১৬ অক্টোবর ২০১৯

আসামে ‘বাঙালি খেদাও’ এবং ষড়যন্ত্র

-

আসামে ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযান নতুন নয়। ১৯২৪ সালের দিকে মওলানা ভাসানী আজকের বিজেপি-প্ররোচিত আন্দোলনের মতোই আর এক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সেখানে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করেন। আসাম ছিল সেকালে অনেকটা হালকা জনবসতির এলাকা। প্রাণ না থাকলেও প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল সেসব অঞ্চল। ঘন জনবসতির বাংলাদেশসংলগ্ন এলাকা থেকে সেখানে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। অস্বাভাবিক ছিল, মানুষের স্বভাবজাত হিংসা-প্রতিহিংসা। স্থানীয়রা বাঙালিদের তাদের দুধ-মধুতে ভাগ বসাতে দিতে রাজি হয়নি। সৃষ্ট দাঙ্গা-হাঙ্গামায় বাঙালিরা যখন অসহায় তখন মওলানা ভাসানী তাদের রক্ষার জন্য আসামে যান। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের সীমারেখা টেনে দেয়া হয় ধর্মের পথে। ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট হয় ভারত ও পাকিস্তান। লাখ লাখ মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও রক্তনদী পেরিয়ে রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিলেন ‘সমস্যার সমাধান হলো’। কিন্তু মানুষের লোভ-লালসা ও স্বার্থ-সুবিধার সঙ্ঘাত চিরন্তন।

বর্তমান সঙ্কট

১৯৪৭ সালের সীমানাপ্রাচীর সঙ্ঘাতের অবসান করেনি, বরং যোগ করেছে নতুন মাত্রা। কে প্রকৃত নাগরিক আর কে প্রকৃত নাগরিক নয়, তার সঙ্ঘাত চলে আসছিল সাত দশক ধরে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট প্রকাশ হয়েছে আসামের প্রকৃত তথাকথিত নাগরিক তালিকা। মোট আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৬৬১। চূড়ান্ত তালিকায় নাম আছে তিন কোটি ১১ লাখ মানুষের। বাদ পড়েছে ১৯ লাখ ছয় হাজার। আসামের এই দীর্ঘায়িত সঙ্কট অসমিয়া বনাম বাঙালি অথবা অসমিয়া বনাম মুসলমান হিসেবে বারবার চিত্রিত হয়েছে। ভারতে নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রদায়িক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সব সমস্যার সমাধান সাম্প্রদায়িকতার মধ্যেই খোঁজা হয়। বিগত নির্বাচনে আসাম তথা গোটা ভারতে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে জয় লাভ করে বিজেপি জোট।

নির্বাচনের আগে অনেকটা প্রকাশ্যে আসামে মুসলমান বিতাড়নের কথা বলে। সেই সাথে তারা এ কথা বলে যে, এরা বাংলাদেশী। গত শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিজেপির এক নেতা সুরেন্দ্র সিং বলেছেন, যারা এনআরসি থেকে বাদ পড়বেন তাদের হাতে দুই প্যাকেট খাবার ধরিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। (নয়া দিগন্ত, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। শুধু আসামেই নয়, ভারতের সব রাজ্যে নতুন নাগরিকপঞ্জি করার ঘোষণা দিয়েছে বিজেপি সরকার। যেসব অঞ্চলে মুসলমানেরা সংখ্যাধিক, সেখানে ঘৃণা ও সঙ্ঘাত ছড়িয়ে দিচ্ছে তারা। ভারতের মুসলিম প্রাধান্যের একটি রাজ্য কেরালা। সেখানে ইতোমধ্যে নাগরিকপঞ্জি নিয়ে শান্ত কেরালাকে অশান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভারত অধিকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাজ্য জম্মু ও কাশ্মিরে কয়েক দশকের পুরনো স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে সেখানে শক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ভারতের সর্বত্র মুসলিমবিদ্বেষ চরমে পৌঁছেছে। মুসলিম বিশ^ সম্পর্কে অবহিত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, নরেন্দ্র মোদি অনুসৃত মুসলিমবিদ্বেষ আশ্রিত এই নীতি ও কার্যক্রমের সাথে আন্তর্জাতিক মুসলিমবিরোধী শক্তির দূরবর্তী পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র রয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং সমৃদ্ধির পথে ধাবমান একটি রাষ্ট্র, তাই বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করার প্রায়াসে চার দিক থেকে আক্রমণে উদ্যত হয়েছে।

