১৯ নভেম্বর ২০১৯

তাৎপর্যপূর্ণ চীন-ইইউ সামিট

গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত চীন-ইইউ সামিট হয়ে যাওয়ায় আমেরিকা এবার যেন হারিয়েই গেল। আমেরিকা চীনের ওপর চাপ দিয়ে ব্যবসা পেতে চাচ্ছিল। এর বিপরীতে ইইউ দেখিয়ে দিলো, ইতিবাচকভাবে আগালে অর্জন আরো বেশি হওয়া সম্ভব।

গত সপ্তাহের লেখায় প্রসঙ্গ ছিল চীনা বেল্ট রোড ফোরাম টু-এর আসন্ন (সম্ভাব্য তারিখ ২৫ এপ্রিল) দ্বিতীয় সামিট বা শীর্ষ বৈঠক নিয়ে। সে লেখায় প্রধান প্রসঙ্গ ছিল ইউরোপের চারটি নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র, যারা ‘গ্রুপ সেভেন’ নামে রাষ্ট্রজোটের সদস্য, চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের নতুন মাত্রা নিয়ে। এবারের লেখাতেও বৃহত্তর অর্থে প্রসঙ্গ হয়তো একই, কিন্তু ফোকাস এখানে ভিন্ন। আগের লেখায় অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আলোচিত হয়নি তেমনি এক প্রসঙ্গ হলো চীন-ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সামিট। ৯ এপ্রিল ব্রাসেলসে এই সামিট অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দিক থেকে সেখানে প্রতিনিধি ছিলেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কো চিয়াং (খর কবয়রধহম)। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ ক্লদ জাঙ্কার। এটা চীন-ইইউ ২১তম সম্মেলন। তবুও এটা আগের সব সম্মেলনের চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক। আগামী দিনেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে এই সম্মেলন। কেন?

এর মূল কারণ আমেরিকা এত দিন চীন সম্পর্কে ভয়ভীতির প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে চলছিল, এখনো ছড়াচ্ছে। এই ভয়ভীতির ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে ভিত্তি যদি থাকে দশ ভাগ তাকে শতভাগ বানিয়ে প্রপাগান্ডা করা হয়েছে। তবে এমন প্রপাগান্ডা ভিত্তি পাওয়ার পেছনের একটা মূল কারণ চীনে ‘কমিউনিস্ট নামে’ এখনো পরিচালিত পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনীতিতে তার ছাপ। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণভাবে মালিকানার ধরন। এখনো বহু প্রডাকশন ট্রেডের প্রধান কারখানাগুলো সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান (এসওই)। এ ছাড়া অর্থ-বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবল পার্টি হস্তক্ষেপ মানে সরকারি হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা যতটুকুই থাকুক, একে কেন্দ্র করেই সব অনাস্থার শুরু। অন্য ভাষায় বললে, অভ্যন্তরীণ এক ‘বাজার ব্যবস্থা’ আশির দশকে যাত্রা করেছিল বটে, কিন্তু তার ওপর কতটা আস্থা রাখা যায় আর কতটা তা এখনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রেখে সাজানো, সেই ভীতি নিয়েই বিদেশের বাজারে চীন নিয়ে অনাস্থাও আছে। কিন্তু চীনা বাজার উদ্যমীভাবে প্রবল সচল, তাই এর প্রতি আকর্ষণ ও পশ্চিমা সমাজ এড়াতে পারে না। তাই ভয়ভীতি সাথে নিয়েই সে চীনের বাজারে আছে। এই ভীতি বা আড়ালে থাকা অনাস্থা চীনকে একেবারে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতেও পারে। তবে চীনের নিয়মিত নানান সংস্কারের পদক্ষেপও মানুষ দেখে থাকে।

এটা ঠিক যে, একেবারেই হস্তক্ষেপবিহীন বাজার ব্যবস্থা বলে দুনিয়াতে কিছু নেই। সব ধরনের রাষ্ট্রই কিছু না কিছু হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই বাজারব্যবস্থা বলামাত্রই বুঝতে হবে- কিছু মাত্রায় হস্তক্ষেপে যা দুঃসহ নয় এমন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বাজারব্যবস্থা, যেটাকে ‘প্রাকটিক্যাল অর্থাৎ বাস্তবসম্মত বাজারব্যবস্থা’ বলতে পারি। কিন্তু পণ্যের চাহিদা বা মূল্য নির্ধারণে বাজারের ভূমিকার জন্য এটুকুই যথেষ্ট নির্ধারক। পশ্চিমা অর্থে ‘স্বাধীন বাজার’ বলতে যা বুঝায়, চীনে বাজারের এমন স্বাধীন ভূমিকা নেই বরং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আছে- এই অনুমান বা ধারণা বিশ্ব বাজারে আছে।

ফলে এক ধরনের অনাস্থা বলে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা সময় সুযোগমতো একে আরো বাড়িয়ে প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। বিশেষ করে শেয়ারের মূল্যে বা চীনা মুদ্রার মান ও মূল্যে হস্তক্ষেপ আছে কি না, এই সন্দেহ ছড়িয়ে দিলে বাজারে এর কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়ে যায়। আর এটাই আমেরিকায় প্রপাগান্ডার পুঁজি ও ভিত্তি। এ কথা সত্যি, পশ্চিমের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চীনের সব পকেটে তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থা তৈরি বা পরিচালিত হয়নি। অবশ্য তার অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। তবুও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় মুদ্রা হিসেবে আমেরিকান ডলার যে মানের আস্থাভাজন মুদ্রা, চীনা ইউয়ান তাতে ডলারের আস্থার জায়গার দখল নিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে আসছে। এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও এখনো ইউয়ান অনেক দূরে। অনেকে বলে থাকেন, আস্থার এই গ্যাপের কারণ হলো- বাস্তবে চীনা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা না থাকুক কিংবা কিছু থাকুক- চীনা রাষ্ট্র ‘যদি কখনো হস্তক্ষেপ করে বসে’ এমন একটা ভয় বা অনাস্থা জনমনে আছে বলেই আমেরিকান প্রপাগান্ডা সম্ভব হচ্ছে। কারণ লক্ষ করলে দেখব, আমেরিকার রাষ্ট্র তার শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে- এ কথার বিশ্বাসযোগ্যতা নেই বললেই চলে।

এমন আরো বিষয় আছে। বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক নব্বইয়ের দশকের পর থেকে- বিশেষ করে তার স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অনিয়মের বিরুদ্ধে তদারকির ‘সততা বিভাগ’) চালু হওয়ার পর থেকে এসব বিষয়ে পশ্চিমের বিচারে বিশ্বব্যাংক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গণ্য হচ্ছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে কেউ আর এখন অস্বীকার করে না যে, এর আগে সত্তর-আশির দশকে (যখন বিশ্বব্যাংক প্রথম এশিয়ায় কার্যক্রম শুরু করেছিল) ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার আমলে (১৯৬৮-৮১) স্বচ্ছতা, জবাবদিহি বা অনিয়ম প্রশ্নে প্রবল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল বিশ্বব্যাংক। ব্যাপারটা ম্যাকনামারার অসততার প্রশ্ন নয় তবে তার অনুসৃত নীতি এ সমস্যার কারণ।

সেকালে আমাদের মতো দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ঋণ পৌঁছানো যেত না, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচি সেখানে পৌঁছত না; অথবা দেশের মুদ্রা-বিচলন চক্রের বাইরেই থেকে যেত বিপুল গরিব প্রান্তিক মানুষ। তাই ম্যাকনামারার নীতি ছিল- অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হলেও তো সেই অর্থ গ্রামাঞ্চলের কারো কাছে পৌঁছবে; ফলে গ্রামের অচল-স্থবির জীবনযাত্রা নড়বে, স্থবিরতা দূর হবে- তাই সততার দিক উপেক্ষা করে হলেও বিশ্বব্যাংক যদি এই বাধা অতিক্রম করে প্রান্তিক মানুষকে ছুঁতে পারে, তবে সেটাই হবে ‘সাফল্য’। এভাবে সাফল্য তো আসেই নি- (এই অসফলতার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের কৃতিত্ব বা সাফল্য উল্লেখযোগ্য)। বরং চরম বদনামের দায়ভার নিতে হয়েছিল বিশ্বব্যাংককে। এ প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য দুর্নীতি-দুর্নামের স্টোরি, মূলত সে সময়ের। ফলে স্বাধীন ও সমান্তরাল ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ (সততা বিভাগ) খুলে একালে বিশ্বব্যাংক নিজেকে এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

