানসহ সেখানে বসবাস করেন।

মা বলেন, ‘তাহির ও আমি প্রায়ই ফজর বা তাহাজ্জুদের সময় একে অপরকে ডেকে তুলতাম। আমাদের মধ্যে প্রতিদিন ছোটখাটো আলাপ হতো।’

ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যেই তাহের আল হেরা ইনস্টিটিউট থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করেন। এরপর তিনি রংপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে ভর্তি হন এবং ২০১৮ সালে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পান। এরপর তিনি রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু সামিউল ইসলামের অনুরোধে পরবর্তী বছর তিনি ঢাকার বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসে সিরামিকস বিভাগে ভর্তি হন।

তাদের অষ্টম সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু অর্থাভাবে তাহের ফরম পূরণ করতে পারেননি, তাই পরের বছরে পরীক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৪ সালের ১০ জুলাই তিনি রংপুরে ফিরে আসেন, তখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। পড়ালেখা, বাসাভাড়া ও পরিবারের খরচ চালাতে তাহির কখনো হোটেলে কাজ করেছেন, কখনো প্রাইভেট পড়িয়ে, অটোরিকশা চালিয়ে, লন্ড্রিতে কাজ করে, কখনো আতর, পাঞ্জাবি কিংবা হেডফোন বিক্রি করে উপার্জন করেছেন।

ঢাকায় আন্দোলনের শুরু থেকেই তাহের সক্রিয় ছিলেন। রংপুরে ফিরে আসার পর ১১ জুলাই থেকে আবারো নিয়মিত মিছিলে অংশ নেন। এরই মধ্যে ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন, যা সারাদেশের মানুষকে নাড়া দেয়। এরপর রংপুরে কারফিউ জারি করা হয়।

১৮ জুলাই সকালে তাহির মাকে বলেন, ‘আমরা আর ঘরে বসে থাকতে পারি না মা, শহীদ আবু সাঈদের রক্তের মর্যাদা রাখতে হবে। আমাকে যেতে দাও।’

ওই দিন রংপুর জেলা স্কুল মাঠ থেকে শুরু করে ১৫ কিলোমিটার হেঁটে জাইগিরহাট পর্যন্ত মিছিলে অংশ নেন তাহির। পথে তিনি রাবার বুলেটের আঘাতে আহত হন। সেদিন রাতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বন্ধুর সাথে খেয়ে রাত ১১টা ৩০ মিনিটে বাড়ি ফেরেন।

পরদিন ১৯ জুলাই সকালে তাহির গোসল করে পেঁপে ভাজা দিয়ে ভাত খান। মাকে বলেন, ‘মা, আবারো এমন করে পেঁপে ভাজা দিয়ে ভাত খাওয়াবেন, অনেক ভালো লেগেছে।’ সেই সকালেই মায়ের কাপড় সেলাই করছিলেন তাহির।

মাকে বলেন, ‘আজ মিছিল থেকে ফিরে এসে কাপড়টার সেলাই শেষ করব।’ মা বলেন, ‘তোর চোখে গতকাল রাবার বুলেট লেগেছে, এখনো ব্যথা যায়নি। আজ আর মিছিলে যাস না।’

তাহির উত্তরে বলেন, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’ মা আর আটকায়নি।

ওই দিন তাহির তার বন্ধু- আসিফুজ্জামান আসিফ, নাজির হোসেন চাঁন ও সুমন হোসেনের সাথে সকাল ১১টায় শাপলা স্কয়ারে মিলিত হন। জুমার নামাজ শেষে তাহির আবার মায়ের সাথে কথা বলেন। সেই ছিল তাদের শেষ কথা।

জুমার পর তাারা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদ স্কয়ারে যান, যেখানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পরও মানুষের ভিড় বাড়ছিল। সেখানে তাহির জাতীয় পতাকা হাতে তুলে বলেন, ‘ভাইয়েরা, আমাদের নেতৃত্ব দিতে হবে।’ এ সময় খবর আসে- সিটি বাজার এলাকায় বিশাল গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। তাহির ও বন্ধুরা সেদিকে এগোতে থাকেন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজা রামমোহন মার্কেট এলাকায় পুলিশ প্রথমে রাবার বুলেট, পরে সরাসরি একে-৪৭ দিয়ে গুলি চালায়।

আসিফুজ্জামান বলেন, ‘তাহির আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, পাশে থাকো, পুলিশ ধাওয়া দিলে দূরে সরো।’

তিনি বলেন, ‘হঠাৎ দেখি নাজির ও এক যুবক তাহিরকে দুই হাত-পায়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। পেটের ডান পাশে ছোট গর্ত, মনে হলো রাবার বুলেট। কিন্তু পেছনে বিশাল গর্ত দেখে আমরা বুঝলাম এটি একে-৪৭ এর গুলি। তাহিরের পাকস্থলি ভেদ করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

তিনি আরো বলেন, ‘তাহিরের মুখে তখনও অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি। তিনি তখনও কালিমা পড়ছিলেন: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)।’ আমি তখন ক্রমাগত কাঁদছিলাম।’

ছাত্রদের সহায়তায় তারা তাহিরকে দ্রুত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

শিরীনা বেগম বলেন, ‘ঘরে আসরের নামাজের সময় সূরা ফাতিহা পড়া শুরু করার সাথে সাথেই আমি অলৌকিকভাবে তাহিরের কফিনটি আমার চোখের সামনে দেখতে পেলাম। আমার মনে হয়েছিল এটা আমাকে বিভ্রান্ত করার এবং আমার নামাজ নষ্ট করার জন্য শয়তানের একটা কৌশল। তিনি আবারো নিয়ত করে আসরের নামাজ পড়তে শুরু করেন এবং একই দৃশ্য আবার দেখতে পান। তিনি নামাজ চালিয়ে যান এবং শেষ করেন।’

তিনি বলেন, ‘নামাজের পর, আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি...যদি তিনি চান, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ...আমি তাহিরকে ক্ষমা ও জান্নাত দান করার জন্য প্রার্থনা করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন আমি নামাজের মাদুরে বসে ছিলাম, তখন আমার মোবাইল ফোন বেজে ওঠে।’ ফোন কল পাওয়ার সাথে সাথে আসিফুজ্জামান তাকে ঘটনাটি জানান।

খবর পেয়ে তাহিরের মা, তার বন্ধু আরিফ শাহরিয়ার নিলয় এবং শাহরিয়ার হোসেনও সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হাসপাতালে আসেন। রাত ৮টায় তাহিরকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচার চলতে থাকে, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। গুলিটি তির্যকভাবে বেরিয়ে আসে, যার ফলে তার ভেতরের অঙ্গে সাত থেকে আটটি বড় ক্ষত দেখা দেয়।

আসিফুজ্জামান বলেন, ‘রাত ১০টায় তাহিরকে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরই মধ্যে তার বাবাও এসেছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাহির মারা যান।’

তাহিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসিফুজ্জামান, সামিউল, নাজির, সুমন এবং শাহরিয়ার বলেন, তাহির কখনো জোরে কথা বলতেন না। তার ঠোঁটে সবসময় একটা বিশুদ্ধ হাসি থাকত, সেই হাসি কত সুন্দর ছিল! তিনি সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন।

আসিফুজ্জামান বলেন, ‘তাহির বাংলাদেশের আকাশে স্বাধীনতার নতুন সূর্য উপহার দিয়েছেন। এই স্বাধীন বাংলায়, যদি আমার ছেলে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে আমি তার নাম রাখব আবদুল্লাহ আল তাহির এবং তার আদর্শে তাকে বড় করব, ইনশাআল্লাহ।’

তাহিরের বন্ধু আসিফ বলেন, ‘তাহির আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। তিনি কেবল আমাদের বন্ধু ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণা। তাহির ছিল সাহস, সততা আর সংগ্রামের অন্যনাম।’

এভাবেই এক সাহসী তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে রক্ত দিয়ে নতুন ইতিহাস লিখে গেছেন। শহীদ তাহিরের আজ আর নেই, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর চিরদিন প্রতিধ্বনিত হবে বাংলার রাজপথে, তরুণদের অন্তরে।

তাহিরের মা শিরীনা বেগমের মতো, তার বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নির্দোষ তাহিরের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।