১৪ নভেম্বর ২০১৯

দেশে আসলে কী হচ্ছে?

দেশে আসলে কী হচ্ছে? - ছবি : সংগ্রহ

সব না হলেও অনেক কিছুই যেন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। প্রথমত সম্ভাবনাময় এক ছাত্র বুয়েটের আবরার ফাহাদকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে। এই বলিদান কী যথেষ্ট? খুব সম্ভবত না! আমাদের হুঁশে আসতে আরো অনেক প্রিয় মানুষকে ত্যাগ করতে হবে। এ দিকে বিশৃঙ্খলার এক প্রতীক হয়ে গেছেন এখন বুয়েটের ভিসি।

বুয়েটে তার বাসস্থান থেকে ঠাণ্ডা শরীর নিয়ে মৃত পড়ে থাকা আবরারের দূরত্ব ছিল মাত্র দুই-পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। এই কয়েক মিনিট তিনি নিজের এই জীবনে পার হতে বা ছুঁতেই পারলেন না। অবশেষে কোনো মুরুব্বির বকা খেয়ে যখন দৌড় লাগালেন, ইতোমধ্যে ছত্রিশ ঘণ্টা গত হয়ে গেছে। এখন বলছেন, তাকে কেউ জানায়নি। তিনি তো প্রশাসনিক প্রধান। তাকে বাইরের কেউ জানাবে কেন, যদি না উনি ভেতরের কাউকে দায়িত্ব দিয়ে রাখেন?

আসলে না কোনো প্রশাসনিক দক্ষতার গুণবিচারে; না মানবিক গুণবিচারেÑ দু’দিক দিয়েই বুয়েট ভিসি চরমভাবে অযোগ্য ও ব্যর্থ। বকা খেয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালী তিনি দৌড়ালেন, শেষে পৌঁছে ছিলেনও বটে; কিন্তু ততক্ষণে আবরার মাটির নিচে। আবরারের ক্ষমা তিনি পেলেন না। তিনি তো ভিসি, ফলে ভার্সিটির যেকোনো ঘটনায় সামনে থাকার কথা।

আবরার মারা গেছেন ৬ অক্টোবর সারা দিন পেরিয়ে রাত প্রায় ২টার সময়। আর জানাজানি না হয়ে উপায় ছিল না ভোর ৪টার পর থেকে। তবু ৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত নানান চেষ্টা চালানো হয়েছে ঘটনা লুকানোর জন্য। যুগান্তর অনলাইন সকাল পৌনে ১০টায় লিখেছে, ‘হল প্রভোস্ট মো: জাফর ইকবাল খান বলেন, রাত পৌনে ৩টার দিকে খবর পাই, এক শিক্ষার্থী হলের সামনে পড়ে আছে। কেন সে বাইরে গিয়েছিল, কী হয়েছিল, তা এখনো জানা যায়নি’। পরে প্রকাশিত ফুটেজে দেখা যাচ্ছে- ছাত্র কল্যাণ পরিচালকসহ প্রভোস্ট ওই ৭ অক্টোবর ভোর ৪টার মধ্যে জেনে গেছেন কারা আবরারকে কিভাবে মেরেছে। বুয়েটের ডাক্তারও আবরারের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া আবরার হলের সামনে নয়, ভেতরেই সিঁড়ির মধ্যে পড়ে ছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টায় দেশ রূপান্তর, ‘বিতর্কিত’ পেজে লাইক, শিবির সম্পৃক্ততা ছিল নিহত বুয়েট ছাত্রের : ছাত্রলীগ নেতা’- এই শিরোনামে রিপোর্ট ছেপেছে। অর্থাৎ তখনো ছাত্রলীগের দিক থেকে খুনের সাফাই জোগাড়ের চেষ্টা চলছে। বেলা পৌনে ৩টায় বিডিনিউজ জানাচ্ছে- সেতুমন্ত্রী বলেছেন, ‘ভিন্ন মতের বলে মেরে ফেলার অধিকার তো নেই : কাদের’। কারণ ইতোমধ্যে পুলিশ কমিশনারেরা স্বীকার করে নিয়েছেন, এটা ছাত্রলীগের ছেলেদের কাজ। এ ছাড়া ততক্ষণে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতারও হয়েছিল।

