২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভারত কি হাসিনাবিরোধী হয়ে যাবে?

-

সম্প্রতি ‘বিবিসি বাংলা’ হঠাৎ নড়েচড়ে জেগে উঠেছে। তাতে শেখ হাসিনা সরকারের বিবিসি যেন এক কড়া সমালোচক- এই মর্মে নিজের একটা পরিচয় তাকে দাঁড় করাতে হবে, এমন যেন পণ করেছে বিবিসি। গত দশ বছরে আমরা তাদের এমন ভূমিকা দেখিনি। এ সময়টায় আমাদের মেজর মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মুখ চেয়ে রিপোর্ট করে চলেছে। সেখানে গত নির্বাচনের সময় থেকে এখন বিবিসি যে সরকারবিরোধী, ধারাবাহিকভাবে তা প্রমাণে উঠে পড়ে লেগেছে। যদিও এবার ভারতের হয়ে কিছু কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব তারা নিয়েছে বলে সমালোচনা হচ্ছে। দু’দিন আগে ২৯ জানুয়ারি সে এক রিপোর্ট ছেপেছে যার শিরোনাম হলো, ‘বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?’

দেখা গেছে, ভারত ‘বিএনপিকে যে কত গভীরভাবে অপছন্দ করে’ এরই প্রমাণ-দলিল হতে চেয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে ‘বাংলা’র নেতাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয় বিবিসি-বাংলার এমন সাংবাদিক হলেন শুভজ্যোতি ঘোষ। এই রিপোর্ট তারই লেখা।

অর্ডার দেয়া রিপোর্ট এটাকে মনে করার কারণ আছে। কেন? ব্যাপারটা হলো, বিএনপি সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সরকারের শক্ত রিজার্ভেশন বা আপত্তি আছে, এই কথাটা বলবার অছিলা হিসাবে অনুরুদ্ধ হয়ে, বিবিসি যেন ভান করে যে, তারা নিজের উদ্যোগে ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের (বা বিজেপির) সরকারি অবস্থান কী? আর তা জেনে এ ভিত্তিতে একটা রিপোর্ট করছে। এটাই শুভজ্যোতি ঘোষের রিপোর্ট। এতে ভারতের লাভালাভ হলো যে, তারা বিএনপির বিরুদ্ধে কটু কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ও নিচ্ছেন। এ ছাড়া দেখানো গেল যে, বিএনপিবিরোধী কথা তারা নিজে যেচে বলেননি, বরং বিবিসি জানতে চাওয়াতে তাদের বলতে হয়েছে।
কিন্তু মোদি সরকার বা বিজেপিকে এখন এই রিপোর্ট করতে হচ্ছে কেন?

আমরা ইতোমধ্যে সবাই জানি, নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে বিএনপি ভারতের সাথে একটা ‘ওয়ার্কিং টার্ম’ বা একসাথে কাজ করার ন্যূনতম বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। যদিও বোকামি আর অদূরদর্শী নেতৃত্ব বা প্রতিনিধিদের পুওর পারফরম্যান্সের কারণে ভারতের সাথে বিএনপি কথা বলতে গিয়ে নিজের ‘বাবা-মাকে গালি দেয়ার’ মতো অবস্থা করে ফেলেছিলেন, বা কোনো সময়ে তারা দৃশ্যত ভারতের ‘অধীনস্থতার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে বিএনপি নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে ভারতের দিকে এগোনোতে বা কথা বলাতে ভুল হয়েছে বা এটা সমস্যার, এমন মনে করা ভুল হবে। যেকোনো দল কৌশলগত কারণে এমনই করে থাকে। প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিতে বা ‘ঠাণ্ডা’ রাখার জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রকে অনেক রকম কথা বলতে হয়, জড়াতে হয়।