কিন্তু চীনা উত্থানের একালে সমস্যা আর একটা। বিশ্বব্যাংক নিজ নিয়ম মানলে চীনা অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি অনুসারে বিশ্বব্যাংকে চীনা শেয়ার মালিকানা বাড়াতে হয়। কিন্তু আমেরিকার সিনেট ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংকের এই প্রস্তাব অনুমোদনে অস্বীকার করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালেই ব্রিকস ব্যাংকের জন্ম। এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীনা প্রধান (৩০ শতাংশ) মালিকানায় ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংক’ (এআইআইবি) খোলা হয়েছে। আর তখন মানে ওবামার আমল থেকেই ‘চীনাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা বা আস্থার কোনো মান নেই- তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়’ ইত্যাদি অভিযোগের প্রপাগান্ডাকে আমেরিকা তার বন্ধুবলয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ওই বিকল্প ব্যাংক উদ্যোগে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে নিয়েছিল।

অর্থাৎ এই প্রথম প্রকারান্তরে চীনের কাছে আমেরিকা নিজের প্রকাশ্যে হার স্বীকার করে নিয়েছিল। বিশেষ করে এআইআইবি উদ্যোগের প্রথম সভায় দেখা গেল জাপান ছাড়া ওবামা আর কাউকে প্রপাগান্ডা চালিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি; এমনকি অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানও এআইআইবি ব্যাংকের সদস্য হয়েছিল, শুরু থেকেই। তবুও সেই থেকে পরাজিত আমেরিকার (একালের ট্রাম্প প্রশাসন পর্যন্ত) নিজের ন্যায্যতা প্রমাণের একমাত্র ভরসা হলো এ মর্মে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা যে, চীনা মান বা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক নেই এবং সে পাশ্চাত্যের মতো নয়।

কথা তো সত্য, চীন পশ্চিমাদের মতো নয়। মূল ফারাক হচ্ছে চীনের বেড়ে ওঠার ধরন তার অতীত শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট হিসেবে। বরং বর্তমানে চীনের আসল ভিন্নতা এক বড় জায়গায়- ‘হিউম্যান রাইটস’ প্রশ্নে। ‘হিউম্যান রাইটস’কে পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড বলে অনেকে পাশ কাটাতে চাইতে পারে। কিন্তু এখানেই চীনের বিরাট ঘাটতি। কারণ, রাষ্ট্র কি গুম-খুন-গায়েব করতে পারবে? এই অধিকার পাবে? নাকি গুম-খুন-গায়েব হওয়া থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং তা পালন করবে? এটা যেকোনো রাষ্ট্রে খুবই মৌলিক প্রসঙ্গ। তাই এখানে প্রশ্নটা আর ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ মাত্র নয়। কমিউনিস্ট বা ইসলামিস্টদের স্ট্যান্ডার্ড কি না সে বিষয়ই নয়; বরং তা সার্বজনীন। নির্বিশেষে সব রাষ্ট্রকেই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে হবে। শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে নাগরিককে কমিউনিস্ট (বা অন্য কোনো) রাষ্ট্র গুম-খুন-গায়েব করতে পারা নিঃসন্দেহে অগ্রহণযোগ্য। তাই চীনকে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, নিজেকে বদলাতে হবে। কিন্তু তা বলে আমেরিকা ‘হিউম্যান রাইটস রক্ষা’ নীতি হিসেবে মুখে বলে বাস্তবায়ন করবে না আর চীনের বিরুদ্ধে এ নিয়ে প্রপাগান্ডার জোয়ার তুলবে- এটাকেও পরিবর্তন করতে হবে। আর এভাবে নিছক পশ্চিমের নয়, এক গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে এর পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

সত্যি কথাটা হলো ‘পশ্চিমা স্ট্যান্ডার্ড’ও তৈরি হতে শুরু করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে; ইউরোপ ঘরের ভেতর যুদ্ধ-হত্যা আর রেসিজমের বিভীষিকার আয়নায় নিজেদের আপন কলোনি-চেহারা দেখার পরে। এর কৃতিত্ব সেকালের কলোনি-মালিক ইউরোপের নয়, আমেরিকার। দুনিয়া তখন আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল।

আরেক প্রপাগান্ডা শুরু করেছে আমেরিকা- ‘ঋণের ফাঁদ’ নামে। অ্যাকাডেমিক বা থিঙ্কট্যাঙ্ক নিয়োগ দিয়েছে। উত্থিত এই চীনকে মোকাবেলায় নাজেহাল হয়ে থাকা আমেরিকা সবচেয়ে বাজে পথ ধরেছে। বাজে কাজ, কারণ এটা ধ্বংসাত্মক। ওবামা এই পথ দেখিয়ে গেছেন আর ট্রাম্প তা আরো খারাপভাবে অনুসরণ করছেন। তাহলে ইতিবাচক কী হতে পারত?

সেটাই আজকের মূল প্রসঙ্গ মানে, চীন-ইইউর ২১তম সামিট। এই সামিট দেখিয়েছে ইতিবাচক পথ কোনটা। এই সামিট থেকে স্বাক্ষরিত ২৪ দফার যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে। এটাই সেই ইতিবাচক পথ।

প্রথমত, ইউরোপকে এই সামিট করতে হচ্ছে। বলা ভালো- করতে বাধ্য হয়েছে, কারণ ২৫ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭ সদস্য রাষ্ট্র চীনা বেল্ট রোড মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ফেলেছে। ওদের মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রও আছে, যারা আমেরিকার নেতৃত্বের গ্রুপ সেভেন বা জি৭-এরও সদস্য। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে বললে, এটাই মার্কিন নেতৃত্বের পতনের সূচনা। কারণ, আমেরিকা এই জি৭ রাষ্ট্রজোটের মাধ্যমেই এত দিন আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ ইত্যাদি) তদারকি করেছে বা অভিমুখ ঠিক করে দিয়ে এসেছে। জি৭ হলো আমেরিকাসহ সাত রাষ্ট্রের নীতি-পলিসি সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান।

ব্যাপারটা জি৭-এর কে প্রথম শুরু করেছিলেন তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কে সর্বপ্রথম চীনের সাথে ‘সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপ’ করতে গিয়েছিল- এই ক্রাইটেরিয়ায় ইতালি শীর্ষে থাকবে। মনে রাখতে হবে, কোনো জি৭ সদস্য রাষ্ট্রের চীনের সাথে কেবল ব্যবসা-অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, একেবারে ‘সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনার’ হওয়ার সম্পর্ক, যার সোজা মানে হলো, ‘আমেরিকান নেতৃত্বের পতনের সূচনা’- ইউরোপের আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বকে অস্বীকার করা।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হচ্ছে, চীন-ইইউ সামিট থেকে প্রকাশিত ২৪ দফার এক যৌথ ঘোষণার দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো 'ঈযরহধ ধহফ ঃযব ঊট ৎবধভভরৎস ঃযব ংঃৎবহমঃয ড়ভ ঃযবরৎ ঈড়সঢ়ৎবযবহংরাব ঝঃৎধঃবমরপ চধৎঃহবৎংযরঢ়'। অর্থাৎ ‘চীন ও ইইউ তাদের সামগ্রিক কৌশলগত পার্টনারশিপের শক্তি নিশ্চিত করছে।’ অর্থাৎ কেবল ইতালি না আমেরিকাকে ছেড়ে দেয়ার ‘সুযোগ’ নিয়েছে সারা ইউরোপই।

তাহলে এই ২৪ দফা মূলত কী নিয়ে? দুনিয়ায় যা কিছু নিয়ে বিতর্ক আছে, যা জাতিসঙ্ঘের নজরে বা নিরাপত্তা পরিষদের কারো নজরে থাকা ইস্যু এমন সব প্রসঙ্গে চীন-ইইউর যৌথ অবস্থানের দলিল হয়ে গেছে এটা। কেন এমন হলো? চীন ও ইইউর এ নিয়ে এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে যে, তাদের এসব কিছু নিয়ে যৌথ অবস্থান প্রকাশের দরকার।

কারণ, আসলে সেই ওবামা আমল থেকে এত দিন চীনের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা আমেরিকা চালিয়ে এসেছে, তার সারকথা ছিল যে আমেরিকা যেন বলছে, আমার বন্ধুরা, তোমরা কেউ চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যেও না।’ কিন্তু এই আহ্বান শতভাগ নেতিবাচক ও স্ববিরোধী। কেন?

চীন আজকের এই প্রবল অবস্থানে আসতে আমেরিকা পুঁজি বিনিয়োগ আর বাজার দিয়ে তাতিয়ে সুযোগ করে দিলো কেন? আজকে চীন নতুন আরেক গ্লোবাল সিস্টেমের জন্ম দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে হাজির হওয়ার পর আপত্তি তোলা, বিশেষ করে নেতিবাচকভাবে বাধা দেয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা, ভয় তাতানো- এটা তো অগ্রহণীয় কাজ! হতেই পারে, চীনের আকাক্সিক্ষত নতুন সিস্টেমের বহু কিছুই দুনিয়া এত দিন যেসব স্ট্যান্ডার্ড গড়েছে এর চেয়ে পেছনের। কিন্তু এর দিকে পেছন ফিরে থেকে মোকাবেলা অসম্ভব, আর সেটা পথও হতে পারে না। এর বদলে ইতিবাচক পথ হলো, মুখোমুখি বসা, বিতর্ক করা, সারা দুনিয়াকে জানানো যে, কেন চীনা স্ট্যান্ডার্ড নিচু, কোনখানে নিচু; আর চীন কি কারেকশন করলে সারা দুনিয়াই এক উন্নত ‘গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ডে’ পৌঁছতে পারে।

ঠিক এ কাজ করার দলিল হয়েছে চীন-ইইউর ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা। বাস্তবের যেসব মানুষকে আমরা দেখি, তা কখনো কী কী কিনবে না, সেই ফর্দ নিয়ে বাজারে যায় না। অথচ এত দিন আমেরিকা সেই কাজ করে গেছে। কারণ, তার চোখে উত্থিত চীন মানে গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে নিজের অপসারণ ও পতন। অথচ যা ঠেকানো অসম্ভব, তাকে সে নেতিবাচক অবস্থান নিয়ে ভেবেছে ঠেকিয়ে ফেলবে, না হলেও অন্তত দেরি করিয়ে দেবে। এ কারণে চীনকে আমেরিকার চেয়েও ভালো স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করাতে গেলে কী করতে হবে, সেটা বলার চেয়ে চীন খারাপ- এই নেতিবাচক প্রপাগান্ডা দিয়ে আমেরিকাকে চীন মোকাবেলা করতে গিয়েছে।

অথচ ইইউ চীনের কাছে যেসব দাবি রেখেছে তার সাথে খাপ খাইয়ে বরং একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে চীন রাজি হয়ে গেছে। এর দলিল উল্লিখিত ২৪ দফা। যেমন সাউথ চায়না সি কার? এ নিয়ে পড়শি দেশ প্রায় সবার সাথেই সীমানা বিতর্ক আছে চীনের। ইইউ চীনকে রাজি করিয়ে ফেলেছে যে, চীন এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক আইন মানবে। একইভাবে ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে অভিন্ন অবস্থান কী হবে তা-ও বেরিয়ে এসেছে ২০ নম্বর দফায়। এমনকি মানবাধিকার প্রসঙ্গেও চীনের অনেক সরে আসা এবং একমত হওয়ায় তা খুবই আগ্রহের বিষয়, যেটা ১০ নম্বর দফায় এসেছে। অর্থাৎ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড আরো উঁচুতে নিয়ে যেতে দুই পক্ষ একসাথে কাজ শুরু করতে পেরেছে।

আগামী দিনের ইতিহাসে এই যৌথ ঘোষণা বহু বিতর্কে রেফারেন্স পয়েন্ট বলে বিবেচিত হবে, তা বলা যায়। কিন্তু ইইউ কেন এটা করতে পারল? আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো লোকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে ইউরোপে বুদ্ধিমান লোক বেশি। তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিচ্ছিন্নতা মেটাতে ইতিবাচক পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