শত কথার এককথা হলো- সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ভিন্ন মতের বলে মেরে ফেলার অধিকার তো নেই’। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, তার এ কথা বলতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কত দেরি? একেবারে প্রায় এগারো বছর। এই সরকার ক্ষমতা নিয়েছিল ২০০৯ সালের শুরুতে। এরপর বিশেষত শাহবাগ আন্দোলন থেকেই যে কাউকে ‘জামাত-শিবির’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারলেই এবার তাকে মেরে ফেলা, নির্যাতন করা বৈধ করে নেয়া শুরু হয়েছিল। এই সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে পাঁচ শতাধিকের বেশি গুম-খুনের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে তোলা অভিযোগ তো আছেই। এসব নিয়ে প্রকাশিত দেশী মিডিয়া রিপোর্টে সরকারকেই ‘জামাত-শিবির’ করার সাফাই বেশি দিতে দেখা গেছে। তাহলে?

ইতোমধ্যে বুয়েটের টর্চার সেলে যারা নিপীড়িত হয়েছেন তাদের বয়ানগুলো ফেসবুকে ভেসে ওঠা শুরু হয়েছে।

বুয়েটে সাধারণ ছাত্রদের প্রতিরোধ দানা বাঁধতে সময় লেগেছিল। পুলিশ কমিশনার আর প্রভোস্ট এসেছিলেন সকালে ফুটেজ নিয়ে চলে যেতে। তাতে বাধা দিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ রক্ষার সময় থেকে শুরু করে বিকেলের মধ্যে নির্যাতিত ভুক্তভোগীরা (অসংখ্য চড়-থাপ্পড়, কান ফাটিয়ে ফেলা, পঙ্গু করে ফেলা ইত্যাদি যাদের সহ্য করতে হয়েছিল) তাদের সহপাঠীদের সমর্থনসহ সংগঠিত হয়ে যায়। গত এগারো বছরের পাথর সরে গেল এই প্রথম। যারা ইতোমধ্যে বুয়েটের ভেতরের ফুটেজ দেখতে মনোযোগ দিয়েছেন, তারা হয়তো খেয়াল করেছেন- হলের কোণায় কোণায় ‘র‌্যাগ-নিষিদ্ধ’ বলে পোস্টার।

টর্চার সেলের কাহিনীগুলোকে ‘র‌্যাগ’ বলে চালানোর চেষ্টা দেখেই বোঝা যায়, ভিসি থেকে শুরু করে পুরো হল প্রশাসন কেমন দায়িত্বশীল ছিল। বুয়েটের একজন শিক্ষকের আয় কি এতই কম যে, তাদের কোনো সুবিধা পাওয়ার লোভে কারো অপরাধকে সহায়তা দিতে হবে।

শাহবাগের সময় থেকেই কথিত ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ কালচারটা পরিকল্পিতভাবে চালু করা হয়েছিল। এটা এর আগে কোনো দিন বুয়েটে ছিল না। এটা আসলে ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ বলে কোনো কিছু নয়। এটা হলো, হলের সব ছাত্রছাত্রী ও ভিসিসহ প্রশাসন পর্যন্ত সবার ওপর ছাত্রলীগের বলপ্রয়োগপূর্বক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাদের কাজ মূলত দুটা; এক. ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রলীগ নেতারা যেন হলে সর্ব-কর্তৃত্বময় নির্দেশদাতা। এর নিচে ব্যাচের স্তর অনুসারে একটা প্যারালাল কর্তৃত্ব কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে বুয়েট শাসন করা। আর এ কাজের সাফাই হিসেবে, বিএনপি-জামাত-শিবির ট্যাগ লাগিয়ে এই ক্ষমতা কাঠামোর সহায়তায় বিরোধীদের নির্মূল করা। দেখা যাচ্ছে, অনেক চিন্তাভাবনা করেই কাঠামোটা সৃষ্টি করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কাজটা হলো, ফার্স্ট ইয়ার থেকেই ছাত্রলীগের নেতাদের প্যারালাল ক্ষমতা কাঠামোটা চালানোর উপযোগী করে সৃষ্টি বা ট্রেনিং দেয়া। এটাকেই প্রশ্রয়ের ভাষায় ভিসির প্রশাসন নাম দিয়েছে ‘র‌্যাগিং’। এর ট্রেনিংয়ের ম্যানুয়াল পুলিশের ট্রেনিংয়ের মতো।