আসাম চুক্তি

এখন যে নাগরিকপঞ্জি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস- এনআরসি) নিয়ে তুলকালাম হচ্ছে; সে ধরনের একটি নাগরিকপঞ্জি তৈরি হয়েছিল ১৯৫১ সালে। ওই বছরের আদমশুমারির পর এই তালিকা প্রথম তৈরি করা হয়। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একপর্যায়ে আসামের ছাত্রসমাজ নেতৃত্ব দেয়। ১৯৮৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে তারা একটি সমঝোতাচুক্তিতে সম্মত হয়। এর নাম আসাম চুক্তি। চুক্তিটিতে একটি ভারসাম্য লক্ষ করা যায়। নাগরিকত্বের সর্বশেষ ভিত্তিবর্ষ ধরা হয় ১৯৭১ সালকে।

সর্বশেষ খসড়া তালিকা প্রকাশ হয় ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই। সেই তালিকায় বাদ পড়েন ৪০ লাখ সাত হাজার ৭০৭ জন। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে রাজ্যে আবাস গেড়েছেন, এমন প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের নাম রাখা হয়নি বলে জানানো হয়। এখন যে হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ। পর্যাপ্ত নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও নাগরিকপঞ্জিতে নাম ওঠেনি বা প্রকৃত অনেক নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, এমন অনেক খবর উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে। দীর্ঘ দিন বিএসএফ অথবা সরকারি চাকরি করেছেন, এমন অনেকের নাম বাদ পড়ার ঘটনা ঘটেছে।

শুভঙ্করের ফাঁকি

বাংলা পুঁথিতে এ রকম একটি পদ্য আছে যে, ‘লাখে লাখে সৈন্য মরে, কাতারে কাতার, শুমার করিয়া দেখি ৫০ হাজার।’ আসামের উগ্রবাদী রাজনীতিকেরা অভিবাসী বাঙালিদের সংখ্যা সব সময় অতিরঞ্জিত করে বলতেন। কখনো তারা এই সংখ্যাটিকে ৮০ লাখ বলেছেন। এই সে দিন নির্বাচনের প্রাক্কালে তারা এই সংখ্যাকে ৪০ লাখ বলেছেন। এখন তাদেরই পরিচালিত নাগরিকপঞ্জিতে দেখা যাচ্ছে, কথিত সংখ্যা ১৯ লাখ। সুতরাং বর্ণবাদী রাজনীতিকদের প্রতারণা প্রকাশিত হয়েছে। গ্রামসালিশের সেই কথা ‘সালিশ মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার’-এর মতো বিজেপি নেতারা ৪০ লাখের নিচে নামতে রাজি নন। নিবন্ধনের তালিকা প্রকাশে উষ্মা প্রকাশ করে যাচ্ছেন বিজেপি নেতারা। আসামের অর্থমন্ত্রী হেমন্ত বিশ^শর্মা বলেন, অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা আরো অনেক। কাজেই রাজ্য থেকে প্রতিটি বিদেশী নাগরিককে উচ্ছেদ করার লড়াই চালিয়ে যাবে বিজেপি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা আরো বলেন, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর তালিকা পুনর্মূল্যায়নে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবে তার সরকার।

বুমেরাং

সর্বশেষ পর্যালোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, তালিকাপঞ্জি থেকে বাঙালি হিন্দুরাই বেশি বাদ পড়েছেন। গৌহাটির একটি বাংলা সংবাদমাধ্যম ‘যুগসংঘ’ জানিয়েছে, আসামের হিন্দু বাঙালিদের নথি সঙ্কট রয়েছে। বাদ পড়া ১৯ লাখের মধ্যে ১১ লাখই বাঙালি হিন্দু। মুসলমানদের সংখ্যা ছয় লাখের কিছু বেশি। বাকি দুই লাখের মধ্যে রয়েছে বিহারি, নেপালি ও লেপচা প্রভৃতি। এ বিষয়ে রাজ্যের বাঙালি নেতাদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে নাগরিক সনদ, শরণার্থীর প্রমাণপত্র ও রিলিফ কার্ড ইত্যাদি আমলে নেয়া হয়নি। বিপুলসংখ্যক বাঙালি হিন্দু তালিকা থেকে বাদ পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজেপি নেতৃবৃন্দ। আসামের মুখ্যমন্ত্রী শর্বানান্দ সোনোয়াল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাথে বৈঠকের পর বলেছেন, বাদ পড়ে যাওয়া প্রকৃত নাগরিকদের ফের তালিকায় যুক্ত করার বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকার বিবেচনা করতে পারে। উল্লেখ্য, আসামের বরাক উপত্যকায় রয়েছে ১৫টি বিধানসভা আসন।