কিন্তু আমরা এমন কোনো দাগের নিচে নামতে পারি না, যে দাগ কঠোরভাবে আগেই টেনে নিতে হয়; আর সেটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, হোমওয়ার্ক (আমরা কী বললে প্রতিপক্ষ কী কী বলতে পারে এর আগাম অনুমান আর জবাব প্রস্তুত করা) সাথে করে রাখতে হয় আগেই। তদুপরি দক্ষ লোককে প্রতিনিধি বেছে নিয়ে কাজে নামতে তো হয়ই। এসব ক্ষেত্রে বিএনপির অনেক ত্রুটি ছিল। এ ছাড়া মূল কী মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে- এর ভাষা, ভঙ্গি আর উপস্থাপন দক্ষতা আগেই নিজের স্পষ্ট করে নিতে হয়। এককথায় বললে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রকমের কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল।

ভারতের দিক থেকে বললে, তারা ভেবেছেন বিএনপির এই এগিয়ে আসা, এটা তাদের ‘উপভোগের সময়’। হাতি হয়ে বসে বিএনপির নত হয়ে সালাম নেয়ার সময় তাদের ব্যাপারটা যেন এমন। ভারতপ্রীতির সরকার কায়েম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিরোধী দল নিজেই ভারতের মন পাওয়া বা গলানোর চেষ্টা করছে। ফলে বিএনপিকে এবার ‘বাগে পেয়েছি’ ধরনের আচরণ করেছে পড়শী দেশ। যেন বোঝাতে চেয়েছিল, ‘বাংলাদেশের রাজা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের হাতে, বুঝেছ!’। অথচ নিজেই বোঝেনি, এই নির্বাচন ভারতের জন্য কোন দুর্ভাগ্য বয়ে আনছে। এ প্রসঙ্গে আরো পরে আলোচনা করা হবে। বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের আচরণ, কেবল এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের পুরা অবস্থান নয়। বরং বলা যায়- একেবারেই বাইরের দিক, শো আপ অংশ এটি।

ভেতরে রূপটা ছিল উদ্বিগ্নতার। আমাদের এবারের নির্বাচনে কী হয়, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারত ছিল উদ্বিগ্ন। এর বড় কারণটা হলো- তাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানভিত্তিক বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে কী হতে পারে, ফলাফল ও পরিস্থিতি ইত্যাদির রিপোর্ট। সবখানেই তারা নিশ্চিত হচ্ছিল, ‘এবার হাসিনার আর খবর থাকবে না’, আওয়ামী লীগ হারবে। আর বারবার নানা দিক থেকে অনুসন্ধানের একই ফল আসাতে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ফলে শেখ হাসিনার ওপর থেকে আস্থা একেবারে তুলে না নিলেও ঢিলা দিয়ে ফেলেছিলেন। অথবা বলা যায়, এরই এক প্রকাশ ঘটেছিল বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী হওয়া। এভাবে আলাপ করার সুযোগ নেয়া হয়েছিল যে, বিএনপি কী চায় সেটা মন দিয়ে শোনা যাবে। এগুলো করা হয় আসলে আগ্রহের সাথেই। অথচ এখন ওই বিবিসি রিপোর্টে সেসব আগ্রহের কথা এড়িয়ে সব ধুয়ে ফেলার প্রয়াস চলছে। সারকথায়, সে সময়ে সবশেষে তারা সম্পর্কটা এমন জায়গায় উঠিয়েছিলেন, যদি শেখ হাসিনার পতন হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে সেখান থেকে যেন শুরু করা যায়, যাতে অন্ধকার বা একটা শুধু আঁচড়ের দাগ থেকে শুরু না করতে হয়। অথবা, সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে সম্ভাব্য জয়ী নায়ক ‘বিএনপির’ একেবারেই অপরিচিত বলে ভারতের কাছে না হাজির হয়, বা ভারতকে তাদের পেছনে ঘুরতে না হয়।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটা নিঃসন্দেহে একটা বড় রিস্ক নেয়া। শুধু তাই নয়। এ কারণে এবারের নির্বাচনে মোদি সরকার শেখ হাসিনার অনুরোধ পেয়েও তা রাখতে পারেনি। এমনকি, হাসিনার ভারতকে ‘দেয়ার ভাণ্ডার খুলে ধরা’ সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মতো একজন ‘সুজাতা’ পাঠিয়ে তার পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারেনি। অর্থাৎ মোদির ভারত বিএনপির সাথে বাতচিতের খাতা খুলেছিল। এর মানে হলো বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেতেও পারে এমন সম্ভাবনাকে ভারত স্বীকার করছে।

