২৩ মার্চ ২০১৯

বিবিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’

-

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এক দীর্ঘ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে গত ২০০৮ সালের সাথে এখনকার বাংলাদেশের একটা তুলনা টানা হয়েছে- পাঁচটা ইস্যুতে। দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশে এই পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে গত ১০ বছরে। বিবিসির চোখে ১০ বছর পরে বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো- ১. কর্তৃত্ববাদী শাসন, ২. সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ, ৩. বিকাশমান অর্থনীতি, ৪. নয়া প্রযুক্তি ও সোস্যাল মিডিয়ার বিস্তার, ৫. বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার।

চোখে পড়ার মতো ঘটনা হলো, এক ফাইন মর্নিং বা সুবহে সাদেকে বিবিসি চোখ কচলে ‘আবিষ্কার’ করেছে, বাংলাদেশে নাকি ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। আর ওই রিপোর্টের বাকি অংশ এই ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ নিয়েই কচকচানি। এসব তৎপরতা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ চলছে বলে একটা স্বীকারোক্তিকে প্রাধান্যে আনা হয়েছে যেন এতে সংশ্লিষ্টরা এখন এর দায় ধুয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি ১০ বছর ধরে এই শাসন আনার ক্ষেত্রে কি বিবিসিরও কোনো দায় নেই?

এখানে যদিও বলা হচ্ছে সময়কাল ‘দশ বছর’, কিন্তু সত্যিকারভাবে সাথে জড়িয়ে আছে আরো দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক শাসন, ফলে মোট ১২ বছর। আসলে পরের ১০ বছর যা কিছু হয়েছে, এর সব কিছুর ভিত গাঁথা, অভিমুখ ঠিক করে দেয়া হয়েছিল ওই দুই বছরের আমলে। কে অস্বীকার করবে যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর ওই দুই বছর আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সীমাহীন। তাই সুবিবেচনা করতে চাইলে, লজ্জা বা দ্বিধা ভুলে মোট ১২ বছরের হিসাবই করতে হবে।

ওই রিপোর্টের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো তারা (বিবিসি ও রিপোর্টে ইনপুটদাতারা) তত্ত্বাবধায়ক শাসনের দুই বছরসহ হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের দায় বহন করেন। মানে, ওই সাত বছর যেন তাদের খানিকটা দায় আছে- ভাবে ও প্রচ্ছন্ন হলেও সেটি কবুল করে কথা বলেছেন। তবে বুঝবার কোনো উপায় রাখেননি যে, ঠিক প্রথম কবে থেকে তারা ঠাহর করলেন, বাংলাদেশে এক ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। সেটি একেবারেই উহ্য রেখে দিয়েছেন। তবে মূল কথা- বিবিসির এই রিপোর্ট পড়ে আমরা কমবেশি নিশ্চিত, তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরের ‘মজা’ ও দায় তারা অন্তত অস্বীকার করছেন না।

বিবিসির চোখে ওই পাঁচ পরিবর্তনের যা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, তা হলো- বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ ঘটে যাওয়া। আসলে প্রথম পরিবর্তন ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনের’ সাথে দ্বিতীয়টি সহ-সম্পর্কিত। এখানে বিবিসি এবং যাদের সাথে আলাপ করে তারা রিপোর্টটি তৈরি করেছেন, উভয়ের চোখে ‘ইসলামীকরণ’ নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ‘ইসলামীকরণ’ করে বা হয়ে গিয়ে খুব খারাপ হয়েছে- এই আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সবাই কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমরা যখন এই ইস্যুতে পাল্টা কথা বলব, তখন শব্দটি ব্যবহার করলেও তা নেতি নয়, বরং বর্ণনামূলক অর্থে এর ব্যবহার করব।

আর শব্দটিকে কখনো লিখব ‘ইসলামিস্ট’। যেমন- ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব বেড়েছে’, এই অর্থে ‘রাজনীতিতে ইসলাম’ দেখতে চাওয়া সব ধারার যারা এমন এক বৃহত্তর গোষ্ঠী; আর বর্ণনামূলক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে বলা যায়, বাংলাদেশে এমন ‘ইসলামিস্টদের’ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে। যেমন সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশে নানা ফ্যাঁকড়ার ‘কমিউনিস্ট’, তাদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি- তেমনি একালে ইসলামিস্ট। তবে তারা আসলে কী চান, এ ব্যাপারে সবাই একই কথা বলবেন, ব্যাপারটা তা না হলেও বাংলাদেশের রাজনীতি ইসলাম ছুঁয়ে থাকলে, কি ঠেস দিয়ে দাঁড়ালে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, তা দরকার- এ রকম একটা কথার পক্ষে এরা সবাই একমত হবেন- এমন অনুমান করা যায়। যাই হোক, আমাদের বর্ণনাত্মক ও অনেতিবাচক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ বুঝ নিয়েও আমরা নেতিবাচক ‘ইসলামীকরণ’ নিয়ে আলোচনা করব।

আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ১/১১-এর ক্ষমতা দখল পছন্দ বা সমর্থন করেছিলেন কেন? পলিসির দিক থেকে নিয়ে এ প্রশ্ন করা বা আলোচনা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এ নিয়ে আমেরিকার অবস্থান কী ছিল- এর ফরমাল-ইনফরমাল ভাষ্য অথবা উইকিলিকস থেকে জানা ভাষ্য ইত্যাদি নানা কিছু থাকলেও বাস্তবে আমরা যা দেখেছি, সেখান থেকে তেমন এক অভিন্ন ভাষ্য মোটামুটি যা দাঁড়াতে পারে, তাই এখানে বলা হবে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে সে ভাষ্যটা হবে : বাংলাদেশের নিজ ভূখণ্ডে গ্লোবাল টেররিজমের প্রভাব প্রতিরোধে বিএনপি তার আমলে অনেক করলেও যথেষ্ট করেনি বা সিরিয়াস নয়। এ ছাড়া, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেও সেভাবে গুছিয়ে তৈরি করেনি। ‘সীমাহীন’ দুর্নীতিও ছিল। তাই দুর্নীতি তাড়ানোর অজুহাতে রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দিতে ওই ক্ষমতা দখল ঘটেছিল, যা আমেরিকার পছন্দ ও সমর্থিত।

খোলাখুলি বলার সুযোগ থাকলে ১/১১-এর পক্ষে আমেরিকার অবস্থানের সাফাই মোটামুটি এমনই হতো, এটা ধরে নিয়ে আলোচনায় আগাব। তার মানে দাঁড়ালÑ বিবিসি এই রিপোর্টে বাংলাদেশের ১০ বছরকে মূল্যায়ন করতে বসেছে, সেই ১০ বছর হলো আসলে আমেরিকার ‘তৈরি করে দেয়া’, রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দেয়ার পরের বাংলাদেশ। ওই সাজানো রাষ্ট্র কে চালাবে, তেমন একজন শাসকও আমেরিকা পছন্দ করে তার পিঠে হাত রেখেছিল। ওই শাসক বা পরিচালক ছিল দল হিসেবে আওয়ামী লীগ। তবে এটা হতে পারে যে, আমেরিকা শেখ হাসিনার শাসনের ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় পাঁচ বছরের দায় নিয়ে আপত্তি করলেও প্রথম পাঁচ বছরের দায় আমেরিকার অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটা স্পষ্ট।

এখন আমরা দেখব, তাহলে বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুট দেয়া আলোচকদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনÑ সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ, এর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এর সোজা মানে হলো, আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য যে সাজানো রাষ্ট্র আর শাসক ঠিক করে দিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের ১০ বছরের শাসনে হাসিনার টেররিজম মোকাবেলা করায় তা খামোশ হয়ে যাওয়ার বদলে উল্টো ব্যাপক ‘ইসলামীকরণ’ হয়েছে- এটাই নয় কি? বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ হয়ে যাওয়া, এই ফেনোমেনা তাদের অপছন্দের; কিন্তু এটাই আমেরিকার নীতি-পলিসি আর বেছে দেয়া শাসক- এসব মিলিয়ে তাদের শাসনের প্রডাক্ট বা ফলাফল তা নয় কি? লক্ষ করতে হবে, ইসলামীকরণ তাদের অপছন্দের ফেনোমেনা কি না সেটার চেয়েও বড় বাস্তবতা হলো, এই ‘ইসলামীকরণ’ আমেরিকার নীতি আর মনোনীত শাসকের শাসনেরই (অন্তত প্রথম পাঁচ বছরের) প্রডাক্ট। কেন এমন প্রডাক্ট বা ফলাফল প্রসব করল আমেরিকার নীতি-পলিসি? সেই প্রশ্ন আর পাল্টা মূল্যায়নে যাওয়া উচিত নয় কি বিবিসি ও তার আমেরিকান আলোচকদের?

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেটে’ চলে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাকে ধন্যবাদ। কিন্তু এই উপলব্ধি কবে থেকে তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে। একই সাথে সরকার ইসলামের নামে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং তৎপরতাকে ‘নির্মূল’ করতে চেয়েছে। এটাই তো বুশ প্রশাসনের ‘টেররিজম’ মোকাবেলা যে, ইসলামের নামে তৎপর যেকোনো ফেনোমেনাকে দমন-নির্মূল করো। গত ২০০৯ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকারে এই পথ কি আমেরিকার অজানা ছিল? তা মনে করার কোনো কারণ নেই। অথচ তামাশার দিকটি হলো- এটা তো ছিল আসলে ওবামার আগের বুশ প্রশাসনের নীতি। থিংকট্যাংক র‌্যান্ডের গবেষণা প্রস্তাব মেনে নিয়ে বুশ প্রশাসনের পুরানা নীতির এই পথ থেকে সরে যায় ২০০৮ সাল থেকেই বুশ প্রশাসন। পরে ২০০৯ সাল থেকে ভালোভাবে ওবামা প্রশাসন টেররিজম প্রসঙ্গে তাদের নীতি-পলিসিতে সংশোধন আনে। ইসলামের ‘সশস্ত্র’ ধারাগুলোর বেলায় নীতি আগেরটাই।

তবে অন্যান্য ধারা, নিরস্ত্র বা আইনি রাজনৈতিক ধারা- এদের প্রতি সহনশীল এবং একসাথে কাজ করা। মিসরে হোসনি মোবারককে সরিয়ে নির্বাচনে শাসক ও শাসন বদলানো এবং তাদের সাথে আমেরিকার কাজ করা, এটাই নতুন নীতির বৈশিষ্ট্য। বদলে যাওয়া এই নীতি, যেটা ‘আরব স্প্রিং’ পলিসি বলে পরিচিত। এসবের বিপরীতে বুশ প্রশাসনের টেররিজমের ‘বাংলাদেশ ভার্সন’ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে ইসলামের নামে সক্রিয় ফেনোমেনাকে দমন। আর সুকৌশলে যেকোনো বিরোধী রাজনীতি যেটা ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ তাকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে দমন-নির্মূল করা। মানে দাঁড়ালো জর্জ বুশের আমেরিকা যে নীতিকে ভুল মেনে সংশোধন করে সরে গেছে বাংলাদেশে সরকার সেই নীতিতে চলেছে। আর ২০০৯ সালের পর থেকে আমেরিকা সেটি উপেক্ষা করে গেছে, দেখেও না দেখে।

সেই থেকে ক্ষমতাসীনেরা দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে উদ্দেশ্য ও কাজে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ডিপ স্টেটে নিয়ে গেছেন। আজ আলী রিয়াজ অভিযোগ করছেন, ‘ডিপ স্টেট’ বাংলাদেশে ‘গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা’র ব্যাপক বিস্তার এক ধরনের ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে।’ সরকার কি এটা ২০০৯ সালে শুরু করেনি? শুরুতে এটা জামায়াত-শিবিরের ওপর বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে আমেরিকান নীতিনির্ধারক বা থিংকট্যাংকগুলো অন্য দিকে তাকিয়ে এ বিষয়কে উপেক্ষা করে গেছে। এটা কার অজানা যে, হিটলারও শুরুতে তার নাজিজমে নির্মূল তৎপরতা কেবল ইহুদিদের ওপর চালিয়েছিলেন। আর যারা ইহুদি নির্মূল করাকে দেখেও উপেক্ষা করেছিলেন, তারাসহ একইভাবে যে কারো ওপরে যাকে হিটলারের শত্রু মনে হতো, তাদের সবাইকে নির্মূল করা হয়েছিল। শাসন ‘ডিপ স্টেটে’ চলে গেলে এটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হয়ে থাকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকেই আমেরিকার অজানা ছিল না, বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পলিসি কী, সে কোথায় যাবে ও যাচ্ছে। আসলে ১/১১ ঘটানোর প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ কোন গন্তব্যে, কোন অভিমুখে যাবে তা নিয়ে আমেরিকা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আমেরিকার কাছে তা অগুরুত্বপূর্ণ বা কিছু আসে-যায় না, এমন হয়ে গেল। কিন্তু কেন?

মূল কারণ হলো, আমেরিকার যাকে সে ‘টেররিজম ঠেকানো’ বলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সে কাজ করার চেয়েও আমেরিকার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আরেক ইস্যু। সেটি হলো, ‘চীন ঠেকানো’ এই মার্কিন নীতির পক্ষে ভারতকে কাজ করতে রাজি করানো। এর সাথে ভারত আমেরিকায় বাজারে নিজের রফতানি পণ্য নিয়ে প্রবেশের ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ দেশের তালিকায় নিজের নাম উঠিয়েছিল। সে সুবিধা ২০১৭ সালের শুরুতে ট্যারিফ আরোপ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রত্যাহার করে ফেলে।

বাংলাদেশ-ভারত-আমেরিকা কি সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম ইস্যুতে একসাথে কাজ করেছে? এটা ধরে নেয়া যাচ্ছে না। কারণ, তাহলে এই টেররিজম ইস্যুর সাথে ভারতকে বাংলাদেশের ‘বিনা পয়সা’য় ট্রানজিট দেয়ার কী সম্পর্ক? কেন ভারত যা চায় তা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, বাংলাদেশের এই নীতি কেন?

আমেরিকা গত ১০ বছর এ বিষয়ে একরকম অন্ধ হয়ে থেকেছে। তাই গত ১০ বছরে বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ যা কিছু হয়েছে তা আমেরিকার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়ে ঘটেছে। এখন বিবিসি ও এর আলোচকেরা সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অথচ এতে বাংলাদেশ সরকার বা আমেরিকার নীতিকে দায়ী করছেন না। আজ হঠাৎ বাংলাদেশ ডিপ স্টেটে চলে গেছে বলে আঙুল তুললে এর দায় অন্য কারও বলে ব্যাখ্যা দেয়া কি সঠিক? নাকি আমেরিকান পলিসিকে প্রশ্ন করতে হবে, মুরোদ থাকলে পলিসি নির্মাতাদের দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ, সত্যিকার পুনঃমূল্যায়নে যেতে হবে।

অথচ সারকথা, ভারতের আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’র ঠিকাদারি নেয়াতেই বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে গেল না কোথায় গেল তা নিয়ে আমেরিকার অনাগ্রহের শুরু।

এক শুভসকালে আলী রিয়াজ এসব লক্ষ করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করতে চাইছেন। কিন্তু কাকে এই অভিযোগ করবেন? ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ এ দু’টির মধ্যে ১৯৭১ সালেও কোনো বিরোধ ছিল না। কেউ বিচার এড়ানো যুদ্ধাপরাধী হলে তাকেও সুস্থ পক্ষপাতহীন বিচারপ্রক্রিয়া কাঠগড়ায় নেয়া যেত। কিন্তু ‘যুদ্ধাপরাধী’র সাথে ইসলামের কী সম্পর্ক? কোনো দলে দোষত্রুটিকে ইসলামের ত্রুটি হিসেবে দেখানো, ইঙ্গিত করা- এটা তো সুস্পষ্ট অসততা। ইসলামপন্থী রাজনীতি মোকাবেলার পথ ও উপায় হিসেবে এটাকে ব্যবহার করা- এটা কি ইসলামবিদ্বেষী কাজ নয়। এর চেয়ে দূরদর্শিতা আর কী হতে পারে? এই রাজনীতি আজ অথবা কাল নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হবেই।

আর এসব অবিবেচক তৎপরতার সামাজিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। কার্যত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা আগের চেয়েও আরো বেশি থাকার পক্ষে মানুষ ঝুঁকে গেছে। এটিকে বিবিসি বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ বলছে।

বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ ঘটে গেছে বলে কারো দিকে আঙুল তোলার আগে উচিত হবে, আমেরিকার বিদেশ নীতি আর সেই সূত্রে ভারতের নীতির মূল্যায়ন করে দেখা। তাতে দেখা যাবে যে কথিত ‘ইসলামীকরণ’ আসলে আর কিছু নয়, আমেরিকান ফরেন পলিসি, তা থেকে ভারতের পলিসি ঢাকার সরকার কী করছে তা উপেক্ষা করা, আর সবার ওপরে ডিপ স্টেট আর চরম ইসলামবিদ্বেষী পলিসির চর্চা, এসবের ফলাফলের অপর পিঠ। বাংলাদেশে ‘ইসলামীকরণ’ ঘটেছে বলে অস্পষ্ট নেতিবাচক অবস্থান ত্যাগ করা উচিত, বরং আমেরিকার নীতির কোন ভুলে এটা ঘটল তা পুনঃমূল্যায়িত করা এবং ইতিবাচকভাবে আগালে বাংলাদেশের মানুষ তাতে সাড়া দেয়ার সুযোগ এখনো আছে। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার কি নিজের পলিসি পুনঃমূল্যায়নের সাহস আছে? এই ট্রাম্প আমলে এসে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেছে।

বিবিসির রিপোর্টে নির্বাচনে প্রভাব রাখার মতো পাঁচটা পরিবর্তন উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আসল এক ফ্যাক্টরের কথা তারা বলতে পারেননি। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? সরকার যদি নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করাতে সফল হয়ে যায়, সেটি ঠেকাবে কে? সবচেয়ে বড় এই ফ্যাক্টরের ব্যাপারে বিবিসি বেখবর।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al