১৯ নভেম্বর ২০১৯

মোদির শরীরী ভাষা তা নয়

ভারতের লোকসভা নির্বাচন শেষের পথে। নির্বাচনের ছয়পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেছে। শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হবে আজ রোববার। ২৩ মে সকাল থেকে একযোগে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হবে। দুপুর ১২টা নাগাদ কোন প্রার্থী কে কোথায় এগিয়ে থাকছেন তা যেন আঁচ করা যাবে। কোন দল সরকার গড়তে যাচ্ছে এর অভিমুখ আন্দাজ করাও শুরু হবে। ঐদিনই সন্ধ্যার পর থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করবে কে কোন আসনে জিততে যাচ্ছে; কোন দলের প্রাপ্ত মোট আসন সংখ্যা কেমন। ২৪ মে থেকে প্রত্যেক দলের জোট গড়ার ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়ে যাবে। মনে হয়, ভারতে একটা কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

গত ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভারতের সব সরকারই ছিল আসলে কোয়ালিশন সরকার। এমনকি মোদির চলতি সরকারে বিজেপির মারজিনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তাও মূলত এক কোয়ালিশন সরকার। এ পর্যন্ত এই কোয়ালিশন সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল হয় কংগ্রেস না হয় বিজেপির নেতৃত্বে। ১৯৯৬ সালে দেবগৌড়া-জ্যোতি বসুর কোয়ালিশন এর ব্যতিক্রম। এরপর এবারই কংগ্রেস অথবা বিজেপির বাইরে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা এমন সরকারের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। আর তিনিই এর বিশেষত্বকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে একে আলাদা নাম দিয়েছেন, ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’-এর সরকার।

দুনিয়াতে একপর্যায়ে রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিপরীত ধারণা হিসেবে উঠে আসে রিপাবলিক রাষ্ট্র। গণসম্মতি ও লোকক্ষমতার রাষ্ট্র হলো এই রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সরকার। আবার বিশেষত কাঠামোর দিক থেকে বিচারে দুনিয়ায় আর এক রাষ্ট্ররূপ হলো ফেডারেল রিপাবলিক রাষ্ট্র। ফেডারেল বলার কারণ হলো, এখানে রাষ্ট্র অনেক প্রদেশ নিয়ে গঠিত। তবে এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো, কেন্দ্রীয় রাজস্ব ও সম্পদ ইত্যাদি কী ভিত্তিতে রাজ্যগুলোও পাবে আগেই বিস্তারিত এর লিখিত নিয়ম বলা থাকে, একটা ন্যায্যতার ভিত্তিও যেন সেখানে প্রতিষ্ঠিত থাকে। রাজ্য বা রাজ্য-সরকারের বরাদ্দ যেন প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতার প্রধানের পছন্দের বা অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে, এভাবে রাজস্ব বরাদ্দ হতে হবে। রাজস্ব, সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদিতে কেনো কোনো রাজ্য যেন বৈষম্যের শিকার না হয়- এমন কাঠামোগত ব্যবস্থা থাকাই ফেডারেল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। ভারত আমেরিকার মতো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। তবে ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় দলগুলোকে সমন্বয়ে একটা কেন্দ্রীয় সরকার গড়া অর্থে মমতা এটাকে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’- এর সরকার বলছেন।

গত ১৭ মে ছিল শেষপর্বের নির্বাচনী প্রচারণার সর্বশেষ দিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার নির্বাচনী কার্যক্রমের সমাপ্তি হিসেবে দলের প্রধান অমিত শাহকে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এসেছিলেন। অমিত শাহ মুখস্থ কথার মতো তাদের জোট তিন শতাধিক আসন পাবে বলে দাবি করে আসছিলেন; কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক মোদির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বলছিল না। পুরা সভা পরিচালনা ও শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর সবই অমিত একাই করছিলেন, মাঝে মোদি কেবল একবার তার প্রশাসনের পাঁচ বছর সমাপ্ত হলো বলে কিছু অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। তবে কোনো কারণে তিনি এদিন কোনো প্রশ্ন নেননি, সব অমিত একাই সামলেছেন। দ্যা হিন্দু পত্রিকা বলছে, এটা গত পাঁচ বছরের শেষে এক বড় ব্যতিক্রম। তবে মোদির বক্তব্যের শরীরী-ভাষ্য ছিল যেন তিনি বলতে চাইছিলেন, গত পাঁচ বছরের শাসন আর এই নির্বাচনী প্রচারণা মিলিয়ে যা কিছু পেরেছি সব করলাম। তিনি এখন ভগবান ভরসা যদি তিনি আবার ক্ষমতায় আনেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় তিনি আবার ফিরে আসছেনই, গত ২০১৪ সালের মতো, মোদির নিজের ওপর আস্থা বা মোদি-জ্বর ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