মনে করা হতো যে, সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোটে বরাবরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় কংগ্রেস। গত নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠকে উত্তেজিত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিজেপি। তালিকা প্রকাশের পর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা প্রকাশ করছে, এর ফলে বিজেপির ভোটব্যাংকে ধস নামতে পারে। ইতিহাস বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মন্তব্য করেছেন, ‘অসমিয়ার রাজনীতিবিদেরা এত দিন ন্যূনপক্ষে প্রায় অর্ধকোটি আসামবাসীকে অবৈধ বললেও চূড়ান্ত এনআরসির পর নিজ জাতিসত্তার মানুষদের মধ্যে রাজনৈতিক পুঁজি ছিল অবৈধ নাগরিকত্বের বিষয়টি। এই বিষয়কে সামনে রেখেই বিজেপির সাথে তাদের মৈত্রী গড়ে উঠেছিল। সেই মৈত্রী এখন বড় ধরনের ঝাঁকুনিতে দুলে উঠেছে। অনেকেই বলছেন, এনআরসি অসমীয়াদের রাজনৈতিক পুঁজি ছিনতাই করে নিয়েছে।’ (প্রথম আলো, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে নি¤œবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি। বিধানসভার এমন একজন প্রাদেশিক পরিষদ : ‘বিধানসভা’ সদস্য বাদ পড়ায় বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নতুন তালিকাকে বাঙালি হিন্দু নেতারা ‘প্রশাসনিক বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন। কংগ্রেস শাসনামলে মন্ত্রিসভায় এদের প্রতিনিধিত্ব ছিল তিন-চারজন। এখন তাদের সংখ্যা মাত্র এক।

মুসলিমবিদ্বেষ

মুসলমানরা দীর্ঘকাল ধরে এ ধরনের নাগরিকপঞ্জির বিরোধিতা করে আসছেন। তারা মনে করছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি তাদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে। বর্তমান তালিকার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ, কয়েক লাখ মুসলমানকে বাদ দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং স্থানীয় নেতৃত্ব অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের বাংলাদেশ প্রত্যাগত বলে প্রকাশ করছে। বাস্তব সত্য এই যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর কোনো বাংলাদেশী আসামে বসতি গড়েনি। স্বাধীনতার আগে যারা গেছে ‘আসাম চুক্তি’ অনুযায়ী তাদের বিষয়টি মীমাংসিত হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে অতীতের লোকদেরকে বাংলাদেশী বলে প্রমাণ করার কূট ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয় অসমিয়াদের অসৎ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তারা উঠে পড়ে লেগেছে।

বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিপজ্জনক। অঘোষিতভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হলেও বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশ নিরুত্তর। দীর্ঘ দিন ধরে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বাংলাদেশ সরকারিভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ জানায়নি। অথচ বাংলাদেশে কোনো অঘটন ঘটলে ভারত বন্ধুত্বের উচ্চতা ভুলে তার প্রতিবাদ করছে। আসামের সব বাংলা ভাষাভাষী জনগণ কোনো-না-কোনো সময়ে বাংলাদেশ থেকে গেছে- অসংখ্যবার বিজেপিসহ আসামের নেতিবাচক নেতারা এসব কথা বলছেন। বাদ পড়া প্রায় ২০ লাখ জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের মতো যেকোনো সময় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। অথচ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের সাথে সুর মিলিয়ে বললেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’।

