২০ জুলাই ২০১৯

কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনার জন্য

ডাক্তারদের ধর্মঘট পশ্চিমবঙ্গে - ছবি : সংগৃহীত

মুখ্যমন্ত্রী মমতা নাকি ভীষণ বিপদে আছেন। প্রথম কথা হলো, হ্যাঁ বিপদে তো আছেই; তার কপালে শনি লেগেছে- লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ যেদিন হয়েছে সে দিন থেকেই। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৫৬ হলো অদ্ভুত এক আর্টিকেল, আপাতত মমতার সেই বিপদের নাম। এটা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে প্রয়োগ করিয়ে মোদির কেন্দ্রীয় সরকার ছলে-বলে-কৌশলে চাইলে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার সুযোগ নিতে পারে। কনস্টিটিউশন অনুসারে এটাই ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’।

আসলে এই শাসন কায়েমের নামে কেন্দ্রীয় সরকার যেকোনো রাজ্যে পছন্দের সরকার কায়েম করে নিতে পারে; অনেকটা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর ‘ইমার্জেন্সি ঘোষণা’ দিয়ে ক্ষমতা বাড়িয়ে নেয়ার মতো। তবে ছয় মাসের মধ্যে মোদি সরকারকে ওই সিদ্ধান্ত সংসদে অনুমোদন করিয়ে আনতে হয়। সংসদের নিজ দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখন আছে বলে এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এ প্রবণতা নেহরুর আমল থেকে চলে আসছে। যখনই রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার একই দলের থাকে না, তখনই এই অসুস্থ চর্চা শুরু হতে দেখা যায়।

এভাবে ক্ষমতা নিলে এটা তিন বছর পর্যন্ত রাখা যায়। আর এই সময়ের মধ্যে কেন্দ্র নিজ ‘সুবিধাজনক’ সময়ে রাজ্যে নির্বাচন দিলে তখন নিজে জিতে আসবে বলে আস্থা পায়। তখন নির্বাচন করানো নিজ দলের রাজ্যসরকার কায়েমের সবচেয়ে সহজ উপায়। সদ্য লোকসভা নির্বাচন শেষে ফলাফল প্রকাশের আগেই ২০ মে সুবীর ভৌমিক লিখেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির অজুহাত তৈরি করছে বিজেপি!’

কিন্তু ভারতের কনস্টিটিউশনে কেন এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, এর পক্ষে যুক্তি? আমেরিকায় এর কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ৫০ রাজ্যের কোনো একটায় ক্ষমতা দখল করেছেন, এটা কেউ কল্পনাও করে না। কিন্তু ভারতে ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ জারির পক্ষে প্রধান সাফাই বা কমন অজুহাত থেকে দেখা যায়- ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’। এককথায় বললে, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫৬ একটা ব্যাপক ‘অপব্যবহারযোগ্য’ এক ক্ষমতা।

কারণ, অজুহাতের এই কথাগুলো অস্পষ্ট। আর্টিকেলে বলা হয়েছে, ‘রাজ্য সরকার চালাতে পারেনি’ বা ‘পরিচালিত হয়নি’ বলে রাষ্ট্রপতির মনে হলেই হবে। এভাবে ‘আবছা’ রেখে দেয়াতেই ইচ্ছামতো একে ব্যাখ্যার সুযোগ থাকছে। বলা হয়ে থাকে নেহরু রাজ্য সরকারগুলোকে নিজের, মানে কেন্দ্রের ‘নিয়ন্ত্রণে রাখতেই’ এভাবে আর্টিকেল ৩৫৪ লিখিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই ভারতে ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ যে গভীর দ্বন্দ্ব আছে, তা আর্টিকেল ৩৫৪-এর এক অন্যতম উৎস।

