২৩ মার্চ ২০১৯

নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

-

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস বলবে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন হলো এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন। কিসের? গ্লোবাল নেতা বদলের; বলা হবে বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা বদল ঘটেছিল এই ঘটনা থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। কমিউনিস্টরা একটা স্লোগান দিত- হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। এখান থেকেই সম্পর্কে নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।

আমরা যে দুনিয়াকে ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া’ বা ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া’ বলে চিনি, এর বয়স বেশি হলে সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। যেমন আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া নাম ছিল আমাদের। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত সেকালের দুনিয়া বলতে দেখা যেত- এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতো ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি আর কোনো অর্থেই অখণ্ড ভারত নয়, ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হলো- উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষের নতুন দুনিয়া হলো, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়ার বয়সই প্রায় ৭০ বছর হয়ে গেছে। আর এখন শুরু হবে বা হয়েছে তৃতীয় পর্ব। এখন চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের বদলে তার জায়গা নিতে আসন্ন হয়ে উঠেছে চীন।

তবে বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিলো। দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল- আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটিকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের ক্ষমতা এই প্রথম অকার্যকর রেখে বা থেকে যেমনই হোক বাংলাদেশের নির্বাচন সমাপ্ত হলো।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো এম্পায়রাল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা, পক্ষে অথবা বিপক্ষে ছিল না বা কাজ করেনি। কেন এটা বলা হচ্ছে? গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পায়রাল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি। এটাকেই মূলত হস্তক্ষেপের সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে চীনসহ অন্যদের কোনো ভূমিকার চেয়ে একক ভূমিকা ছিল আসলে আমেরিকারই। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া ও শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার’ নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা বৈষ্টিক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। যেমন ট্রাম্পের আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘অ্যান্টিগ্লোবালাইজেশনের’ ইকোনমি অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডমিনেটিং স্বার্থ মানে যাদের সরকার তিনি হবেন, সেটি ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানির নয়, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিরও নয় আমেরিকান ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি ছিল সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি- সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে যেটি ট্রাম্প প্রশাসন সেও মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগেরটাই- গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাতভিন্নতা। এটাই ট্রাম্পের কোনো মন্ত্রী-উপদেষ্টার নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতা।

অথচ আমেরিকা আর কখনো গ্লোবাল ইতি-নেতি ভূমিকা পালন করবে না- দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। তবে আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসবেন কিন্তু তার পক্ষে আর আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানো সম্ভব থাকবে না। তাই ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি এটাই চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছেন, আগামীতে আরো করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে চীনের লিড না থাকলেও এই সমাপ্তিতে যে নতুন স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী ফ্যাক্টরের জন্য সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনায় নিলে, এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা অফ হয়ে যাবে, ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে প্রভাব কমবে। সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। অবশ্য সেই সাথে আরো ছিল হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’। এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যা সঠিকই ছিল, সেটাও তাদেরকে বড় শঙ্কিত করে ফেলেছিল। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল ‘ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়’ কারণ সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিল, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া মোদি চাননি তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে সুজাতা সিংয়ের মতো অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের জেতার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে এতটুকুও হেলেনি। এর কাফফারা শুরু এখান থেকে। কিন্তু এখন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখনো সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। ওইদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, এটা ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট বা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, হস্তক্ষেপের ভয় ছিল হাসিনার; যেটা ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত তা নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত। ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকারের পরে কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার সহায় ছিল- দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের সমর্থন ও সাফাই হাসিনার জন্য খুবই জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার দরকার সেটা হাসিনার কাছে আর অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।
এ ছাড়া অন্য ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচনে মোদির সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। এর মূল কারণ রাজনৈতিক অধিকার বা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই খারাপ। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি- এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির এজেন্ডাই নয়। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের বৈষয়িক লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে কিছু বুঝতে রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকার’ এসে পড়বে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে ওই রচনায় বয়ানের সারকথা হলো, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। ব্যাপার হলো, রাজনীতি বা অধিকার- যা চীনের বিষয় নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি এর পক্ষে যেত। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগস্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি একটা ভালো কম্বিনেশন। বেল্টরোড আর সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা- জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজ সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের নীতির মানে হলো, বৈষয়িক সুবিধাতেই তার লাভ মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটি আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের জন্য বেস্ট পার্টনার হলো চীনা বিনিয়োগ। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে, যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হলো ভারত। ফলে ভারতের স্টার্ডাডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হয়। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকারের মধ্যে সত্য বা মিথ্যা যেন এক অনুতাপ যে সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই চলবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al