ব্যাপারটা চার দিকে সেভাবেই ফুটে উঠতে শুরু করেছে। প্রায় পাঁচ জোড়া নির্বাচনী-বিশ্লেষক গ্রুপ বা পোল-গবেষক প্রতিষ্ঠানের কেউই নির্বাচন শুরুর পর থেকে আর ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে, মোদি আবার ক্ষমতায় আসছেন। এবার মিডিয়াগুলোও তাদের মূল্যায়নে বলা শুরু করেছে, মোদির বিজেপি তার জোট এনডিএকে সাথে নিলেও সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২ আসন) পাচ্ছে না। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোকে ভাগিয়ে নিজ নিজ জোটে ঢুকিয়ে নেয়ার হর্সেস ট্রেডিং বা কেনা-বেচার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া আসন্ন হয়ে উঠল। আর কংগ্রেসের বেলায় বলা হচ্ছে, ফলাফলে যদি তার মোট প্রাপ্ত আসন এক শ’র নিচে হয়, তবে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি ছেড়ে দেবেন আগেই; আর জোটের অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেবেন।

আর যদি দেড় শ’র বেশি আসন পান, সে ক্ষেত্রেই কেবল জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে রাহুল দরকষাকষিতে নামবেন। অর্থাৎ কংগ্রেস যদি এক শ’র নিচে আসন পায় তবে আর কংগ্রেসের পক্ষের জোট ইউপিএ-এর পক্ষের কাউকে ভাগিয়ে মোদি এনডিএ জোটকে মোট ২৭২ এর উপরে নিতে পারছেন না। কারণ সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেরাই ফেডারেল ফ্রন্ট-এর কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে পারবে।

এবারের নির্বাচন কেমন হলো? এক কথায় জবাব ভারত-রাষ্ট্র আরেকবার আরেক ধাপ দুর্বল হয়ে গেল। আরেকবার কেন? আর দুর্বল হওয়া মানেইবা কী? সাধারণভাবে বললে, ভারত-রাষ্ট্র মূলত চালান এর ব্যুরোক্র্যাটেরা। ১৪০ কোটি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র দক্ষ ব্যুরোক্র্যাটরাই চালাতে পারবেন- এটাই স্বাভাবিক। তবে ভালো রাজনীতি ও রাজনীতিবিদও অবশ্যই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র চালানো শুধু ব্যুরোক্র্যাটদের কাজ নয়। এ ছাড়া শক্ত এক বিচার বিভাগও আরেকটি খুবই প্রয়োজনীয় অঙ্গ। আর নির্বাচন কমিশন- এরাও মূলত ব্যুরোক্র্যাটের অংশ। তাই তাদেরও শক্ত ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বলা হয়ে থাকে, সাবেক ক্যাবিনেট সচিব ও দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (১৯৯০-৯৬) টিএন সেশনের করা, নির্বাচন কমিশনের কঠোর সংস্কার ও স্বচ্ছতা কমিশনের আজকের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রধান উৎস। কিন্তু তবু এবারের নির্বাচনে এই নির্বাচন কমিশন ‘পরাজিত’। রাজনীতিবিদের কারণে দ্বিতীয়বার ভারত-রাষ্ট্রের পরাজয় ও দুর্বল হওয়ার ঘটনা ঘটল।

প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি আসন থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী রাজ নারায়ণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ‘কারচুপি করে’ জিতেছিলেন, এই অভিযোগে মামলা হয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্টে। রায় হয়েছিল ১২ জুন ১৯৭৫ সালে। সেবার আদালত প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে সশরীরে এসে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছিলেন, এমনকি পুলিশ-ছাড়া আদালতের নিরাপত্তায় আসতে হয়। রায় ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে যায়, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। ইন্দিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। আপিল কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা স্থগিত করে ৭ নভেম্বর সব শাস্তি রদ করে দেন। কিন্তু ঘটনা গড়ায় অন্য দিকে।