রিপাবলিক মানে, রাজতন্ত্রের বিপরীতে বিকল্প হিসেবে ‘গণসম্মতির’ ক্ষমতা। রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতালব্ধ একটি মৌলিক ধারণা হলো- কোনো ক্ষমতাকে অবশ্যই ‘ডিফাইন’ করে রাখা ক্ষমতা হতে হবে। তা না হলে এটা দাগি ডাকাতের মতো ‘দাগি ক্ষমতা’ বা ‘ডেসপটিক পাওয়ার’ তৈরি করবে। ডিফাইন করা বলতে এখানে বুঝতে হবে- কোন ক্ষমতার উৎস কী, কে দিয়েছে বা কেন এই ক্ষমতা দেয়া বা হাজির হয়েছে তা স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথেষ্ট বর্ণনা করে রাখা হতে হবে। নাগরিকদের যে সম্মিলিত ক্ষমতা আছে তা থেকে উৎসারিত এক গণসম্মতি প্রকাশিত হলে; এভাবে তৈরি হওয়া ক্ষমতা কাউকে অনুমোদন দিলে, সেটি গণসম্মতির ক্ষমতা। এটা ডিফাইনড ক্ষমতা। নিজ ক্ষমতার উৎস বয়ান করতে পারে এমন ক্ষমতা।

আর্টিকেল ৩৫৪-এর অস্পষ্টতার দিক হলো, কী হলে বা কী দেখলে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন, ওই রাজ্য ‘সরকার চালাতে পারেনি’? এই আবছা বা অস্পষ্টতা থেকেই এক দাগি কালো ক্ষমতার উৎস হিসেবে একে রেখে দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত এই আর্টিকেল ব্যবহার করে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কমন অজুহাত দেখা গেছে- ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’। কী দেখিয়ে বুঝা বা বুঝানো হয়েছে যে, কোনো ‘অবনতি’ ঘটেছে? সাধারণত এর প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, শহরে কোনো দাঙ্গা হয়েছে কি না অথবা তাতে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, সেই ফিগার। এ এক কমন অজুহাত।

এই আর্টিকেলের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো, যদি কোনো রাজ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ বলে দাবি ওঠে তবে তা যাচাইয়ের জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো লিগ্যাল বডি বা কনস্টিটিউশনাল আদালতকে দিয়ে যাচাই, এমন সুযোগ ৩৫৪ আর্টিকেলে নেই। বরং নির্বাহী ক্ষমতার নিজে ‘মনে করলেই’ হবে, তাই এটা অবাধ খেয়ালি ক্ষমতা। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, যা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা- এই দলীয় ক্ষমতার (মোদি) তার বিরোধী (মমতা) রাজনীতিকে দমনের এমন সুযোগ ছেড়ে দেয়ার কারণই নেই। জন্মের পর থেকে এটা অপব্যবহার করে গেছে কংগ্রেস আর এখন তা মোদির হাতে এসেছে।

ভারতীয় মন এই অপব্যবহার দেখতে এতই অভ্যস্ত যে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছিল, পশ্চিমবঙ্গে কোথাও দাঙ্গা লাগানো হয় কি না। যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসনের এক কমন প্রয়াস দেখা যায়, নির্বাচনকালে তৈরি হওয়া উত্তেজনা ও জনবিভক্তিগুলোকে এবার বিদায় দেয়া। কিন্তু অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বেলায় এটা ছিল অনুপস্থিত। মূল কারণ, মোদি-অমিত অস্থির হয়ে আছেন মমতাকে এখনই সরিয়ে রাজ্য সরকার দখলে। অথচ বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ সালে।

রাজ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ হয়ে গেছে অথবা সরকার রাজ্য চালাতে পারছে নাÑ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নিয়ে এখন ‘রাষ্ট্রপতির মনে হওয়ানোর’ রাজনীতি চলছে। লোকসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এভাবে যে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল প্রথম এমন মোক্ষম কেস হলো ‘সন্দেশখালি’ ইস্যু। উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার এক এলাকা এটি। তৃণমূলের মিছিলে বিজেপির হামলাজনিত সংঘর্ষে নাকি চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বলাই বাহুল্য, ঘটনার পরস্পরবিরোধী বয়ান আমরা পাবো। এ ছাড়া কতজনের মৃত্যু হয়েছে, এই ফিগার যেহেতু রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের জন্য বড় ফ্যাক্টর। তাই ওই দাবি বেড়ে পরে হয়েছে আটজন। এর ওপর আবার নিখোঁজ বলে বিজেপির দাবি ১৮ জন পর্যন্ত।

হামলার ঘটনার সেই সন্ধ্যাতেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের কাছে রিপোর্ট করেছেন, টুইট করেছেন কলকাতার বিজেপি নেতারা। এরপর প্রায় ৭০ বছর ধরে রাষ্ট্রপতিরা যেভাবে অপেক্ষা করেছেন, সেভাবেই এবারের অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতিও রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে রিপোর্ট চাইলে তিনি দিল্লি গিয়ে রিপোর্ট এবং মোদি-অমিতের সাথে দেখা করেছেন।