আসামির চেয়ে তার ক্ষমতা বেশি বা ওপরে এই উপলব্ধি সৃষ্টি করা বিশেষত তা বিশ্বাস করান এর লক্ষ্য। সরকারি বিভিন্ন বাহিনী সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক হলেও একটা ছাত্র সংগঠন এই ফর্মুলা অনুসারে সৃষ্টি করা এটা ভয়ঙ্কর ও অকল্পনীয় বললেও কম বলা হবে। এটাই আসলে সমাজের নানান স্তর নিয়ন্ত্রণের হিটলারি ফর্মুলা।

বিশেষত বুয়েটের ছাত্রলীগ এভাবেই ট্রেনিংপ্রাপ্ত। প্রথম বা দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র যখন সহপাঠী বা কাউকে ধরে এনে টর্চার করতে সক্ষম হয় এবং এর পরেও কোনো শাস্তি ছাড়া সদর্পে বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাইরের সমাজে ঘুরতে পারে; এর অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট নেতার অধীনে হয়ে যায় ভিসি আর বাইরের পুলিশ প্রশাসন। এই হলো প্যারালাল ক্ষমতা। জামাত-শিবির দমন ও নির্মূল- এই সাফাই বয়ানের কাভারে। বিরোধীপক্ষের ওপর ওভার-পাওয়ারিংয়ের ক্ষমতা।

প্রতি বছর সারা দেশের উচ্চমাধ্যমিক পাস স্টুডেন্টদের থেকে বুয়েট নির্বাচনী পরীক্ষার মাধ্যমে ছেঁকে টপ সাড়ে পাঁচ শ’ স্টুডেন্টকে তুলে আনে। এই আইডিয়াটার জন্য বুয়েটের প্রথম ভিসি প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুর রশিদকে আমরা এই সুযোগে সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে নিতে পারি। তিনি বুঝতেন (১৯৫৮), রাষ্ট্রকে নিজের মতো গড়তে মেধাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার কেন পাইওনিয়ার। এবারের বুয়েটের ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে ভারতীয় মিডিয়া নিজের পাঠকের জন্য বুয়েট কী, তা বুঝাতে একটা শব্দ ব্যবহার করছে Ñ ‘এলিট’ বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট। বাংলাদেশের আমরা বুয়েটের ক্ষেত্রে ‘এলিট’ শব্দ ব্যবহার করি না। ‘এলিট’ শব্দটা মূলত সম্পদ ও সামাজিক ক্ষেত্রে ওপরের স্তরের মানুষ বুঝাতে ব্যবহার করা হয়। ছেঁকে টপ সাড়ে পাঁচ শ’ স্টুডেন্টকে বুয়েটে তুলে আনা হয় বলে এবং কেবল ‘মেধা’ অর্থে, বুয়েট অবশ্যই এলিট। কিন্তু সাবধান, একে টাকাপয়সাওয়ালা সামাজিক এলিট বলা যাবে না। এমনকি যে উনিশ বা এর বেশি তরুণ আবরার হত্যা ঘটনায় আসামি তাদের অন্তত একজন ভ্যানচালকের সন্তান। এটা বাংলাদেশে এখনো সম্ভব। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পয়সা লাগে না, মেধা হলেই চলে। তাই এটা সম্ভব। তবে বুয়েট এতটা চোখের মণি হয়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো, তুলনামূলক অর্থে ইঞ্জিনিয়ারের চাকরির সুযোগ বেশি, এতে সুযোগ সুবিধাও বেশি, আপস ও বিনা খরচে বিদেশে পড়া বা চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। পশ্চিমা গ্রহীতা দেশে তারাই আগে গ্রিন কার্ড পেয়ে যান।

