২৩ মার্চ ২০১৯

পেটসর্বস্ব বুদ্ধিজীবিতা

-

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সে অনুষ্ঠান ছিল নিয়মিত ব্রিফিং, বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ কোনো কিছু নয়। বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোয় ৬ ডিসেম্বর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি প্রেরিত এমন রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘এর আগে নানা সময় বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের ভোট নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগ্রহ দেখিয়েছে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র রবীশ কুমার এড়িয়ে যান।’

তার মানে, ভারত অন্য দেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করে না এমন নয়; করেই থাকে এবং সেটা এখানে সর্বজনবিদিত। তার পরও কোনো মন্তব্য করেননি মুখপাত্র। কিন্তু তবুও যে কথার অর্থ হয় না এমন কথা হিসেবে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না, প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে।’

গত ১৭ নভেম্বর প্রথম আলোতে এমনই এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা ছিল মূলত ওই প্রতিনিধিরই নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে নেয়া কিছু মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াসংবলিত একটি রিপোর্ট। আর সেই মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াদাতা ছিলেন ভারতের কিছু সাবেক এবং বর্তমান রাষ্ট্রদূতও। এ ছাড়া, আরো ছিলেন এক থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব।

সে সময় বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সাথে সরাসরি সে প্রতিনিধির কথা হয়নি। তবে অন্য কোথাও তিনি যেসব কথা বলেছেন, এমন রেফারেন্সে কিছু কথা সেখানে আছে। যেমন- বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এটা দেখে ভারত ‘উৎফুল্ল’। এ ছাড়া, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না করলেও তারা মনে করেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে ঠিক সময়েই ভোট হবে এবং সেই ভোট হবে ‘অংশগ্রহণমূলক’; বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাকবে ইত্যাদি।

আমাদের নির্বাচন নিয়ে ভারতের এ ধরনের প্রতিক্রিয়া পড়তে গিয়ে সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হলো, আমাদের কোনো ইস্যুতে ভারতের ‘সরকারি অবস্থান’ অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কখনোই কোনো ‘নীতিগত অবস্থানে’ অথবা কোনো ‘মরালের’ ওপর দাঁড়িয়ে তারা বলছেন- তা আমরা সাধারণত দেখিনি।

তাদের মন্তব্যগুলো অনেকটা ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিকের’ বক্তব্য ধরনের। যার যার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এমন যে, তা সব সময় মরালিটি-ভিত্তিক হয় না। ফলে তা ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম’সর্বস্ব বক্তব্য। আর যা ভারতের ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক’সর্বস্ব, তাতে ভিন্ন রাষ্ট্র বাংলাদেশের কী স্বার্থ? এর সোজা মানে, তা ভারতের সরাসরি একান্ত স্বার্থের দিক থেকে বলা কথা। অর্থাৎ ইন্টেলেক্ট ভ্যালুজ বা ‘বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে বলা কোনো কথা নয়।

আসলে একটা নীতিগত অবস্থানের ওপরে দাঁড়ানো মানে, এর পেছনে কিছু ভ্যালুজ বা মূল্যবোধ বা মরাল কাজ করে থাকে। ‘বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধ’ বলতে যেমন- যেকোনো রাষ্ট্রের নাগরিক মৌলিক স্বার্থ বা আন্তর্জাতিক মানবিক নাগরিক অধিকার। সব রাষ্ট্রেরই করণীয় ‘নাগরিক অধিকার রক্ষার’ ন্যূনতম কর্তব্য আছে। তাই চেষ্টা করলে এটা যেকোনো দু’টি রাষ্ট্রের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধের’ কিছু ভিত্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এর অনুপস্থিতি মানে, সেসবের ওপরে দাঁড়িয়ে বলা কথা যদি না-ই থাকে, তবে ভারতের সরকারি অবস্থান অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট বা সাবেক কূটনীতিকসহ যে কারো মন্তব্যের কোনো অর্থ-তাৎপর্য বা ভিত্তি থাকে না। যেমন- বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘নাগরিকদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার অধিকার’ থাকতে হবে। এটা মানার মতো কি ভারতের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সত্যিই আছেন?

সব রাষ্ট্রেরই কৌশলগত নানা স্বার্থ থাকে, যার ফলে সত্যি কথাটা সব সময় সরাসরি বলতে পারে না। তবে মিথ্যা না বলে, মানে সত্য-মিথ্যার মাঝখানে নিজ অবস্থান অস্পষ্ট, রেখে কথা বলার ধরন, এটাই যেন কূটনৈতিক ভাষার এক বড় বৈশিষ্ট্য। এ তো গেল রাষ্ট্রীয় অবস্থান; কিন্তু কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তি যিনি সরকারি পদে নেই, তার কোনো ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা না বলতে না পারা অগ্রহণযোগ্য। বরং এতে তিনি আসলে একরকম করুণার পাত্র হয়ে যান। আর সোজা ভাষায় বললে তা হয়ে দাঁড়ায় পেটসর্বস্ব এক লোকের অযাচিত বা গায়ে পড়া কিছু কথা। এর চেয়ে বড় কথা, এতে তার ধান্ধাবাজি ও পেটিস্বার্থের দিকটিও উদোম হয়ে যায়।

এ কথা সত্য, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জিনিসটিই সব সময় মরালিটি দিয়ে গঠিত ও উদ্ভূত হয় না। তাই অনেকের কাছে তা রক্ষা করা কঠিন। এর পরও রাষ্ট্র-সরকারের নীতি-পলিসিগত কিছু ন্যূনতম দিক সেখানে থাকে। চাইলে তা রাখাও সম্ভব; আর তা বজায় রাখতেও হবে। কিন্তু এই মাপকাঠিতে ব্যক্তির, বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে জড়িতদের বেলায় এমন ছাড়ের কথা বলা হচ্ছে না। সে সুযোগও থাকার কথা নয়।

আবার ‘রাষ্ট্রস্বার্থ’ বলেই তার ক্ষেত্রে সব ছাড়, ব্যাপারটা তেমনও নয়। বাংলাদেশে দিল্লির স্বার্থ আছে, থাকবে। কিন্তু অবশ্যই সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিষয়ক ন্যূনতম কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে হতে হবে। জাতিসঙ্ঘের বা আন্তর্জাতিক নীতি কনভেনশনের কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার হবে এসবের ভিত্তি। আসলে এমন ভিত্তির ওপর যদি দাঁড়াতে পারি, তবে সেই কারণে আপনাতেই সেখান থেকে ভারতের পক্ষ থেকে মন্তব্য করার ভিত্তি ও সাফাই তৈরি হতে পারে। কারণ, উভয় রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের পক্ষের কিছু নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অভিন্নতা, এটাই সেই ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

যেমন- ‘জনগণকে অবাধে ভোট দেয়ার সুযোগ দিতে হবে।’ আর সেই অবাধে দেয়া ভোট থেকেই ‘একমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতার ম্যান্ডেট’ প্রাপ্ত হতে হবে- এটা ভিত্তি হতেই হবে। কারণ, কথাটি কেবল বাংলাদেশের বেলায় নয়, ভারতের বেলায়ও সমান সত্য। আর এটা যেকোনো মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থ এমনই ‘দুস্থ আর হাভাতে’ অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশের জনগণের ‘ভোট দেয়ার অধিকার’- ন্যূনতম এ দিকটি উপেক্ষা করে হলেও যেকোনো উপায়ে ভারতকে বাংলাদেশ থেকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। এমন জায়গায় পৌঁছে গেছেন ভারতের নীতিনির্ধারক মহল।

গত সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশে আসা আর তার খোলাখুলি হস্তক্ষেপ, রেকর্ড হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দল নিয়ে’ মানে, বিএনপির জোটকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। আর এরশাদের সাথে মিটিংয়ে তাকে নির্বাচনে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা এরশাদ গণমাধ্যমে প্রকাশও করে দিয়েছিলেন। এরশাদ বলেছিলেন, তাকে ‘পাতানো’ বিরোধী দল হয়ে যেতে বলা হচ্ছে, তা না হলে নাকি ‘বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায়’ এসে যাবে।

আমরা সবাই বিস্ময়ে লক্ষ করেছি সুজাতার সে হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ভারতের কোনো বুদ্ধিজীবী, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কেউ কখনো নিন্দা বা সমালোচনা করেননি। নিজেরা লজ্জিত ও বিব্রতও হননি। অন্তত সরকারের এই ভূমিকার প্রশ্নে তাদের কোনো ভিন্ন মত আছে, এমনটি দেখা যায়নি।

বাংলাদেশে আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন এসেছে। আর তারা এই নির্বাচন নিয়ে আবার মন্তব্য করতে এসেছেন। রাষ্ট্র, নির্বাচন, সরকার ইত্যাদি বিষয়ে তারা কী বলবেন? কাকে ভালো, কাকে মন্দ বলবেন? কিসের ভিত্তিতে বলবেন? ভারতের ইন্টেলেক্ট, সাবেক ডিপ্লোম্যাট বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কখনোই সে ভিত্তি তৈরি করা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারেননি। তাই একধরনের পেটসর্বস্ব বা স্বার্থসর্বস্ব হয়েই আছে সব কিছু।
এ অবস্থায় এবার ভারতের মুখপাত্র রবীশ কুমার যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে’- এসব প্রতীয়মান হচ্ছে হাস্যকর ‘অনর্থক কথা’ হিসেবে।

ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমারের মন্তব্য করতে না চাওয়ার অর্থ কী? যে অর্থ না লিখলেও প্রকাশিত হয়ে যায়, সেই অর্থটা কী? এর সোজা অর্থ হলো, বাংলাদেশে যা হচ্ছে, এ পর্যন্ত সেটাই ঠিকঠাক; অর্থাৎ হবে বলে যা হয়েছে সেটিই ভারতের স্বার্থ ও অবস্থান। দ্বিতীয়ত, এর আর এক অর্থ হলো, যদি ভারত প্রকাশ্যে তার ‘অনুমোদনের কথা’ ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো প্রকাশ করে ফেলে, তবে সমস্যা হবে। কারণ, এবার এ দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। যেকোনোভাবে আওয়ামী লীগ আবার জিতেছে, এটা তাদের প্রথম চয়েজ বা কাম্য হলেও যদি কোনো কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কোনো ‘বিপর্যয়’ ঘটিয়ে ফেলে, তখন কী হবে? এই দুশ্চিন্তা থেকেই তাদের ওইসব ‘অনর্থক কথা’। এমন অর্থই রবীশ কুমারের ‘না বলা কথা’ প্রকাশ করেছে।

বোঝা যাচ্ছে, ভারত সরকারের মুখপাত্র অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সবাই এখনো এমনই দুস্থ-হাভাতে অবস্থায় আছেন যে, তাদের পক্ষে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক ভোটের অধিকার প্রসঙ্গেও কোনো নৈতিক অবস্থান নেয়া অসম্ভব। এ কারণেই ভারতের সরকার বা কোনো ইন্টেলেক্টের বিবৃতি-মন্তব্যের কোনো গুরুত্ব তাদের কাছেও নেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al