২৬ জুন ২০১৯

‘বাম-ডান’ ভাবনার তাৎপর্য

‘বাম-ডান’ ভাবনার তাৎপর্য - ছবি : সংগৃহীত

ডান-বামের রাজনীতি। প্রায়ই আমরা বলতে শুনি, অমুকে বামপন্থী রাজনীতি করেন। অথবা কেউ কাউকে অপছন্দ করলে, তার গায়ে ‘কালো দাগ’ লাগিয়ে দিতে চাইলে শোনা যায়-তার নামের আগে তিনি ‘ডানপন্থী’ শব্দ বসিয়ে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। অথবা দাবি করে বলেন, ‘উনি তো ডানপন্থী’। অর্থাৎ শেষে সার কথা দাঁড়াল, যারা ‘ডানপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ কথাগুলো ব্যবহার করেন তারা বলতে চাচ্ছেন- বামপন্থী মানে ভালো আর ডানপন্থী মানে খারাপ। কিন্তু এই নামকরণ কী সঠিক? আর কিসের ভিত্তিতে এই নামকরণ? কাকে ডান বলব আর কাকে বাম? এই ডান-বাম কোথা থেকে এলো?

এ প্রসঙ্গে এমন অনেক প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসে বটে; কিন্তু এর জবাব আমরা যথার্থ পাই আর না পাই, শেষ বিচারে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্টই রয়ে যায়। প্রথমত, ইতিহাসে এমন ধারণার প্রথম উদ্ভব কবে, কখন, কিভাবে- এই বিচারে বলা যায়, ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ‘ফরাসি বিপ্লবের’ পর তাদের সোস্যালিস্ট প্রতিনিধিরা স্পিকারের বামদিকে সদলবলে একসাথে বসতেন। আর সেখান থেকেই পরে বামপন্থী, লেফটিস্ট, লেফট উইং ইত্যাদি বাম-বিষয়ক নানা নামের পরিচিতি চালু হয়ে যায়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাও এই ব্যাখ্যাকে মেনে নেয়। আর যারা বামেদের বিরোধী, স্বভাবতই বামপন্থীরা তাদের ডাপন্থী নামে ডাকার রেওয়াজও এখান থেকে শুরু হয়ে যায়। তবে সাধারণভাবে বললে, এ ধরনের শ্রেণীকরণ করা খুবই হালকা চিন্তা বা লুজ টক; মানে যথেষ্ট না ভেবে চিন্তা করা বা দুর্বল-চিন্তার ভিত্তিতে দাঁড় করানো বক্তব্য।

এই নামকরণের ভেতর চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা আছে অনেক ধরনের। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হলো, এই বাম-ডান শ্রেণীকরণ- এটা এক ‘বাইনারি’ ভাবনা। অর্থাৎ যার কেবল দুইটা রূপই হতে পারে। অঙ্কের ভাষায় শূন্য আর এক। ‘বাইনারি’ কথার সোজা মানে হলো- হয় এটা, না হলে ওটা; এর বাইরে কিছু নেই। হয় তুমি আমার বন্ধুর দলে আসো নইলে, তুমি আমার শত্রু- সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের এমন ভাষায় কথা বলা। এমন দুই অবস্থার বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না বলে আগে থেকেই ধরে নেয়া হয়। অথবা বলা যায়, কাউকে হয় সাদা না হলে কালো হতে হবে- এমন মনে করা। অথচ বাস্তবে সাদা আর কালোর মাঝখানে অনেক রঙ আছে, হতে পারে। কারণ হরেক অনুপাতের সাদা ও কালোর মিশ্রণে আলাদা আলাদা বহু রঙ হতে পারে। তাই কেউ কালো না হলে তা সাদা হবেই, এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই; তা সহজেই বুঝা যায়। কোনো কিছু সাদা অথবা কালো না হলে, মিশ্রণের হলে তাকে ধূসর বলা যায়। ধূসর বলতে আবার একটি নয় অনেক ধরনের- যাকে আমরা সাদা-কালো মিশ্রণের নানা শেড বলি, এমন অসংখ্য শেডের ধূসর আছে, হতে পারে। কম সাদা কিন্তু বেশি কালো, অথবা বেশি সাদা কিন্তু কম কালো এমন বিভিন্ন ধরন বা শেডের ধূসর হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পুরা ব্যাপারটাকে কেবল ‘সাদা না হলে কালো’ বলে জোর করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা- এই বাইনারি চেষ্টার মতোই অস্পষ্ট কাণ্ড হলো, কাউকে ‘বামপন্থী না হলে, ডানপন্থী’ বলা বা নাম দেয়া।

