বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেছেন, নামাজ ও রোজার মতোই যাকাত আদায় করা একটি ফরজ ইবাদত। একজন মুসলমান হিসেবে নামাজ ও রোজার ফরজ বিধানকে আমরা সঠিকভাবে পালন করলেও যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অথচ দারিদ্র্য দূর করতে যাকাতভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থার বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার (৪ মার্চ) বিকেলে নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরী আয়োজিত ‘সমাজ উন্নয়ন ও আত্মশুদ্ধিতে যাকাত ও রমাদান’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তারই (আল্লাহ) ইবাদত করতে হবে। অন্য কারো বিধান মানার কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া যাকাতের হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করা সম্ভব নয়। তাই যাকাত ব্যবস্থা চালু করতে হলে আগে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এজন্য জাতীয় সংসদে কুরআনের আইন পাস করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যাকাত হলো সম্পদের পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধি অর্জন করার সর্বোত্তমপন্থা এবং এটা দরিদ্র ও হতবঞ্চিতদের হক। এই হক তাদের কাছে নির্ধারিত নিয়মে পৌঁছানো জরুরি। পবিত্র কুরআনে যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে নামাজের কথা বলা হয়েছে, সাথে সাথেই যাকাতের কথাও সেখানে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে যাকাত প্রদানের আটটি খাত রয়েছে। সুতরাং সম্পদশালী ব্যক্তিকে ঈমানদার হতে গেলে অবশ্যই তার সম্পদের যথাযথ হিসাব করে নির্ধারিত যাকাত দিতে হবে। যাকাতভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই আর্ত-মানবতার অর্থনৈতিক মুক্তি রয়েছে। আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই যাকাতভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।’
সাহেবে নেসাবগণকে রমজানের শুরুতেই যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত-বন্দিগীতে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রাজশাহী মহানগরী আমির ড. মাওলানা কেরামত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক অধ্যক্ষ মো: শাহাবুদ্দিন। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহা: বিলাল হোসাইন।
জামায়াতের মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক শাহাদাৎ হোসাইনের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান, জামায়াতের মহানগরীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাহবুবুল আহসান বুলবুল, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা: হাসানুজ্জামান হাসু, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের রাজশাহী জোনের ইনচার্জ নুরুল আমিন।
অন্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের রাজশাহী মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য সারওয়ার জাহান প্রিন্স, অধ্যাপক মাইনুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন সরকার, আশরাফুল আলম ইমন, তৌহিদুর রহমান সুইট, মাওলানা রুহুল আমিন, কামরুজ্জামান সোহেল, হাফেজ নুরুজ্জামান, সালাউদ্দিন আহমদ প্রমুখ।
সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা কেরামত আলী বলেন, ‘ধনীদের সম্পদের উপর আল্লাহ বিত্তহীনদের অধিকার দিয়েছেন। যাকাত ধনীদের কাছ থেকে নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হয়। ফলে এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হয়। যাকাত আদায় ও বণ্টনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে এটা কায়েম নেই। ফলে জামায়াতে ইসলামী তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাকাত আদায় ও কোরআনে বর্ণিত আটটি খাতকে বিবেচনা করে সুষ্ঠুভাবে তা বণ্টনের ব্যবস্থা করে আসছে। ফলে সাহেবে নিসাব যারা আছেন, তাদেরকে জামায়াতে ইসলামীর এই যাকাত আদায় কার্যক্রমে যাকাত প্রদান করে সমাজের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা পালনের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সিয়াম ফরজ করেছেন তাকওয়া অর্জনের জন্য আর রমজান মাস হলো তাকওয়া অর্জনের মূল সময়।’
তিনি রমজান থেকে শিক্ষা নিয়ে তাকওয়াভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
উপস্থাপিত প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. বিলাল হোসাইন বলেন, ‘যাকাত ইসলামী অর্থব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের জনসাধারণের প্রায় ৯০% মুসলিম। অথচ দেশে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান হ্রাস না পেয়ে বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে ইসলামী শরীআতের নির্দেশিকা পূর্ণ অনুসরণ করে যাকাত ভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাকাতের সুষ্ঠু বিলি-বণ্টনের মাধ্যমে ত্রাণ, পুনর্বাসন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ঋণ বাস্তবায়ন প্রকল্প ও শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার মানোন্নয়ন ও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হবে।’
অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালুর মাধ্যমে সুদমুক্ত বাংলাদেশ গঠন হবে। সুদ ব্যবস্থায় মানুষ শোষিত হয়। যাকাত ব্যবস্থায় মানুষের সম্পদের পরিশুদ্ধতা হয়। শুধুমাত্র যাকাত ও ওশর আদায়েই নয়, প্রত্যেক মুসলিমকে দ্বীন কায়েমের জন্য তার মাল ও জান কুরবানির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যাকাত আদায় যেভাবে ফরজ। একইভাবে দ্বীন কায়েম করাও ফরজ। দ্বীন কায়েমের জন্য অর্থ, সম্পদ, মেধা, ঘাম, শ্রম ও সময় দিতে হয় এবং হবে।’