একবার অবশ্য নরম সুরে তিনি বলেছিলেন, তারা (বাদ পড়া লোকেরা) বাংলাদেশী নয়। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আসামের সরকার বিভিন্ন সময় আকারে-প্রকারে বলে এসেছে, সেখানে প্রতিবেশী দেশ থেকে অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মূলত সেই অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতেই নাগরিকপঞ্জি তৈরির উদ্যোগ নেয়। অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলে দিলেন, কোনোভাবেই বাংলাদেশে কোনো প্রভাব পড়বে না। তালিকাপঞ্জি সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিসের ভিত্তিতে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। কথিত ২০ লাখ মানুষ যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ হতে পারে, বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি এ সম্পর্কে ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে সতর্ক করেছে।

ডিটেনশন ক্যাম্প

আসামে আইনি নিষ্পত্তির পর যারা তালিকাভুক্ত হতে ব্যর্থ হবে, তাদের পাঠানো হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। আসামের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের ডিটেনশন ক্যাম্প রয়েছে। এগুলো গোয়ালপাড়া, ডিব্রুগড়, শিলচর, তেজপুর, জোরহট এবং কোকড়াঝড়ে অবস্থিত। তালিকা প্রকাশের সাথে সাথে ইতোমধ্যে নতুন করে বিভিন্ন জায়গায় আরো ১০টি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ভারত সরকারের এই ডিটেনশন ক্যাম্পের সাথে নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের তুলনা করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ভারত সরকারের এই ক্যাম্পের ধারণা অযৌক্তিক, অবাস্তব এবং অবৈধ। বর্তমান বৈশ্বিক বিশ্বে বিভিন্ন দেশে অভিবাসী প্রবাহ একটি বাস্তব বিষয়। বিশ্ব আজ রাষ্ট্রহীন নাগরিক ধারণার বিপক্ষে।

নীতিগতভাবে ভারতের এই তথাকথিত নাগরিকপঞ্জি পরিকল্পনা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আসাম বা অন্যত্র থেকে যেসব মানুষকে তারা তাড়াতে চায়, তারা দীর্ঘকাল ধরে সেখানে বসবাস করছে। ভারতের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করছে। তাদেরকে রাজস্ব দিচ্ছে। আকস্মিকভাবে বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এমন কী ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে এসব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ ধরনের লাখ লাখ মানুষ যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ধর্মে মুসলমান, তারা কী অপরাধ করেছে? অপরাধ যে তাদের ধর্মীয় পরিচয়, বিজেপির নেতা-পাতিনেতারা তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রকাশ করছেন।

হিন্দুত্ববাদীদের অসহিষ্ণুতা এতটাই তীব্রতর হয়েছে, শুধু ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান না দেয়ার অপরাধে বেশ কয়েকজন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজেপি প্রধান অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছেন, শুধু আসামেই নয়, দেশব্যাপী অন্যান্য রাজ্যেও নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি হালনাগাদ করা হবে। ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ : ‘রাজ্যসভায়’ ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, সরকার অন্যান্য রাজ্যে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করে সব অবৈধ অভিবাসীকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভারত থেকে বের করে দেবে। তিনি আরো বলেন, বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহার মোতাবেক আন্তরিকভাবে কাজ করবে। দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি থেকে অবৈধ অভিবাসী মূলোৎপাটন করবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর পর ভারতজুড়ে এ ধরনের কৌশলে মুসলমান বিতাড়ন অব্যাহত থাকবে।

ভারত-ইসরাইল আঁতাত

বিশ^ ইহুদিবাদের কার্যক্রম সম্পর্কে যারা অবহিত তারা জানেন, তাদের সর্বনাশের জাল সর্বত্র বিস্তৃত। মুসলমানদের অস্তিত্ববিনাশী পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। দৃশ্যত এসব কথাবার্তা সাম্প্রদায়িক মনে হলেও এগুলোই নির্মম সত্য। প্রথম মহাযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটেন তথা মিত্রশক্তিকে দেয়া বিভিন্ন সাহায্যের বিনিময়ে আসে বেলফোর ঘোষণা। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার জন বেলফোর ফিলিস্তিনে ভবিষ্যৎ ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। মিত্রশক্তি মালাগাছি দ্বীপ অথবা আফ্রিকার যেকোনো অংশে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করলেও তারা জেদ ধরে যে তাদের ঐতিহাসিক ভূখণ্ড ফিলিস্তিনেই তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। ১৯৪৮ থেকে আজ পর্যন্ত (২০১৯) ইসরাইল রাষ্ট্রের অব্যাহত মুসলিম বিশ^ বিরোধী কার্যকলাপ প্রমাণ করে, তারা একটি সর্বাত্মক ধ্বংসের নীলনকশা নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। তারা ইরাকের পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়।