তবে এটা ঠিক যে, ফরাসি বিপ্লবের কিছু বৈশিষ্ট্যও এই শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে কাজ করেছে। এমনিতে ফরাসি বিপ্লবের এক বৈশিষ্ট্য হলো, সেটা ছিল গরিব ও সাধারণ মানুষের প্রাধান্যে ঘটা একটা বিদ্রোহের ঘটনা; আর বিশেষত তা ঘটেছিল সমাজের এলিট, অবস্থাপন্ন, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বিদ্রোহ অভিমুখ-বিহীন নয়। আবার অনেকেরই ধারণা, ‘মডার্ন রিপাবলিকান রাষ্ট্রের’ সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো ফরাসি বিপ্লব। যদিও উল্লেখ করার ব্যাপার হলো আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬) মানে যেটা কলোনিবিরোধী রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) চেয়ে তা অন্তত ১৩ বছর আগের ঘটনা। আর রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রধারণার মধ্যে যেসব ভিত্তিমূলক চিন্তা- এমন ভিত্তির দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব যথেষ্ট সমৃদ্ধ; অন্তত ফরাসি বিপ্লবের সাথে তুলনায়। আমেরিকান বিপ্লবের ক্ষেত্রে তা কোথাও কোথাও অনন্য ও চমৎকার বটে। তবু অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা ফরাসি বিপ্লবের রেফারেন্স দেন প্রায়ই এবং সহজেই; এর তুলনায় আমেরিকান বিপ্লবের নাম প্রায় নেয়াই হয় না। বাস্তবতা হলো, রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার ভাবনা ও এর বাস্তবায়নের দিক থেকে আমেরিকান বিপ্লব ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে কোনো অংশেই কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

ফরাসি বিপ্লবের ফলে বাম-ডান ক্যাটাগরি করার ভাবনা আসার পেছনের সম্ভাব্য কারণ হলো, গরিব বনাম বড়লোক, এমন ভাবনা ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে ছিল। তাই সেখানে স্বভাবতই গরিব পক্ষকে আপন ও কাম্য বা ইতিবাচক বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বিপরীতে, দেখা যায় আমেরিকান বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয় বিষয় হলো অধিকার (ইংরেজিতে রাইট); মানে, মানবিক-নাগরিক অধিকার (হিউম্যান রাইট)। ওদিকে, অধিকার ধারণার চেয়ে বাম বা কমিউনিস্টদের (গরিব-বড়লোক এমন ভাগের) গরিবের প্রতি সহানুভূতি বেশি। এটাই মৌলিক পার্থক্য। যদিও বাম-ডান বলে ভাগ করে বিশেষণ লাগানো নিঃসন্দেহে খুবই অস্পষ্ট ও দুর্বল-চিন্তায় আচ্ছন্ন।

আরো সরাসরি এবং স্পষ্ট করে বললে, ফরাসি বিপ্লবের সারবস্তু যদি সমাজের এলিট, অবস্থাবান, ক্ষমতাবান ও বড়লোকেদের বিরুদ্ধে গরিবদের উঠে দাঁড়ানো হয় এবং এই অর্থে একে বিপ্লব বলি- তা বলতে পারি অবশ্যই। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে, সমাধান পেতে চাইলে কেমন রাষ্ট্র চাই এই অর্থে, ‘অধিকার’ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের দরকার- এই বোধ অস্পষ্ট করে রাখা হয়েছে। যাদের ভেতর এই বোধ অস্পষ্ট, তারাই মূলত বাম-ডান ভাগের ভক্ত। অথচ নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকারের ভিত্তিতে এবং নাগরিক সাম্যের নীতিতে একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন- এটাই রিপাবলিক ধারণার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

আগেই বলেছি, বাম-ডান হলো এক বাইনারি চিন্তাব্যবস্থা। এর মানে কোনো ‘বামপন্থীর’ চোখে আপনি তার গ্রুপের নন, এ কথার মানে হলো তিনি বলবেন, আপনি ডানপন্থী। সবকিছুই যেন বাম অথবা ডান হতেই হবে। যদিও বাম ও ডান উভয়েরই উপবিভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন- চরম বাম, অতি বাম- ইংরেজিতে যা ফার-লেফট বা আল্ট্রা-লেফট। বাংলায় সেখান থেকে চরমপন্থী শব্দটা এসেছে। তাই আসলে বাম-ডান বলে একটা শ্রেণীকরণ আগে আছে- এই ধরে নেয়া ধারণার ওপর ‘চরমপন্থী’ শব্দটা দাঁড়ানো। বামপন্থা ধারণাটার চরম রূপটাকে বুঝাতে এর নাম হয়েছে ‘চরমপন্থী’ (এক্সট্রিমিস্ট)। একইভাবে অতি-ডান (ফার-রাইট) বা চরম ডান (আল্ট্রা রাইট)- এগুলো ডানেরই নানা উপবিভাগ। এজন্য এই চিন্তাব্যবস্থায় ডানের বেলায়- কোনো ধর্মীয় গণতন্ত্রী দল, রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী ইত্যাদি হলো ডানপন্থী। এ ছাড়া রেসিস্ট বা ফ্যাসিস্টদের ‘চরম ডানপন্থী’ বলে মনে করা হয়েছে। আবার সোশ্যালিস্ট, লিবারেল বা কমিউনিস্ট- এদের বামের উপবিভাগ বলে মনে করা হয়েছে।

লক্ষণীয়, ‘বাম-ডান এই শ্রেণীকরণের’ প্রবক্তারা রেসিজম (বর্ণবাদ) এবং ফ্যাসিজমকে ‘ডানপন্থী’ ভাগে ফেলেছেন। কিন্তু এতে চিন্তার বিরাট ঘাপলাটা হলো, কমিউনিস্টদের মধ্যে কি রেসিজম এবং ফ্যাসিজমের ছায়া নেই? মুখে তারা হয়তো কমিউনিস্ট, নিজেদের বাম বলে দাবি করছেন। অথচ বাস্তব কাজ ও পরিচয়ে কি তাদের কেউ রেসিস্ট অথবা ফ্যাসিস্ট নন? সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রক্ষমতা মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে অথরিটেরিয়ান বা কর্তৃত্ববাদিতার কিংবা এমন ক্ষমতার অভিযোগ আছে। অতএব রেসিজম এবং ফ্যাসিজমকে ডানপন্থী ভাগে ফেলা- এটাই সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ যে, বাম-ডানে ভাগ করা মূলত বামপন্থীদের চালু করা পদ্ধতি। অর্থাৎ বামপন্থীরাই মূলত এই শ্রেণীকরণের প্রবক্তা।

এর আর একটা প্রমাণ হলো, যাদের বামপন্থীরা বা মিডিয়া ডানপন্থী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, বিশেষণ লাগায়- কথিত সেই ডানপন্থীরা কিন্তু নিজেদের ‘ডানপন্থী’ বলে অভিহিত করেন না। আমেরিকার ভেতরে বাম-ডান বলে কাউকে ডাকার, বিশেষণ লাগানোর সাধারণত তেমন চল নাই। বরং আছে উদার (লিবারেল) বা এর বিপরীতে রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ) বলে ভাগ ও চিহ্নিত করার রেওয়াজ। আবার উদারেরা নিজেকে উদার এবং তাদের বিপরীতে রক্ষণশীলেরা নিজেকে রক্ষণশীল বলেই পরিচয় দিতে কোনো আপত্তি করেন না। শেষ বিচারে বাম-ডান বলে ডাকার আর এক বড় নেতিবাচক দিক হলো- এটা নাগরিক-মানবিক অধিকার বিষয়টাকে গৌণ, এমনকি অনেক সময়ে তুচ্ছই মনে করে।

এমনকি, লক্ষ করলে আমরা দেখব, বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা আছে। কিন্তু তাদের রাষ্ট্রের নামের মধ্যে (যেমন চীনের পিপলস রিপাবলিক) এই ‘রিপাবলি’ক লিখে রাখা আসলে অভ্যাসবশত, নেহায়েত রেওয়াজ যেন। এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা বিশেষ অর্থ নেই। তবে এর চেয়েও বড় গুরুত্বের দিকটা হলো, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নাম ‘রিপাবলিক’ করার ধারণাটা- ‘অধিকার’ মানে, ‘নাগরিকের অধিকার’ বলে কোনো ধারণাকে অনুসরণ করে করা হয়নি। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার বা মৌলিক অধিকার বলে আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না তা অস্পষ্ট এবং বাস্তবতা নেই। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে বহু বস্তু পাওয়ার বা ভোগের অধিকার আছে। কিন্তু গুম-খুন অথবা নিপীড়িত হওয়া, এগুলো থেকে রাষ্ট্র সুরক্ষা দেবে এমন নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা নেই। আর এমন চিন্তাভাবনা প্রসূত ধারণাই হলো ‘বাম-ডান’ বলে শ্রেণীকরণ।

এটা গত শতক পর্যন্ত চলতে পেরেছিল বলা যায়। গত শতক ছিল ‘জাতীয়তাবাদ’ চিন্তার শতক। জাতীয়তাবাদের রাজনীতি বলে এর শুরু কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। কারণ এই মহাযুদ্ধের পরিণতিতে উপনিবেশ ব্যবস্থা দুনিয়া থেকে উঠে গিয়েছিল। এর পর থেকে উপনিবেশমুক্ত রাষ্ট্রগুলোর কমন আইডিয়া বা ভাবনা হলো নানা কিসিমের ‘জাতীয়তাবাদের রাজনীতি’। আসলে (কমিউনিস্টসহ) সার্বভৌম রাষ্ট্র মাত্রই, জাতিবাদের ইঙ্গিত সেখানে থাকবেই। এ সময়ের রাজনীতিতে ইসলামও ছিল এক ধরনের জাতীয়তাবাদ অর্থে [যেমন, ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান (১৯৪৭) অথবা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান (১৯৭৯)]। এমন ধারায় গত শতকে ‘ডান-বাম বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ’- এটা ভালোভাবেই ছিল। কিন্তু চলতি শতকে?

এই শতকের শুরুতে আমরা দেখেছি ‘আলকায়েদা ফেনোমেনা।’ মানে ইসলামও বিপ্লবী তত্ত্বের উৎস হতে পারে, এই দাবি। যদি এর viable রূপটা এখনই পাওয়া গেছে কি না তা স্পষ্ট নয় বা প্রমাণিত হয়নি। এর ফলে, ‘ইসলাম প্রশ্ন’ আসাতে এই কালে এসে আরো অনেক চিন্তার মতো ‘ডান-বাম’ বলে চিন্তায় শ্রেণীকরণ আরো অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে পড়ে একেবারেই ম্লান হয়ে গেছে। সেই ধার বা সক্ষমতা আর নেই। এর বড় কারণ খোদ ‘আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণাটাও এখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এর পর্যালোচনা দাবি করছে। ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে আমল করতে দাবি জানাচ্ছে। এভাবে এক ‘রিভিউড’ বা ‘ক্রিটিক্যাল রিপাবলিক রাষ্ট্র’ ধারণা পুনরায় হাজির করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করা হয়। এদিকে, বাম-ডান বলাসহ কোনো অস্পষ্ট বা আধো বোলের কোনো ধারণার একালের খাতক একেবারেই কমে গেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

 


আরো সংবাদ