১৪ নভেম্বর ২০১৯

সরল স্বীকারোক্তি!

রাশেদ খান মেনন - ছবি : সংগৃহীত

দিল বাঁকা বা গরল নয়, এমন মানুষের চলার পথ সব সময় সহজ-সরল। তাদের জীবন হয় আনন্দময়; মানে- মধুময়। তাদের হৃদয়ে জটিলতা বা কুটিলতার কোনো স্থান নেই। এসব ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলে স্বীকার করে নেয়া। তারা হয়ে থাকেন দৃঢ় চরিত্রের। কোনো আড়ষ্টতা বা সংশয় মনের গভীরে বাসা বাঁধে না। এই বৈশিষ্ট্য আপনাআপনি জন্মে না, অর্জন করতে হয়। আর এক দিনে তা আয়ত্তে আসে না। সোজা কথা, এই গুণ অর্জন করা কষ্টসাধ্য।

বিশেষ করে রাজনৈতিক সত্য বয়ান করতে সৎ সাহস লাগে। সত্য শুধু জানলেই বলা যায় না। মতলব বা স্বার্থের আড়ালে অনেক সময় তা ঢাকা পড়ে যায় মনের গহিনে। সেই অরণ্যলোকে সত্য লুকানো থাকে। অনেকে বিপদের আশঙ্কায় সত্যের ধার মাড়ান না। তবে এটা ঠিক, ঝুঁকি নিয়ে কাউকে না কাউকে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে হয়। তবে আমাদের সমাজের বাস্তবতায় বেশির ভাগ মানুষই গা বাঁচিয়ে চলার নীতিতে মজেছেন। এবার ঝুঁকি কবুল করেই সংসদ নির্বাচন নিয়ে ‘নির্জলা সত্য’ কথা উচ্চারণ করলেন আলোচিত রাজনীতিক প্রবীণ বামনেতা রাশেদ খান মেনন।

বরিশালে ১৯ অক্টোবর ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা শাখার সম্মেলনে মেনন বলেছেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। এর বড় সাক্ষী আমি নিজেই। আজ মানুষ তাদের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত। অথচ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আমি নিজেও আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। আজ সেই ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছে না। এমনকি উপজেলা নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোটের অধিকার হারাচ্ছে মানুষ।’

তার এই বক্তব্য শুনে সাধারণ মানুষ বলছেন- তাও ভালো; দেরিতে হলেও ‘কঠিন সত্য’ স্বীকার করে নিলেন মেনন। তাদের অভিমত, এতে তার রাজনৈতিক সৎ সাহসের পরিচয় মিলেছে। অবশ্য এই স্বীকারোক্তি তার নিজের বিপক্ষে একটি শক্ত দলিল হয়ে থাকবে। খুব সম্ভবত সে কথা না ভুলেই তিনি এ কথা বলেছেন। এই বয়ানে তিনি বাহবা পাওয়ার হকদার। নিন্দুকেরা বলছেন, এটি তার সরল স্বীকারোক্তি, না বঞ্চনা থেকে উৎসারিত, বোঝা মুশকিল। এ নিয়ে খানিকটা হলেও ধন্ধে পড়তে হয়। তবে মনকে এই বলে প্রবোধ দেয়া যায়, অসুবিধা নেই- ‘সবুরে মেওয়া ফলে।’ সময়ই বলে দেবে তার বক্তব্যের আসল রহস্য কী।

এই ‘তিতা কথা’ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। তবে বরিশালে দেয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে পাঠানো, কামরুল আহসান স্বাক্ষরিত দলীয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মেনন বলেছেন, ‘বরিশাল জেলা পার্টির সম্মেলনে আমার একটি বক্তব্য সম্পর্কে জাতীয় রাজনীতি ও ১৪ দলের রাজনীতিতে একটা ভুল বার্তা গেছে। আমার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন না করে অংশবিশেষ উত্থাপন করায় এ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।’ জনাব মেনন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের পর হাসিনা সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। তার দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক। কিন্তু ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তাকে আর মন্ত্রিত্ব দেয়া হয়নি। তিনি একাদশ সংসদের একজন সদস্য। নির্বাচন নিয়ে তার এ কথা দেশের বিরোধী রাজনৈতিক জোট বিগত জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন থেকেই বলে আসছে। তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে বরাবরই দাবি করা হয়েছে- এ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও স্বচ্ছ হয়েছে।

বড়ই শরমের কথা। নিজেদের জোটের এক নেতার এমন মন্তব্যে নিদারুণ বিব্রত ক্ষমতাসীনেরা। কিন্তু এ নিয়ে ওই নেতাকে টিপ্পনিও কেটেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কাদের বলেছেন, ‘তিনি যদি বলেই থাকেন, আমার প্রশ্ন হচ্ছে- এত দিন পরে কেন? এই সময়ে কেন? নির্বাচনটা তো অনেক আগে হয়ে গেছে। আরেক প্রশ্ন সবিনয়ে, মন্ত্রী হলে কি তিনি এ কথা বলতেন?’ এ দিকে একটি নিউজ পোর্টালের বরাতে গত সোমবার নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মেনন বলেছেন, ‘মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার কারণে আমি জনগণের ভোটাধিকার হরণের কথা বলছি- বিষয়টি ঠিক নয়।’ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতির দায়িত্বহীন ওই বক্তব্যের সাথে জোটের কোনো সম্পর্ক নেই।’

