২৩ অক্টোবর ২০২০

কালো তালিকাভুক্ত ওয়াসার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো আবারো সক্রিয় হচ্ছে

কালো তালিকাভুক্ত ওয়াসার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো আবারো সক্রিয় হচ্ছে - ছবি : সংগৃহীত

জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসার প্রায় পৌনে ৪০০ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ হওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা আবারো বিভিন্ন কারসাজি করে নতুন কাজ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এডিবি তাদের অর্থায়নে হওয়া কাজগুলো না করতে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি ঢাকা ওয়াসাকেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে। যার প্রেক্ষিতে ঢাকা ওয়াসা ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই চক্রটির বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে বেসিক ব্যাংক থেকেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। কালো তালিকাভুক্তির পরও নানা কৌশল ও তদবিরে ওয়াসারই অন্য প্রকল্পের কাজ পাওয়ার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 
এডিবির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ওয়াসার ‘ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ (ডিডব্লিউএসএনআইপি) প্রকল্পে ৩৭৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার কাজের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এই প্রকল্পের অর্থায়নে রয়েছে এডিবি। অথচ ‘দরপত্রে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পরস্পর যোগসাজশ ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার বিষয়ে প্রমাণ পায় এডিবি। প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা আলাদা নামে দরপত্র দিলেও তাদের ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ অন্যান্য তথ্য একই রকম পাওয়া গেছে।’ প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে জাহা এন্টারপ্রাইজ (জাহা), পারুমা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস (পারুমা) ও এসএ এন্টারপ্রাইজ (এসএই)। আর নোটিশ পাওয়া ব্যক্তি দু’জন হলেন নীলসাগর গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান হাবীব লেলিন ও ঠিকাদার মো: আতিক হোসেন রাব্বী ওরফে প্রকৌশলী নোবেল।

নিজস্ব অর্থায়নের কাজের দরপত্রের বড় ধরনের জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়ায় গত ১৭ জুলাই এডিবির অ্যান্টি করাপশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রিটি সচিবালয়ের ইন্টিগ্রিটি কমিটির প্রধান ডেবিড বিনন্সের স্বাক্ষরে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে ই-মেইল বার্তা পাঠানো হয়। বার্তায় ওই তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী তিন বছর নিষিদ্ধ করা হয়। ওই ই-মেইল বার্তায় বলা হয়, এডিবির দুর্নীতিবিরোধী ও সততা নীতি (এআইও) অনুযায়ী ‘ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ (ডিডব্লিউএসএনআইপি) প্রকল্পের (প্যাকেজ নম্বর-১০) তিন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দরপত্র গ্রহণ করা হয়নি। ওয়াসার মডস জোন ১ থেকে ১৯ পর্যন্ত ডিএমএস রিহ্যাবিলেটেশন অব ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক ফর এনআরডব্লিউ রিডাকশন ইউথ ওঅ্যান্ডএম সাপোর্টের (৩৪১.৫৮ কিলোমিটার) কাজের বিষয়ে এডিবি অনুসন্ধান করে। অনুসন্ধানে তিনটি প্রতিষ্ঠান পরস্পর যোগসাজশ ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার প্রমাণ মিলেছে। ই-মেইল বার্তায় আরো বলা হয়, ‘এডিবি’র দুর্নীতিবিরোধী নীতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ থাকবে, অর্থাৎ তারা এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত কোনো কাজে অংশ নিতে পারবে না। এই সময়ের মধ্যে তারা কোনো ধরনের আপিলও করতে পারবে না। বিষয়টি ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জানিয়ে দেবে। এডিবি এ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরো বাড়াতে পারবে এবং এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের সাথে করা চুক্তিপত্র বাতিল করতে পারবে।’ 

এর আগে গত ২৪ জুন ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক ও ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: আকতারুজ্জামানকেও ই-মেইল বার্তা পাঠায় এডিবির অ্যান্টি করাপশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রিটি সচিবালয়। এডিবির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুলাই ঢাকা ওয়াসার সচিব শারমিন হক আমির কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন নীলসাগর গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান হাবীব লেলিন, আতিক হোসেন রাব্বী ওরফে প্রকৌশলী নোবেল, পারুমা ও এসএ ইঞ্জিনিয়ারিংকে। এতে এডিবির চিঠির বরাত দিয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণা, জালিয়াতিসহ নানা বিষয় তুলে ধরা হয়। 

এ দিকে ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের ২৬০ থেকে ২৬৩তম সভায় মূল এজেন্ডা ছিল ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের প্যাকেজ-১০ এর দরপত্রে অনিয়ম প্রসঙ্গে। ২৬০তম বোর্ড সভায় বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য দরপত্রে অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরে পুনঃদরপত্র আহ্বানের পরামর্শ দেন। 

ওয়াসার কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, ওয়াসা পরিচালনা বোর্ডে দু’জন সদস্য ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জালিয়াতি ও প্রতারণার বিষয়ে সহযোগিতা করেন। তারা বিভিন্ন সময় ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেয়ার জন্য নানাভাবে চাপ দেন। ওয়াসার প্রকল্পে জালিয়াতি চেষ্টার বিষয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক)। দুদকের একজন পরিচালক বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ এন্টারপ্রাইজ ও পারুমা নীলসাগর গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ নতুন নয়। এ ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে বেসিক ব্যাংকের কয়েকটি শাখা থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাতের অভিযোগ মামলা রয়েছে দর্নীতি দমন কমিশন দুদকে। এসব মামলার পরও জালিয়াতি থেমে নেই নীলফামারী জেলা বিএনপির সাবেক এই নেতা আহসান হাবীব লেলিনের । নিত্যনতুন প্রতারণার কৌশল বের করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। 

এ ব্যাপারে জানতে নীলসাগর গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান হাবীব লেলিনের দু’টি মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার ভাই নীলসাগর গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক আরমান হাবীবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমার ভাই (লেলিন) কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তার সাথে কথা বলতে হলে সরাসরি দেখা করতে হবে। 

তবে ঢাকা ওয়াসার ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক মো: আকতারুজ্জামান বলেন, ‘এডিবির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের (লেলিনের তিন প্রতিষ্ঠান) দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। তারা জবাব দিয়েছে। তাদের জবাব কতটা গ্রহণযোগ্য সেটা যাচাই-বাছাই চলছে। আমরা শিগগিরই এ বিষয়ে ওয়াসা প্রশাসনকে অবহিত করব। তারা বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’


আরো সংবাদ