হাইকোর্ট তার মূল রায়ে ইন্দিরা গান্ধীর ওই কারচুপির নির্বাচন বাতিল করে দেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাতে জিতার দায়ে। তার প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়ার সংসদীয় ব্যবস্থা নিতে পরবর্তী ২০ দিন সময় দিয়ে নির্দেশ জারি করেছিলেন। তাই ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে যেন ক্ষমতা ছাড়তে বা সাজা খাটতে না হয়, সে উদ্দেশ্যে ২০ দিন শেষ হওয়ার আগেই ২৫ জুন ১৯৭৫ সারা দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে বসেন। এতে তিনি নাগরিক মৌলিক অধিকার স্থগিত, বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার, মিডিয়ার সেন্সরশিপ আরোপ ইত্যাদি প্রায় সবকিছু করার সুযোগ নেন। কনস্টিটিউশনাল জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে তিনি পাল্টা দাবি করেন, ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং তা ঠেকাতে’ এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি।

এভাবে রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশনকে অকেজো ও দুর্বল করে ফেলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতা বা ক্ষমতাকেন্দ্র একক রাখতে হয়, একে বিভক্ত বা কোনো শরিকানা করার ভুল করা যায় না। সেই সাথে এই ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার মধ্যে আনার জন্য কিছু পদক্ষেপ থাকতে হয়। যেমন কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাও নির্বাহী প্রধানের অধীনেই; তবে ব্যক্তি না বরং নন-পারসনাল, অবজেকটিভভাবে আর স্ট্যাটুটরি বিধানে বর্ণিত করে রেখে দেয়া হয়। যেমন দুর্নীতি তদন্তের প্রতিষ্ঠান, সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এবং কম্প্রোটোলার জেনারেল নিয়োগ ইত্যাদি। অথবা কিছু প্রতিষ্ঠানকে (তুলনামূলক অর্থে, নির্বাহী ক্ষমতা থেকে) স্বাধীন করে রেখে দেয়া হয়; যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া বা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কারণ শত আইন করে, লিখে রেখে কোনো বিপর্যয় বন্ধ করা যাবে না। বলা হয়, যাদের দিয়ে ক্ষমতার এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো হবে, ক্ষমতার চর্চা হবে তারা নিজেরা প্রজ্ঞাবান হতে হবে। বিশেষ করে নির্বাহী প্রধানের হাতে এবং যার যার এখতিয়ার পেরিয়ে কোনো সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না। কেন রাষ্ট্রক্ষমতাকে এমন করে রাখা হয়েছে, এর সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

না হলে অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন (যেটা সাধারণত নির্বাহী প্রধানের হাতে ঘটে থাকে, সেই ইংল্যান্ডের রাজার আমল থেকেই) ঘটলে তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা ও ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার কারণে রাষ্ট্র অকেজো হয়ে পড়বে।

ভারতের জরুরি আইন জারির বছর পরে ইন্দিরা গান্ধী (২১ মাসের) জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে, সাধারণ নির্বাচন দিয়ে গোহারা হেরেছিলেন। তিনি নিজে এবং সন্তান সঞ্জয় গান্ধী এতে পরাজিত হন অর্থাৎ পরোক্ষে শাস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু ভারত-রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতার দাগ স্থায়ী হয়ে যায়। খুব সম্ভবত এরই একটা দাগ হলো, এরপর থেকে ভারতের বিচার বিভাগ বা প্রশাসনে জড়িয়ে থাকা পেশাদার ব্যক্তিরা একটা শিক্ষা নিয়ে থাকবেন- সেটা হলো: তারা কোনো দুর্দমনীয় নির্বাহী প্রধান মানে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি হয়ে গেলে পরোক্ষে (কমন বন্ধুকে পাঠিয়ে) তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে থাকেন; আর বাস্তবে মুখোমুখি কোনো সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়লেও তা এড়িয়ে যাওয়ার সব চেষ্টা করে থাকেন। যেমন ওই মামলাতেই লক্ষণীয় হলো, সুপ্রিম কোর্ট পরে ওই সাজার রায় উল্টে দিয়েছিলেন। যদিও জরুরি আইন জারি থাকায় সে আমলে এটা করা তত জরুরি ছিল না।

নরেন্দ্র মোদির এই পাঁচ বছরে নির্বাহী ক্ষমতার এমন অপব্যবহার অনেকবার ঘটেছে। সেসব রেখে কেবল এবারের নির্বাচনের কথায় আসি। অন্যান্য বারের মতো এবারের নির্বাচনের আগেও ভারতের নির্বাচন কমিশন হালনাগাদ আচরণবিধি জারি করেছিল। সেখানে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে কোনো নির্বাচনী বক্তব্য দেয়া যাবে না, কাশ্মিরে পুলওয়ামায় প্যারামিলিটারি গাড়িবহরে হামলা বা এরপরে পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বিমান হামলা- এগুলোকে নির্বাচনী বক্তব্য বা পোস্টারে আনা যাবে না। বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ছিল। কিন্তু মোদি নিজে এগুলোর সবই ভঙ্গ করেছেন। যেমন তিনি ‘তার সেনাবাহিনীর’ সাফল্য, যারা বালাকোটে সন্ত্রাসীদের বোমা মেরে ধ্বংস করে এসেছে ‘তাদের সম্মানে দেশপ্রেমে এবারই প্রথম ভোটার’ যারা সে তরুণেরা যেন তাকে ভোট দেয়- এরকম প্রচারণার সব অভিযোগ মোদির বিরুদ্ধে।

কমপক্ষে পাঁচটা এমন সিরিয়াস আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এসেছিল মোদির বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক গড়িমসির পরে সব অভিযোগ থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীকে খালাস দিয়ে দেয়। প্রথম দু-তিনটা ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রায় মাসখানেক ফেলে রাখা হয়েছিল। এমনকি প্রায় কাছাকাছি অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ৪৮ ঘণ্টা প্রচার করা থেকে বিরত থাকার শাস্তি দেয়া হয়েছিল। তিনি ‘মোদি কা আর্মি’ বলে সম্বোধন করে ভোট চেয়েছিলেন। এ ছাড়া অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ যেখানে রাজ্য পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন শাস্তি দিয়েছিল, সেখানে মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে কমিশনের কেন্দ্র দিল্লিতে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল নানা যুক্তিতে। কিন্তু আদালত কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক রায় শুনায়নি। বরং ‘কমিশন স্বাধীনভাবে এসব ব্যাপার নিজেই বিবেচনা করে যেকোনো শাস্তি দিতে পারে’ বলে উৎসাহিত করে রায় দিয়েছে। এর পেছনের অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের শক্ত অবস্থান আছে বলে অনুমান করা যায়। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের মতোই নির্বাচন কমিশনের নিজেরও বিচারিক ক্ষমতা আছে। ফলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হলো আগেই হস্তক্ষেপ না করা, বরং কমিশনের নিজের বিচারিক ক্ষমতা ও ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালনের জন্য যে ক্ষমতা আছে, তা করতে সময় সুযোগ করে দেয়া হয়, যাতে কমিশন তা ব্যবহার করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট আগেই হস্তক্ষেপ করতে থাকলে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠবে।

নির্বাচন কমিশন নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘাত এড়িয়ে গেছে। এটা এখন দগদগেভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কয়েকটা মিডিয়াও প্রসঙ্গটা তুলেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট সক্ষম ও দক্ষ এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। তবে বাংলাদেশের গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধি দল হয়ে এসে কী ভূমিকা নিয়েছিল আমরা জানি না। বলাই বাহুল্য তাদের সফর কূটনীতির বুদ্ধিতেই পরিচালিত হয়েছিল, কমিশন পর্যায়ের বুদ্ধি খাটাবার সুযোগ হয়নি।

সাম্প্রতিককালে মোদি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা অপব্যবহার করে কিছু স্টাটুটারি প্রতিষ্ঠান যেমন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অথবা তদন্ত প্রতিষ্ঠান সিবিআইর প্রধানসহ অনেকের সাথে, তাদের তুলনামূলক স্বাধীন থাকার ক্ষমতা ক্ষুণœ করতে গিয়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছিলেন। এতে তাৎক্ষণিক লাভ হয়তো বিজেপি দলের; কিন্তু স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল ও ক্ষতযুক্ত করে ফেলার দীর্ঘস্থায়ী দাগ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সময় এর ‘কাফফারা’ দিতে হতে পারে।

খুব সম্ভবত মোদির আগের এসব তৎপরতা দেখেই এর প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন এমন আচরণ করেছে। কিন্তু তাতে কি ভারত-রাষ্ট্র নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্বল করে ফেলা এড়াতে পেরেছে- সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