চমক লাগানো মন্তব্যে মওকা পেয়ে গেছেন বিরোধী নেতারা। সাথে সাথে লুফে নিয়েছেন তারা। মেননের ওই বক্তব্যকে ভোট নিয়ে নিজেদের অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেছেন, “দেরিতে হলেও উনি (মেনন) এটা করেছেন। আমি খুশি। আমি তো এ কথাটি বারবার বলে যাচ্ছি যে, আপনারা কেউ কি ৩০ ডিসেম্বর ভোট দিয়েছিলেন? আমি এই পর্যন্ত একজনের কাছ থেকেও পাইনি যে ‘হ্যাঁ’ দিয়েছেন। এখন উনিও (রাশেদ খান মেনন) কনফার্ম করলেন। এজন্য আমি উনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”

বিএনপির মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী আওয়ামী জোটের এই নেতাকে বলেছেন ‘রাজসাক্ষী’। গত সংসদ নির্বাচন নিয়ে মেননের করা মন্তব্য সম্পর্কে রিজভী বলেছেন, ‘নিশিরাতের সরকারের সঙ্গী রাশেদ খান মেনন যেকোনো কারণেই হোক, এবার নিজের মুখে মহাসত্যটি স্বীকার করেছেন। অবশেষে সত্য কথাটা অকপটে জনগণের সামনে স্বীকার করতে হলো মেনন সাহেবকে। বিবেকের তাড়নায় মেনন সাহেব যে সত্য কথাগুলো বলতে শুরু করেছেন, হয়তো কয়েক দিন পর ওবায়দুল কাদের এবং হাছান মাহমুদরাও তা বলবেন। আর এ কথাগুলো যতই তাদের নিকট থেকে বেরিয়ে আসবে, ততই বন্ধক রাখা আত্মা মুক্ত হবে।

কথায় বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’ সত্যকে কখনো ধামাচাপা দেয়া যায় না। সত্য কোনো না কোনোভাবে প্রকাশিত হয়ই। ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে জনগণের ভোট ডাকাতি করে রাতের গর্ভে সরকারের জন্ম দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় দুর্নীতি, এত বড় কলঙ্ক, জনগণের ভোট নিয়ে এত বড় জুয়াখেলা অতীতে আর কখনোই ঘটেনি। নির্বাচনের নামে ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে জনগণের ভোট কেটে নেয়া, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোট ডাকাতিকেও হার মানিয়েছে।’

মেননের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন ১৪ দলের শরিক বেশ কয়েকটি দলের নেতারা। তারা সংসদ থেকে মেনন ও তার দলের সংসদ সদস্যদের পদত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তার বক্তব্যকে সমর্থনও করেছেন কেউ কেউ। জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেছেন, ‘জনগণ ভোট দিয়েছে। আমরা ভোটের মাধ্যমেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। রাশেদ খান মেনন যা বলেছেন তা উনার ব্যক্তিগত বক্তব্য।’ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেছেন, ‘উনি ও উনার দলের সংসদ সদস্যদের একযোগে পদত্যাগ করা উচিত। উনারা জাতীয় সংসদে থাকার নৈতিক ভিত্তি হারিয়েছেন। উনার এসব কথার উদ্দেশ্য কী?’

ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘যারা এই নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের মুখে এমন কথা মানায় না। এসব কথা উনি বলার জন্য বলেছেন। তিনি হয়তো সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চান। উনি পদত্যাগ করে এসব বললে তখন ঠিক মনে করতাম।’ তবে মেননের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেছেন, ‘আমরা এত দিন ধরে যে কথাগুলো বলে আসছিলাম, মেননের বক্তব্যে তারই প্রতিধ্বনি দেখতে পাচ্ছি। উনি নতুন কোনো কথা বলেননি। যারা এর সমালোচনা করছেন তারাও জানেন, ৩০ ডিসেম্বরের ভোট আগের রাতেই হয়ে গেছে। এখন ভোটের অধিকার ফেরতের রাজনীতিই সবার করা উচিত।’

মোটকথা, বাম নেতা রাশেদ খান মেননের বক্তব্য নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে দেশীয় রাজনীতি, যা জনসাধারণের কাছে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। আমজনতার কাতারে থেকে সবাই বিষয়টি দেখছেন আগ্রহভরে। অনেকে পর্যবেক্ষণ করছেন। মেননের এ স্বীকারোক্তি ‘বিলম্বে বোধোদয়’ না ‘কথার কথা’, তা সময়ই বলে দেবে। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
[email protected]


আরো সংবাদ

ওমানের বিপক্ষে পারলো না জামাল ভূঁইয়ারা ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এক সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ! জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় : যুদ্ধাপরাধীদের নামে কলেজের নাম থাকছে না সেদিন শুধু আমিই নুসরাতের পক্ষে ছিলাম : ওসি মোয়াজ্জেম পেঁয়াজের দাম কী কারণে দু’শ টাকা ছাড়াল বাস্তবিক অর্থেই আমরা ম্যাচে নেই : মুমিনুল প্রথম কর্মস্থলে ২ বছর থাকতে হবে চিকিৎসকদের ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া শুরু করেছিলেন জাতির পিতা : প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে প্রধানমন্ত্রীকে এমপি হারুনের অনুরোধ নিষিদ্ধ হলেন ম্যানচেস্টার সিটি তারকা সিলভা স্পর্শকাতর বিষয়ে  বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের

সকল