২০০২ সালে নাইরোবিতে সফল কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করে। পাকিস্তানে পারমাণবিক পরিকল্পনা ভণ্ডুল করার চেষ্টা করে। তারা ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। বর্তমান বিশ্বে আমেরিকানদের মতো পাঁচ হাজার মাইল দূরেও যদি একটি পটকা ফোটে, তাহলেও তা ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি বলে মনে করে। এ মুহূর্তে তারা সিরিয়া, লেবানন ও গাজায় বোমা বর্ষণ করছে। ইরানের বিরুদ্ধে ইসলামের তথাকথিত অভিভাবকদের নিয়ে জোট বেঁধেছে। বর্তমান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচনে জিতলে তিনি জর্দান অববাহিকা দখল করবেন।

আরব জাহানকে বশীভূত করার পর ইসরাইলি নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমানভাবে নাক গলাচ্ছে। ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভারত এবং ইসরাইলÑ দুটোই সংবিধান মোতাবেক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বস্তুত দুটো রাষ্ট্রই উগ্র ধর্মীয় এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও শত্রু-মিত্র নির্ণয়ে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পনা রয়েছে। ১৯৫০ সালে নেহরুর ভারত জাতিসঙ্ঘে ইসরাইলের পক্ষে ভোট দেয়। কিন্তু জোটনিরপেক্ষতার নামাবলি, আরব রাষ্ট্রের সংখ্যাধিক্য, সোভিয়েত সম্পর্ক এবং তেল রাজনীতির কারণে প্রকাশ্য স্বীকৃতি দিতে বিরত থাকে। অনেক বছর তাদের গোপন অভিসারের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘রক্ষিতা’ বদনামে ভূষিত হয়।

১৯৯২ সালে কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী খোলস খুলে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেন। কারগিল যুদ্ধে ইসরাইলি সহায়তা ভারতকে যুদ্ধজয়ে এগিয়ে নেয়। নরেন্দ্র মোদি ২০১৭ সালে ইসরাইল সফর করেন। একই বছর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ভারত সফর করেন। উভয় সফরের ফলে ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মতো ‘অতি উচ্চতায়’ পৌঁছে। এখন আমরা এই অতি উচ্চতার ফসল ভোগ করছি। গোটা বিশ^ব্যাপী মুসলমান নিপীড়নের অংশ হিসেবে উভয় রাষ্ট্র একযোগে কাজ করছে- এমন অঘোষিত কার্যক্রম দৃশ্যমান সর্বত্র। আসাম তথা ভারত থেকে মুসলমান বিতাড়নের পরিকল্পনা বৃহত্তর নীলনকশার অংশ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বাংলাদেশ সব সময় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধু একবার বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ বিকেম দ্য হট বেড অব ইন্টারন্যাশনাল ক্লিকস।’ নেতা-নেতৃরা প্রায়ই কথাটি বলে থাকেন। কিন্তু তারাই প্রকারান্তরে ওই ষড়যন্ত্রের নায়ক হয়ে ওঠেন, সে খবর রাখেন না।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী (পরে প্রধানমন্ত্রী) পামারস্টোন বলেছিলেন, ‘গ্রেট ব্রিটেন ডাজ নট হ্যাভ পারমানেন্ট ফ্রেন্ড অর ফো, বাট হ্যাজ গট পারমানেন্ট ইন্টারেস্ট।’ সুতরাং আসাম থেকে বাঙালি খেদাওয়ের মতো অভিযানকে বন্ধুত্বের আদলে নয়, স্থায়ী স্বার্থের মোড়কে বিবেচনা করতে হবে। আসাম বা সেভেন সিস্টার্স ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্য ছিল। ‘বাড়ির পাশের আরশীনগর’ অন্যের হতে পারে না। মাউনব্যাটেনরা উত্তরাধিকারসূত্রে বাংলাদেশ যে ভৌগোলিক জখম করে গেছেন, তার বিষময় ফল আমরা এখন ভোগ করছি। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান মানচিত্র পাল্টে দেয়ার কথা বলেছেন। আসাম সঙ্কটের প্রতিপক্ষ কি আমাদের তা মনে করিয়ে দিতে চায়?

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum