১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মোদির দুর্বল সাফাই

নরেন্দ্র মোদি
নরেন্দ্র মোদি - ছবি : সংগ্রহ

গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদির কাশ্মির দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদি দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন- এই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন।

একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলও মারাত্মক কঠিন হয়ে যেতে পারে যদি এর সপক্ষে একটা সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর পক্ষে সাফাই- অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার মতোই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। একটা ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।

যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা ‘অভিষেক’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হলো, কেউ নির্বাচিত হলে যে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক হয় অথবা কোনো রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হয় অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোনো না কোনো উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যায়। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হলো- প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিলো বা অনুমোদন দিলো। তাহলে মূল কথাটা হলো ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই ক্ষমতা সেটা আসল ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিলো কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হলো না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই অভিষেক ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মির দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির এখন এ অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদির কাশ্মির দখলের ঘটনা অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান আর এদিকে এশিয়ায় হংকংয়ের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, যেটা সম্প্রতি ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা ‘আলীবাবা গ্রুপ’ কিনে নিয়েছে। না এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। এ ছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন। তিনি আসলে থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে। এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভালো, এ নিয়ে কাজ করেন। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদির কাশ্মির দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ। এটিই এখনকার হিন্দুত্বের জ্বর। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে।’ অর্থাৎ অবস্থা এমন যে বিরোধীরা কেউই তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যেকোনো নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার ‘পদ্ধতিগত ভুলের’ বিরোধিতা করছেন। তো এ হলো কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদির পক্ষে এবং জোশে আছে।

সি রাজামোহন মোদিকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তার লেখার শিরোনাম, ‘জম্মু-কাশ্মির ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে।’ অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক- এই দু’জনে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে এটা অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা হিন্দুত্ব অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের পাবলিক বা গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছে- এরা মোদির হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তিও এটাই। যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো। এককথায় এরা সবাই হিন্দুত্বের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। সে অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। মুসলমানেরা সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতোই সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। এই হিন্দুত্ব আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদিকে সাবধান করছেন।

ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ঠিক কামড় বসিয়েছেন। তিনি তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম বা আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি পরিষ্কার। তাই তার ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না- এই প্রচলিত বয়ান ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মোদি ও তাদের আরএসএস এরা- হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই অনুযায়ী এরা কাশ্মির ইস্যুতে কাজ করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য। এ হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই তিনি পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হলো, তার কথা তো কোনো প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদি ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোনো কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদির কোনো বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও প্রিন্টের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদির কাশ্মির দখলের দিনে এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হলো, ‘ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে।’ আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হলো, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদের দেয়া ম্যাসেজ যে ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে ঢুকে আটকে যেও না।

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মিরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মিরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে দশ দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে এটা ছিল মোদির জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মির ইস্যুতে এটা ছিল মোদির দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মির জবরদস্তির পক্ষে মোদির সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন বয়ান হলো ‘বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট’। মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মির এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে। এটা হলো তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মির “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদি ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মির এগিয়ে আছে।
তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদির হোম-ওয়ার্কও নেই। পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