সম্ভবত ঘটনা শুনে বিজেপির মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের জন্য মৃত্যুর এই ফিগার যথেষ্ট নয়। সমস্যা হলো, বিজেপির এখনকার ম্যাজিক্যাল নেতা মুকুল রায়ের টুইটে সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। এ ছাড়া তৃণমূলের ক’জন মারা গেছে তা তিনি উল্লেখ করতে পারেননি। রাজ্যপাল দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পর মিডিয়ায় রাষ্ট্রপতি শাসনের পক্ষে দিল্লির আপাত নেতি অবস্থানের ধারণা দিয়েছিলেন। আনন্দবাজার লিখেছে, প্রথমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কেশরী বলেছিলেন, ‘এটি (৩৫৬ ধারা জারি) আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।’ কিন্তু পরে একটি বৈদ্যুতিক সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘(৩৫৬ ধারা জারি) হতেও পারে। যখন দাবি উঠবে, তখন কেন্দ্র তা ভেবে দেখবে।’

মৃত্যুর ফিগার নিয়ে ঝগড়া ‘ন্যাংটা’ হয়ে চলছিল। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল বলেন, নির্বাচনোত্তর হিংসায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে অমিত শাহকে জানিয়েছেন তিনি। অথচ মমতার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লোকসভা ভোটের পর দিনহাটা, নিমতা, সন্দেশখালি, হাবড়া ও আরামবাগে পাঁচজন তৃণমূল কর্মী এবং সন্দেশখালিতে দু’জন বিজেপি কর্মী মারা গেছেন। তাই তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, নিয়মমাফিক রাজ্যসরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজ্যপাল রিপোর্ট পাঠানোর কথা। কিন্তু এখানে বিজেপির দেয়া সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তাই ঘটনার সারাংশ হলো, সন্দেশখালি যথেষ্ট নয়, আরো ইস্যু লাগবে। এবার দ্বিতীয় ইস্যুতে চেষ্টা, যাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সাফাইটি শক্তভাবে পাওয়া যায়।

দ্বিতীয় ইস্যুকে আমরা ‘হাসপাতাল ইস্যু’ বলতে পারি। এটা আপাতত অনেক ছোট ইস্যু, কিন্তু বিরাট করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনা আমাদেরও খুবই পরিচিত। কলকাতার প্রাচীন (রাজ্য পরিচালিত) সরকারি হাসপাতাল, নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এখানে ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্য হয়েছে- এজাতীয় টেনশনে ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে দেয়া, তা থেকে ডাক্তারদের ধর্মঘট- এই হলো ইস্যু। ঘটনা ছিল আসলে আরো ছোট। রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের অনুরোধে রোগীর আত্মীয় কোনো সিনিয়র ডাক্তার খুঁজে আনতে বের হন। কিন্তু কয়েকজনকে অনুরোধ করে আনতে না পেরে শেষে একজন সিনিয়রকে একটু জোরাজুরি করে হাতে ধরে তাকে আনেন। এই হলো ‘মূল অপরাধ’। ইতোমধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে। কিন্তু লাশ আনতে গেলে এবার ডাক্তাররা ‘ক্ষমা না চাইলে লাশ দেয়া হবে না’ বলে জানিয়ে দেন।

এটা আনন্দবাজারের রিপোর্ট। উত্তেজনা-মারামারি এরপর থেকে শুরু। রোগীর বাড়ি ১০ মিনিটের পথ। তাই ট্রাকে করে লোক জড়ো করে ফিরে এসে সামনে পড়া দুই জুনিয়র ডাক্তারকে পিটিয়ে তারা আত্মীয়ের লাশ নিয়ে ফেরত যায়। ডাক্তারদের একজনের আঘাত একটু গুরুতর ছিল, কিন্তু এখন তিনি বিপদমুক্ত, তাই হাসপাতালের সাধারণ বেডে। আর ডাক্তাররা সবাই ধর্মঘটে। কিন্তু সময়টা ‘রাষ্ট্রপতির শাসন জারি’ করার ইস্যু খোঁজার অনুকূল; তা এখন ‘বিরাট’ ঘটনা বানাতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ধর্মঘট ডাকা পর্যন্ত বিজেপি গড়িয়ে নিতে পেরেছে।

এসব ক্ষেত্রে সাধারণত ডাক্তার বা পাবলিক মাইন্ডসহ সবাই দেখে থাকে ঘটনার জন্য ‘দায়ী সরকার’ - ঠিক এটা নয়, তবে কেন সরকার মধ্যস্থতা করে বা পদক্ষেপ নিয়ে ইস্যুটা তাড়াতাড়ি মেটাচ্ছে না? ঘটনা এখানে উল্টা। ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দায়ী করছেন। তাই আনন্দবাজারের শিরোনাম ‘মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলুন, এই ঘটনা আর ঘটবে না, দাবি চিকিৎসক মহলের।’ কিন্তু ঘটনা মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী বা অপমান করতে হবে- এ দিকে গেল কেন? ‘এমন ঘটনা আর ঘটতেই পারবে না’ এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারবে না। তবে যাতে না ঘটে এই লক্ষ্যে কাজ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী- এ দিকে গেল না কেন?

মৃত রোগী ছিলেন মুসলমান, মসজিদের ইমাম। আর যারা এসে মাথা ফাটিয়ে লাশ মুক্ত করে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল, এদের নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে একটা বিরূপ হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন ছিল যে, ‘দেখেছিস, মুসলমানদের কত বড় সাহস!’ বহু আগে থেকেই সাধারণভাবে ‘মুসলমানদের আশকারা’ দেয়ার জন্য মমতাকে দায়ী করেছেন তার সব বিরোধী। কলকাতাজুড়ে এর মূল প্রকাশ্য ক্যাম্পেইন করে বিজেপি। আর তৃণমূলবিরোধী সিপিএমসহ বাকি সব ব্যক্তি ও দল এর প্রতি সমর্থন দিয়ে থাকে।

ক্ষমতা হারিয়ে শুকিয়ে যাওয়া সিপিএমের এই মরিয়া দশা দেখা গেছিল সেই ২০১৪ সালের শেষে, যখন অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন বর্ধমানে কথিত জেএমবি, জামাত, বাংলাদেশ, জঙ্গি ইত্যাদি সব কিছুর সাথে মমতা আছেন- এই প্রপাগান্ডার ঝাঁপি নিয়ে। সেকালে সিপিএম ব্রিগেড ময়দানে যে সভা ডেকেছিল, তাতে এই একই বয়ানে তারা মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। পরে অবশ্য মোদি-অমিত কৌশল বদলান। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল, অমিতের দাবি আর সরকারের অবস্থান নয়।

যা হোক, ডাক্তারদের সেন্টিমেন্টের পক্ষে প্রথম ইঙ্গিত তুলে রাজনৈতিক নেতা মুকুল রায় বলেছিলেন, এর ‘পেছনে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত’ রয়েছে। বিজেপি সভাপতি দিলীপ সরাসরি বলে বসেন, ‘হামলাকারীরা সেই সম্প্রদায়ভুক্ত, রাজ্যে যাদের ২৭ শতাংশ ভোট রয়েছে। হাসপাতালসহ রাজ্যে যেকোনো গোলমালের নেপথ্যেই ওই সম্প্রদায় রয়েছে।’ মমতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, ‘তৃণমূল সরকার ওদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। অনুরোধ, তৃণমূলের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না।’

ডাক্তাররা বুদ্ধিমান, তাই এবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বিজেপির অবস্থানকে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে তারা বলেন, ‘যারা আক্রমণ করে তারা সমাজের দুষ্কৃত। এখানে কোনো জাতি-ধর্মের বিচার নয়।’ কংগ্রেস-সিপিএমও এই দায় না নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। কলকাতার হাসপাতালে রোগী-ডাক্তার এই সঙ্ঘাত প্রায় আমাদের দেশের মতোই। এর সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো, সবাইকেই জবাবদিহিতার মধ্যে আনা। প্রথম কাজ, রোগী বা তার আত্মীয়দের মনে যত ক্ষোভই থাক তাকে বের হতে ‘জানালা খুলে দেয়া’। এ জন্য হাসপাতালের পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তদারকি ও সান্ত্বনাজাতীয় উইং খোলা। এর মূল কাজ হবে রোগীর আত্মীয়দের ক্ষোভ মনোযোগ দিয়ে শোনা। গাফিলতি থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া। এ ছাড়া সময় নিয়ে মেডিক্যাল কাউন্সিলকে সাথে নিয়ে দুই ধরনের তদন্তের ব্যবস্থা রাখা। তবে অবশ্যই কেস কিছু থাকবে, যা মূলত হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার কারণ ঘটেছে, সে অপারগতাগুলো রোগীকে বুঝিয়ে বলার মতো প্রফেশনাল রাখতে হবে। ফলে মমতাকে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে যারা চাচ্ছেন, এরা হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট বোঝেন না, বলা যাচ্ছে না। কারণ তারা প্রফেশনাল ডাক্তার। বিজেপির মমতাকে বেইজ্জতি করার প্রোগ্রামে তারা মিশে গেছেন বুঝে না বুঝে।