এসব মিলিয়ে পুরা সত্তর-আশির দশক তো বটেই, এমনকি নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত (তবে কিছুটা শিথিলভাবে) বুয়েটের প্রশাসন তুলনামূলকভাবে মডেল বা আদর্শ ছিল। যেমন সবসময়ই কোনো ছাত্রের অসদাচরণের জন্য যদি প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি বসানো হতো, সেটা ছিল যেকোনো ছাত্রের জন্য জীবনের সব স্বপ্ন বরবাদ হয়ে যাওয়ার সমান। কারণ, অল্প কিন্তু সিরিয়াস দোষে বহিষ্কৃত হয়ে যেতে পারে। এর মূল কারণ, স্বচ্ছনীতিতে চলা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। খুব সম্ভবত রশীদ স্যারের সেট করে দেয়া প্রশাসনিক নিয়ম ও আদর্শ তার উত্তরসূরিদের আকর্ষণ, উদ্বুদ্ধ ও বাধ্য করতে পেরেছিল। সমাজে-রাষ্ট্রে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অধ্যবসায় ও পরিশ্রম; আর এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার গুরুত্ব সবাই বুঝত, অন্তত দায় বোধ করত। এর এক বড় কারণ হলো, দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে এর একটা দূরত্ব রাখা। আসলে বুয়েটের ছাত্র বা শিক্ষকরা রাজনৈতিক প্রভাব জোগাড় করে তা খাটিয়ে সুবিধা পাওয়ার চেয়ে নিজ যোগ্যতায় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা সমাজে আরো ঢের বেশি থাকত বলে সে দিকে ছাত্র ও শিক্ষকেরা আগ্রহী হতো না। কিন্তু মোটা দাগে নব্বইয়ের দশক থেকে এর ঢলে পড়া শুরু। মূল কালো জায়গা ভিসি নির্বাচন, আর সেখান থেকে দলবাজি, দলকানা হয়ে নিয়ম-আইন ও রেওয়াজ ভেঙে ফেলা। বড় দুই দলেরই সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মুখগুলো এসব আত্মঘাতী ও অবিবেচক সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী। আর ২০০৯ সালের পর থেকে এরই নতুন ডাইমেনশন হলো, বুয়েটের এক ‘পুলিশ ম্যানুয়ালে’ চলে যাওয়া, যার অর্থ ভিসিসহ প্রশাসন ছাত্রলীগের অধীনে। তাই দেখা গেছে, প্যারালাল ক্ষমতার নির্যাতন কক্ষের বুয়েট।

এটা ভুলে যাওয়ার কিছু নেই যে, গত এগারো বছরে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক নিয়ম নিয়ন্ত্রণ ভেঙে গেছে। এর প্রভাবে একা বুয়েট কতটা ঠিক থাকবে? কিন্তু তাই বলে, ছাত্রলীগের অধীনে ভিসিসহ প্রশাসন চলে যেতে পারে না। পুলিশ কমিশনার এসে ভিসি-প্রভোস্টসহ প্রশাসনকে না ছাত্রলীগ সেক্রেটারিকে জিজ্ঞেস করবেন, ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকবে কি না!

দৃশ্যত সময়টা এখন দায় অস্বীকার করার। যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরম ভাষায় দায়ী করেছেন ভিসিসহ বুয়েট প্রশাসনকে। বলেছেন, ‘বুয়েট প্রশাসনের আরেকটু সতর্ক থাকা দরকার ছিল’। তাহলে ‘কার স্বার্থে’ এতদিন ছাত্রলীগের অধীনে প্রশাসন চালানো হলো?
গত ৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলন (‘যুগান্তর’ লিখেছে) প্রসঙ্গে শিরোনাম, ‘সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হল তল্লাশির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর’। মূলত হলে টর্চার সেল থাকা প্রসঙ্গে কথাটা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোসহ হল তল্লাশির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, হল দখল করে রেখে মাস্তানি করা চলবে না।

সারা দেশে খোঁজ-খবর নেয়া হবে’। এখন যদি তিনি সিরিয়াস হয়ে বলে থাকেন তাহলে জানতে চাই, কী নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, কী অগ্রগতি হলো তাতে। আর যদি কথার কথা এটা হয়ে থাকে তাহলে আর কী বলার আছে? এতটুকুই কেবল জানিয়ে রাখতে পারি যে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার পরিণতি দেখে আমাদের আস্থা কতটুকু সেটাও চাইলে খোঁজ নিতে পারেন। এই প্রসঙ্গে বলতে হয়, আবরার হত্যার এক আসামি ‘অমিত সাহা’, আবরারকে খুনের প্রসঙ্গে তাকে আদালতে তোলার এক ফাঁকে যুগান্তরকে বলেছেন, ‘বুয়েটের ট্র্যাডিশনই এটা যে, অর্ডার ওপরের (সিনিয়র) থেকে আসে। সিনিয়র ব্যাচ অর্ডার দিলে জুনিয়র ব্যাচ তা করতে বাধ্য। এটা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই’।
এই ‘ওপরের’ বলতে কত ওপরের? এটি এক বিরাট প্রশ্ন! জবাব পাওয়া খুবই মুশকিল। ‘সিনিয়র ব্যাচ অর্ডার দিলে জুনিয়র ব্যাচ তা করতে বাধ্য’- বুয়েটে কখনো এমন ট্র্যাডিশনের কথা আমাদের জানা নেই। হতে পারে একালে ২০০৯ সালের পরের কথা।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আইনুন নিশাত প্রমুখ বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে আইনুন নিশাত স্যারের একটা মন্তব্য দেখেছিলাম টিভি নিউজ ক্লিপে যার সারকথাটা হলো- ‘হল প্রশাসন প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্টের হাতে ছিল না’। যেখানে বুয়েট চলে ছাত্রলীগের পুলিশ ম্যানুয়ালে, সেখানে হল প্রশাসন এমনই হওয়ার কথা। প্রশ্ন হলো, তাহলে হল প্রশাসনের প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্ট ‘কোন লোভে’ এই বাড়তি প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে আসতেন? ‘চেতনা’ বা লীগ ভালোবাসেন বলে ছাত্রলীগের অধীনে থাকতে তাদের ভালো লাগত? অথবা এসব বাড়তি কোনো সুযোগ সুবিধার!

জামিলুর রেজা চৌধুরীর উপস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী খুবই নাখোশ। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি, যেটা অবশ্য খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আবার বুয়েট ভিসি ভোয়া এবং যুগান্তরের কাছে বলেছেন যে, কেন জামিলুর রেজা চৌধুরী তার পদত্যাগ চাইলেন? তিনি উল্টা দাবি করেছেন, তিনি কোনো দোষ করেননি। তাই পদত্যাগ করবেন কেন? ভিসি সাধারণ ছাত্রদের সাথে আলোচনায় অন্তত দু’বার ক্ষমা চেয়েছেন। দেখুন ‘যুগান্তরে’, ‘ক্ষমা চাইলেন বুয়েট ভিসি’। এটা কি তাহলে, স্ববিরোধী নয়? আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো- পুরা বুয়েট প্রশাসন ছাত্রলীগের পুলিশি ম্যানুয়ালে বা কাঠামোতে গেল কী করে? ভিসি ছাত্রদের সাথে ওই সভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আগের সব টর্চারের বিচার করবেন।
এতে আসল কথা হলো দুইটা। এক, স্বীকার করলেন, আগে বুয়েটে নির্যাতন হয়েছে। তাহলে কোনো অ্যাকশন নিলেন না কেন? এটা কি আপনার গুরুতর ব্যর্থতা নয়? দ্বিতীয়ত, আপনি এখন বিচার করতে পারবেন কেন? আপনি সরকারের দলীয় হস্তক্ষেপ ঠেকাতে পারবেন, এর নিশ্চয়তা কিভাবে? গত কয়েক বছর ধরে আপনার ওপর ছাত্রলীগের কর্তৃত্ব করা ঠেকাতে পারেননি। ছাত্রলীগের অধীনে চলে গেছেন আপনি। এটাই আপনার অযোগ্যতা। আপনার কাছে এখনো দল অনেক বড়, আপনার ভিসি হিসেবে দায়িত্বের চেয়েও বড়। এর চেয়ে বড় অযোগ্যতা আর কী?

কাজেই ভিসি নিয়োগের পদ্ধতি বদলানো এবং স্বচ্ছ করা ছাড়া, সর্বোপরি রাজনীতিবিদদের দলীয় ভিসি পাওয়া দরকার- এ চাহিদা বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত জাতির মুক্তি নেই।

[email protected]


আরো সংবাদ