কিন্তু পরে যদি ফলাফলে দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবে সে ক্ষেত্রে এটা হবে শেখ হাসিনাকে অখুশি করার বিরাট এক রিস্ক। বাস্তবে তাই হয়েছে।

অন্য দিকে, কূটনৈতিক রীতি নীতি ভেঙে নির্বাচনে আঃলীগকে এবারও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে না পারায় সেটাও আর এক বাড়তি রিস্ক ছিল। বাড়তি রিস্ক এ জন্য যে, আগের বার কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সমর্থন করার ‘সুজাতা স্টান্ডার্ড’ তো ভারতেরই সৃষ্টি। এমনকি নির্বাচনের আগে গত বছর মে মাসে শেষ ভারত সফর থেকে ফিরে শেখ হাসিনার হতাশা প্রকাশ আর তখন মন্তব্য ‘আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি তারা তা সারা জীবন মনে রাখবেন’ আমরা স্মরণে রাখতে পারি।

মোটকথা, ভারত একটা চরম বাজি ধরেছিল। এখন বলাই বাহুল্য ভারত তাতে হেরে গেছে। সারাংশে বললে, ‘শেখ হাসিনা আবার না-ও জিততে পারেন, এর বেশ সম্ভাবনা আছে’ ভারতকে এই অবস্থান নিতে হয়েছিল তার গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণের কারণে, আর এটাই ছিল তার ‘বাজি’। তবে এটা জুয়ার মতো নয় যে, চরকির কাঁটা কোথায় গিয়ে থামে, এমনটা দেখতে হয়। ‘যদি মানুষ ভোট দিতে পারে’- তাদের সিদ্ধান্ত ছিল এই অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। মানে, ২০০৬ সালের আগের বাংলাদেশের স্টান্ডার্ডে অবাধ-নিরপেক্ষ কোনো ভোট এখানে হলে।

যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’, আর সে অনুযায়ী ফলাফল আসে, সে ক্ষেত্রে কী হবে? খুব সম্ভবত, এমন সম্ভাবনার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি, তাই কোনো অনুমানেই এটা ছিল না। ভারতের চন্দন নন্দীর টুইট বলছে, এমন তথ্য তারা জেনেছেন, ভোটের মাত্র চারদিন আগে। মানে তারা কোনো অনুমান করেননি মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, অথচ ফলাফল ‘রেডি’ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী হবে? এজন্যই বাংলাদেশের নির্বাচনে তাদের গোয়েন্দা অনুমান মেলেনি। মানে, গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা, সব কিছুর মূলে। ফলে এখন মুখপোড়া অবস্থা। আর সেখান থেকে স্বীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় তাগিদের প্রমাণ হলো, বিবিসি বাংলার আলোচ্য রিপোর্ট।

নির্বাচনের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণজাত উপসংহার আর এর ওপর দাঁড়িয়েই এটা তাদের কতটা নির্ভরতা নিশ্চয়তা দিয়েছিল এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো- ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে লেখা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিবন্ধ। এটা গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা নিবন্ধ বলে অনুমান করা যায়। পিনাক লিখেছিলেন, ‘... ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে’। অর্থাৎ তিনি ওই লেখায় ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ওপর আর কোনো আশা-ভরসা রাখেননি।

তার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখেননি; এমন ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে তিনি লিখেছেন। সেই কারণে আরো আগ বাড়িয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে’র অভিযোগ, ‘হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্যের’ অভিযোগের মতো মারাত্মক বিষয়াগুলো এনেছিলেন। সবচেয়ে মারাত্মক দিকটা হলো ‘গুলি করে হত্যা’র নীতি নেয়ার অভিযোগ তোলা। পিনাক লিখেছেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি ‘গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত”। তবে যা এটা অন্যের অভিযোগ যা তিনি কেবল ব্যবহার করছেন। এই ছলের আড়ালে পিনাক কথাটা বলার সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়াও তার শেষের বাক্য খুবই মারাত্মক বলে প্রতীয়মান। তিনি লিখছেন, ‘শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তার প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে’।

অপর দিকে, বিএনপিকে নিয়ে জোট ঐক্যফ্রন্টের খুবই দ্রুত উত্থান, এই ফেনোমেনাটাকে ভারত নিজের গোয়েন্দা রিপোর্টের সাথে মিল খায়, এমন ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। বলা যায়, ‘ক্ষমতাসীনদের পতন আসন্ন’ ধরনের অনুমানে ভারতের বিভ্রান্তিসহ আগানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।

তাই নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের ‘দিন খারাপ যাওয়া’ শুরু হয়েছে, বলা যায়। ‘চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়’। বলা যায় আসলে সংসদ নির্বাচনের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরের ছয় দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের পরের দিন থেকে মন্ত্রিসভা নির্ধারণের মধ্যেকার সময়ে বহু কিছু ঢেলে সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফেনোমেনাটার নাম দেয়া যায়- ‘চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের সাথে দূরত্ব’। মন্ত্রিসভা সাজানোর ক্ষেত্রে যার প্রথম প্রকাশ পর্যবেক্ষক ঘটতে দেখেছেন।

আরো লক্ষণীয় হলো, ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক জয়িতা ভট্টাচার্য আর শ্রীরাধা দত্তের প্রবন্ধেও দেখনো হচ্ছিল আর এক নতুন রূপবৈশিষ্ট্য। আগে ভারতের একাডেমিক জগতের প্রায় সবাই বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বা ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাচ্ছে, নেতিবাচক উপস্থাপন করে এ বিষয়কে দেখতেন। বোঝাতে চাইতেন এটা ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থবিরোধী (ভারতের এরিয়া অব ইনফ্লুয়েন্সে কেউ ঢুকতে পারে না, এমন দাবি) এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখতেন। অথচ শ্রীরাধা এখন চীনের ভূমিকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচনের পরে লিখছেন- ‘চীন ও ভারত উভয়েই আর বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে নিজ নিজ দ্বিপক্ষীয় সীমার মধ্যে রেখে দেখে না... তাই হাসিনার নির্বাচনী বিজয়ের পাশে চীন ও ভারতের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো অযাচিত নয়’। অর্থাৎ চীন যে এ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়েই গেছে এটা মেনে নিয়েই তারা কথা শুরু করছেন। অবশ্য এর সাথে বোঝানোর চেষ্টা করছেন ‘তবে, চীনের পাশাপাশি ভারতও আছে’। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ভারতও আছে?
বাস্তবে নেই। আর সেটা আমার কথা নয়, ভারতের আচরণ এর প্রমাণ। চীনের মতো ভারত আর একই সমতলে পাশে দাঁড়িয়ে নেই। বরং পাত্তা না পাওয়া, টানাটানি শুরু হওয়ার প্রতিক্রিয়াটাই হলো বিবিসির ওই রিপোর্ট।

এবার, শেষের কথাটা আগে বলে দিয়ে শুরু করি। ভারত এত দিন বাংলাদেশ সরকারের মুখ এক দিক থেকে দেখে এসেছে, এবার আরেক দিক দেখবে। প্রধানমন্ত্রী চীন গিয়ে ২০১৪ সালের জুন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তি স্বাক্ষর করেননি। অনির্দিষ্টকাল তা পিছিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের মুখদিকে চেয়ে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ আমাদের অন্তর্ভুক্তি, কর্ণফুলীতে টানেল ব্রিজ, বার্মা হয়ে রেল ও রোডে চীনের কুনমিং যাওয়া ইত্যাদিসহ বহু প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ শুরু করে আসেন তিনি। এগুলো পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরের সময়ে ফাইনাল হয়। সব মিলিয়ে অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হলো ২৪ বিলিয়ন ডলারের।