ডাক্তারের মাথা ফাটানো নিশ্চয়ই কোনো সমাধান নয়। ক্ষমা না চাইলে মরদেহ দেয়া হবে না, এটা বলার কে? সরকারি ডাক্তার এ কথা বলার অধিকার বা এখতিয়ার নেই। আর এ কথা বলে আইন নিজের হাতে তোলার ক্রিমিনাল অপরাধ করা হয়েছে।

ডাক্তাররা মনে করেন, নিজেরা একটা উচ্চ এলিট শ্রেণীর- এমন ধারণা কাজ করছে। অন্যদের সাথে এই বৈষম্য করে গেছে অবলীলায়। বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে এমনই ঘটনায় এক আইন প্রচলন করা হয়েছিল যে, হাসপাতালে এমন হাঙ্গামা করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। তাই ডাক্তারদের সঠিক পদক্ষেপ হতো বড়জোর পুলিশের কাছে মামলা করা, আইনের আশ্রয় নেয়া। বাস্তবে সেই রোগীর আত্মীয় এখন জেলে আটক আছে। রোগীর আত্মীয়রা স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে পুলিশকে দিয়ে লাশ ছেড়ে দিতে অনুরোধ করিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তাররা তবু লাশ আটকে রেখেছিলেন।

অর্থাৎ বিজেপি ডাক্তারদের এতই প্রটেকশন দিয়ে বেপরোয়া হতে উসকানি দিয়েছিল যে, তারা তাদের আইনি সীমা ও দায় সব ভুলে গেছিলেন। ওই দিকে কলকাতার কমিউনিস্ট ভাইয়েরা, তারাও ডাক্তারের পক্ষে, মানে নির্বাচনের মতো বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছেন, হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার ইমেজ ভাঙলে তাদের দিন ফিরবে।

না ফিরবে না। এবারের নির্বাচন তাদের কেটেছে নিজের দলীয় পরিচয়ে, কিন্তু বিজেপির ক্যাম্পে বসে। এটাই তাদের শেষ কমিউনিস্ট পরিচয়। কারণ, ২০২১ সালে এই নেতাকর্মীরা নির্বাচন করবেন সরাসরি বিজেপি নাম নিয়ে। কমিউনিস্ট পরিচয়ে আর না আছে আইডিয়ার ধার বা ভার, না আছে পকেটে টাকা। পকেট ভরে টাকাও আছে বা দেবে বিজেপি। এ ছাড়া বিজেপিতে যোগ দেয়া খারাপ, এটা বলার মতো নৈতিক সাহসও কমিউনিস্টদের নেই। কাজেই...।

মমতারও দোষ, ভুল, গোঁয়ার্তুমি আছে। গত পঞ্চায়েত ভোটে ৩৪ শতাংশ ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা’র কাফফারা আছে। হাসপাতাল ইস্যুতে তার আপসের আর একটা সফট লাইন আছে মেয়র ফিরহাদ, তার ডাক্তার মেয়ে, আর মমতার আরেক ডাক্তার ভাইপো প্রমুখের মাধ্যমে। হাসপাতাল ইস্যু তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আগেই তিনি আপসে এসব মিটিয়ে দিতে পারেন। বিজেপি কর্তৃক তাকে কোণঠাসা করার সব চেষ্টা মাঠে মারা যেতে পারে। দেখা যাক, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনতে ‘হাসপাতাল ইস্যু’ ব্যবহার হয় কি না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ




gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi