পার্বত্যঞ্চল নিয়ে মিয়ানমারের আরাকানদের নীল নকশা

এসএম মিন্টু, কক্সবাজার থেকে ফিরে

জেলেদের অপহরণের পর নির্যাতন :: দিনে এক বেলা খাবার জুটলেও পচা- পোকামাকড়ে ভরা :: মুক্তিপণের টাকা আদায় বিকাশ-নগদে

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ১৭ দিন বন্দী থেকে ফিরে আসা মৎস্যজীবী মাসুদুল হাসান
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ১৭ দিন বন্দী থেকে ফিরে আসা মৎস্যজীবী মাসুদুল হাসান |নয়া দিগন্ত

মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পার্বত্যঞ্চল নিয়ে নীলনকশা তৈরি করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সীমান্তে নাফ নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া মাঝি ও জেলেদের অপহরণের পর মুক্তিপণ নিয়ে তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাঁটি ও অবস্থান সম্পর্কে নানা জিজ্ঞাসাবাদ করছে। শুধু তা-ই নয়, পার্বত্যঞ্চলে তাদের ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে বলেও মুক্তি পাওয়া একাধিক জেলে নয়া দিগন্তের কাছে স্বীকার করেছে। আরাকান আর্মি অপহৃত জেলেদের পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। তবে সীমান্তে অতন্ত্রপ্রহরী হিসেবে বিজিবি সদস্যরা টহল দেয়ায় অপহরণের সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছেন অপহরণের শিকার জেলেরা। তারা বলেন, বিজিবির সহযোগিতায় পরিবারের দেখা পেয়েছেন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ১৭ দিন বন্দী ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী মৎস্যজীবী মাহমুদুল হাসান। এই সময়ে তাকে রাখাইন রাজ্যের একটি বিচ্ছিন্ন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। ক্যাম্পটি আরাকান আর্মি (এএ) নিয়ন্ত্রণ করছিল।

মাহমুদুল প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের ও মিয়ানমারের মাঝামাঝি জলসীমায় মাছ ধরছিলেন। ১১ ফেব্রুয়ারি মাহমুদুল এবং তার তিন সদস্যের ক্রু অনিচ্ছাকৃতভাবে মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবাহিত হয়ে পড়ে। উঁচু জোয়ারের কারণে তাদের জালটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দূরে চলে যায়। যতই তারা জাল টানার চেষ্টা করছিল, ততই এক সশস্ত্র গ্রুপ আসে একটি নৌকায়, যার মধ্যে সাতজন ছিলেন, তাদের মধ্যে দুজন অস্ত্রধারী। তারা কোনো প্রতিরোধের সুযোগ না দিয়েই মৎস্যজীবীদের আটক করে নিয়ে যায় দুর্গম পাহাড়ে।

মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রথমে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করি যে, জোয়ার বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের জাল ভাসতে ভাসতে চলে গেছে, কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি।

তিনি বলেন, মৎস্যজীবীদের প্রথমে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী একটি বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের কড়া নজরদারিতে রাখা হয়। ৪৮ ঘণ্টা ধরে অতি সঙ্কীর্ণ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা হয়।

তিনি বলেন, মূত্র ত্যাগের জন্য আমাদের শুধু একটি বালতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো প্রকার অন্যান্য সুবিধা ছিল না। আমাদের কেবল ওয়াশরুমে নিয়ে যেত, তারপর আবার একই ঘরে এনে দরজা বন্ধ করে দিত।

মাহমুদুল বলেন, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২৮ জনকে অন্যান্য মৎস্যজীবীসহ মুক্তি দেয়া হয়। সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর, আরাকান আর্মির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলায় আমাদের সীমান্তে সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে আসে। তারা আমাদের সেনাসদস্যদের সংখ্যা জানতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের তথ্য জানাতে চাপ দেয়া হয়। আমি তথ্য দিতে অস্বীকার করায় আমাকে মারধর করা হয়েছিল, তবে আমরা চুপ থেকেছি এবং খুব বেশি তথ্য দেয়া হয়নি। দুই দিন পর, মাহমুদুল এবং তার অন্যান্য সঙ্গীদের পাহাড়ি এলাকার একটি কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে তারা পরবর্তী ১৫ দিন বন্দী থাকে।

খাবারের বিষয়ে মাহমুদুল বলেন, ‘আমাদের কেবল এক মুঠো ভাত এবং সেদ্ধ কলার কাণ্ড দেয়া হতো। কখনো কখনো শুধু মুসুর ডাল দেওয়া হতো, তবে তা পচা ছিল এবং তাতে পোকা ছিল। এমনকি আমাদের দেয়া পানি ছিল পোকামাকড় এবং সিগারেটের ছাইযুক্ত।

মাহমুদুলের ভাষ্য অনুযায়ী, একই ক্যাম্পে কমপক্ষে ছয়জন বাংলাদেশী মৎস্যজীবী বন্দী ছিল। আমরা তাদের অনুরোধ করেছিলাম যেন আমাদের একবার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ দেয়, যাতে তারা মনে না করে আমরা মারা গেছি, কিন্তু তারা অস্বীকার করেছিল।

অবশেষে তাকে মুক্তি দেয়া হয়, তবে তার নৌকা আরাকান আর্মির কব্জায় থেকে যায়। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমি দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। নতুন মাছ ধরার নৌকায় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নৌকাটি তৈরি করি। ঋণ পরিশোধের আগেই সমুদ্রে বিপদে পড়েছি।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে নাইক্ষ্যংদিয়া পুকখালি পয়েন্ট থেকে অন্তত ২৩ জন মৎস্যজীবী তাদের নৌকাসহ আটক হয়েছিল, যা শাহ পরীর দ্বীপ থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মাত্র ৩০০ মিটার নৌপথের কারণে প্রতিদিনই প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় জেলেদের।

২০ বছর ধরে মৎস্যজীবী হিসেবে কাজ করা মো: শফিউল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা জানি যে প্রতিদিন দুই বা তিনজন মৎস্যজীবীকে আরাকান আর্মি জোরপূর্বক আটক করছে। তারা আমাদের নৌকা যদি সামান্য ভুল করেও তাদের এলাকায় প্রবেশ করে, তাহলে তারা আমাদের বাংলাদেশে ঢুকে আটক করে। শফিউল্লাহ দাবি করেন, ‘আরাকান আর্মি (এএ) সাধারণত প্রতি জেলেদের মুক্তির জন্য এক লাখ বা দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। তাদের কাছে বাংলাদেশী সিম কার্ড ছিল এবং তারা নির্যাতনের ছবি এবং ভিডিও পাঠিয়ে পরিবার থেকে মুক্তিপণ আদায় করত। তারা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে মুক্তিপণ সংগ্রহ করত, যা মূলত বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ পরিচালনা করত। তিনি বলেন, এই গ্রুপটির সাথে আরাকানদের পরিবারগুলোর সংযোগ রয়েছে।

২১ বছর বয়সী মৎস্যজীবী আব্দুর রহমান, যিনি ১৭ দিন এএ ক্যাম্পে বন্দী ছিলেন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের বন্দিত্বের সময় কিছু বাংলা ভাষী আরাকান আর্মির সদস্যরা বলেছিলেন, তাদের পরিবার কক্সবাজার এবং টেকনাফে বসবাস করে। আমরা শুনেছি, তারা মৎস্যজীবীদের পরিবারের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৩৫ লাখ টাকা আদায় করেছে। এটি অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন হয়েছে। জেলেদের সন্দেহ কয়েকজন মৎস্যজীবী সন্দেহ করেন যে, এই টাকা মূলত এই আরাকানদের কাছে চলে যায়।

বিজিবি টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) জেলেদের মুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিজিবি টেকনাফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আরাকান আর্মি আমাদের জেলেদের কেবল তখনই নিয়ে যায়, যদি তাদের নৌকা তাদের এলাকায় প্রবেশ করে, তবে এটি সত্য নয় যে তারা আমাদের এলাকায় প্রবেশ করেছে। আমি মনে করি আরাকান আর্মি সক্রিয় হতে এবং স্বীকৃতি পেতে চায়, এজন্য এমন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সুখবর হলো, আমাদের সাথে আরাকানদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা সাড়া দিচ্ছে। যার কারণে আমরা জেলেদের ফিরিয়ে আনতে পারছি।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুক্তিপণ নেয়ার বিষয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর বলেন, তারা এমন তথ্য এখনো পাননি এবং কেউ এই বিষয়ে কোনো তথ্য প্রদান করেনি। আমরা জানি যে, আরাকানদের মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করছে, যা তারা তাদের এলাকায় প্রবেশের জন্য শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করছে।

বিজিবির নিরাপত্তা পোস্ট সম্পর্কে মৎস্যজীবীদের জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর বলেন, সীমান্তে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং তারা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে। বিজিবি সদস্যরা সীমান্তে সর্বদা সক্রিয় থাকে এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে সমন্বয় করে সীমান্তরক্ষা কাজ করে।

কৌশল সম্পর্কে আশিকুর বলেন, এটি ঘটতে শুরু করে যখন নাফ নদী মাছ ধরার জন্য খুলে দেয়। এখন আমাদের একটি কৌশল ভাবতে হবে, সেইসাথে মৎস্যজীবীদের শিক্ষিত করতে হবে, যাতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়। এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি সরকার সাত বছর ৯ মাস পর নাফ নদীতে মাছ ধরার ওপর দীর্ঘকালীন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে নাফ নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।

এখন নাফ নদীতে মাছ ধরার জন্য শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেয়া হয়েছে : সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শাহ পরীর দ্বীপ থেকে টেকনাফ জেটি ঘাটের মধ্যে মাছ ধরা যাবে।

দ্বিতীয় শর্ত অনুযায়ী, মৎস্যজীবীদের মাছ ধরতে যাওয়ার সময় পাঁচটি নির্ধারিত বিজিবি পোস্টে তাদের টোকেন/আইডি কার্ড দেখাতে হবে। মাছ ধরার পরে তারা বিজিবি সদস্যদের সব ধরনের সাহায্য প্রদান করবে। কোনো মৎস্যজীবীকে চেকপোস্টে জানানো ছাড়া মাছ ধরতে দেয়া হবে না।

মৎস্যজীবীদের বাংলাদেশ সীমান্ত পার করতে দেয়া হবে না। চতুর্থ শর্তে বলা হয়েছে, মৎস্য অধিদফতরের নিবন্ধিত মৎস্যজীবীদের আপডেট করা তালিকা বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রদান করা যাবে, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে কেবল নিবন্ধিত মৎস্যজীবীরাই নাফ নদীতে মাছ ধরতে পারবেন।

পঞ্চম শর্তে বলা হয়েছে, এই অনুমতি সম্পূর্ণ অস্থায়ী। সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তিন মাস পর এই অনুমতি নবায়ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।