অর্থাৎ ২০১৪ সালে ‘সুজাতা স্ট্যান্ডার্ড’ এর সমর্থন ভারত সেবার উসুল করে এভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর আর আমাদের বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি তোলে। আগেই বলেছি ছয় দিনের কথা। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হলো, গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যায় এই প্রথম ভারতকে ডিকটাট করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন। আসলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এত দিন যেসব ক্ষেত্রে তিনি ভারতের স্বার্থের দিকে চেয়ে এগোননি, এখন থেকে সেই খাতিরদারির সমাপ্তি টানছেন। বিবিসির আর এক রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ছাপা হয়েছে এ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে। দৃশ্যত, ভারতের স্বার্থের অনুকূলে সে রিপোর্টের ভাষ্য হলো, ‘ভারতকে হাসিনা তার ‘নিজের দেশের অগ্রাধিকারের’ ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন’। অর্থাৎ এবার বেল্টরোডের ব্যাপারে তিনি শক্ত করে মন বেঁধে ফেলেছেন। তদুপরি চীনের অবস্থানের অনুকূলে বলছেন, ‘বেল্টরোড নিয়ে ভারত দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় (চীনকে সাথে নিয়ে) কথা বলতে পারে’।

কোনো বিশেষ চমক না ঘটলে, ভারতের পক্ষে এটা মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। এর সোজা মানে, ভারতের পক্ষে আগের মতো ‘খাতিরের লোক’ হিসেবে তাকে পেতে চাইলে ভারতকে বেল্টরোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। নইলে, ভারতকে ঢাকা সরকারের বিরোধী হয়ে সরাসরি হাজির হতে হবে।

তাহলে মানে দাঁড়াল, এই নির্বাচনের ফল ভারতের জন্য নিয়ে এসেছে ব্যাপক উদ্বিগ্নতা। এটা আরো বাড়তে পারে। কারণ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারপ্রধান এখন ক্রমেই ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তে চাইবেন। বলা যায়, পরিস্থিতি তার অনুকূলে। আর সেটাকে কিছুটা হালকা করার জন্য বিএনপির বিরুদ্ধে কিছু বিষোদগার করে তার মন পেতে চাইছেন মোদির নীতিনির্ধারকেরা। তাই বিবিসির এহেন রিপোর্ট। এখন বিএনপিকে ‘জামায়াত ছাড়া’র কথা শর্ত হিসেবে কারা তুলছেন, না হলে সম্পর্ক হবে না এমন ভাব ধরছেন। অথচ ইতোমধ্যে বিএনপি ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী চরম যে ক্ষোভ-আপত্তি আছে সেগুলোরই প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি করবে বিএনপি।

আসলে জামায়াত ইস্যু, জঙ্গি বা উলফাকে সহায়তা ইত্যাদি যেসব ইস্যু তুলে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আর বিএনপি ভারতের কেউ নয় বলে যে লাইন টানতে চাইছে ভারত, খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছেই এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে থাকছে না। চীনের সাথে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গড়তে ভারতের আপত্তিগুলোর নিরসন না হলে সেসব কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই ক্ষমতাসীন নেত্রীর কাছে বড় ইস্যু। ভারতের বিপদ এখানেই।

গভীর সমস্যার দিকটা হলো, তা তুষ্ট করতে ভারতকে যা করতে হবে তা দেশটি করতে পারবে না। এটা বিবিসি রিপোর্ট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। বরং ক্রমেই ভারতকে স্বীয় স্বার্থে নতুনভাবে উঠে আসতেই আমরা দেখব, আর সে সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে। হ

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme