১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

জামাল খাশোগি : একজন নাগরিকের দুর্ভাগ্য

জামাল খাশোগি : একজন নাগরিকের দুর্ভাগ্য -

সৌদি নাগরিক জামাল খাশোগি এ সময়ের বিশ্বে এক আলোচিত নাম। আবার আশির দশকে আর এক খাশোগির নাম আমরা শুনেছিলাম, আদনান খাশোগি। ড্রাগ বা অস্ত্রের মতো চরম নিষিদ্ধ বা বেআইনি পণ্যের পেমেন্ট লেনদেনে জড়িত ব্যাংক বিসিসিআইর ডিরেক্টর ছিলেন আদনান। তাই তিনি ‘কুখ্যাত’ আর জামাল দুনিয়ার সহানুভূতি পাওয়া, দুর্ভাগ্যজনক ব্যক্তিত্ব। সেকালের পত্রিকায় লেখা হতো ‘সৌদি ধনকুবের আদনান খাশোগি’। সেই আদনান খাশোগির ভাতিজা হলেন জামাল খাশোগি।

জামাল খাশোগির দাদা মোহাম্মদ খাশোগি ছিলেন মূলত তুরস্কের নাগরিক, এক ডাক্তার। তিনি সৌদি আরবে এসে সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর রাজ পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। পরে এক সৌদি নারীকে বিয়ে করে সৌদি নাগরিক হয়ে যান। তারই নাতি জামাল খাশোগির জন্ম ১৯৫৩ সালে সৌদি আরবে। জামাল রাজ পরিবারের সাথে রক্তের সম্পর্কের কেউ নন। কিন্তু তা না হলেও দাদার সূত্রে, রাজ পরিবারের অনেকের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার কারণে সৌদি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়ে ওঠেন। তবে সেটা হওয়ার পেছনে আর একটা ফ্যাক্টরও গুরুত্ব পায়, যখন জামাল পড়ালেখায় আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতায় ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

কারণ তার এরপরের পরিচিতির অঙ্গনটা হলো- মধ্যপ্রাচ্যের মূলত বিদেশী বিভিন্ন ইংরেজি মিডিয়ার জগত। চাকরি সূত্রে তিনি ‘সৌদি গেজেট, আরব নিউজ, আল ওয়াতন ইত্যাদির পত্রিকার সাথে জড়িয়ে পড়েন। প্রিন্ট মিডিয়ায় সাধারণ রিপোর্টার থেকে প্রধান সম্পাদক, টিভি মিডিয়াতে নিউজ এডিটর থেকে ডিরেক্টর- এভাবে পুরো নব্বইয়ের দশক হলো মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে জামাল খাশোগির উত্থান কালপর্ব। এ সময়েই এক ফাঁকে ফেলো সিটিজেন ওসামা বিন লাদেনের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন এবং সেই সোভিয়েতবিরোধী প্রতিরোধে মুজাহিদিনের লড়াইয়ের সময়কাল থেকে কয়েকবার তিনি লাদেনের সাক্ষাৎকার ছেপেছেন। তবে অবশ্যই আমেরিকায় টুইন টাওয়ার হামলার পরে সেই বিন লাদেনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ভিন্ন বিষয়।

তবুও অনেকের সাথে সেসব পুরনো পরিচয় আর বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও তার গঠন সম্পর্কে জানাশোনা একদিকে; অন্য দিকে পশ্চিমের চিন্তার সাথেও পরিচিতি আর পশ্চিমের ভাষায় তা উপস্থাপনের দক্ষতার জন্য জামাল গুরুত্বপূর্ণ ‘রিসোর্স পারসন’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে ওঠেন। পারিবারিক সূত্রের সুবিধায় রাজপরিবারের নানা প্রজন্মের অনেক সদস্যের সাথে তার স্বাভাবিক পরিচয়ও ছিল। তেমন একজন হলেন এক প্রিন্স, তুর্কি বিন ফয়সল বিন আব্দুল আজিজ। পুরো আফগান মুজাহিদিন লড়াইয়ের সময়কালে তুর্কি ছিলেন সৌদি গোয়েন্দাবাহিনীর প্রধান। তিনি আসলে মুজাহিদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে যারা সৌদি ফান্ডের সাথে সম্পর্কিত তাদের অর্থ বিতরণ আর নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও পরিচালনা করতেন। পরে ২০০১ সালের দিকে গোয়েন্দাপ্রধানের কাজ ছেড়ে কিছুদিন তিনি সৌদি আরবে ফিরে গিয়ে সেখানেই ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি লন্ডনে বা আমেরিকায় কাটিয়েছেন, বিশেষ করে পড়ালেখার সূত্রে। পরে ২০০৫ সালে তিনি ব্রিটেনে সৌদি রাষ্ট্রদূত যুক্ত হন। আর সেই সময় তিনি জামাল খাশোগিকে তার মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করেন।

এই জামাল খাশোগি গত ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে প্রবেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখান থেকে গুম বা খুন হয়ে যান। আলোচনার প্রসঙ্গ এখান থেকে। জামালের দুর্ভাগ্য যে, মনার্কি বা রাজতন্ত্রের দেশের নাগরিক। বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা লাভের দিক থেকে তিনি পশ্চিমের আলোতে বড় হয়েছেন, ফলে যথেষ্ট আলোকিত বলা যায়। এরপরেও তার দুর্ভাগ্য, তিনি রাজতন্ত্রের জমিদারসুলভ অহঙ্কারের শিকার হয়ে জীবন দিয়েছেন। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, বাদশার ছেলে তাকে খুন করে নিজের জেদ পূরণ করতে চান। এখানে ‘নাগরিক’ শব্দটা ব্যবহার করেছি বটে, কিন্তু শব্দটা রাজতান্ত্রিক শাসনের সাথে মানায় না।

রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থাকে দুটো ধরনে ভাগ করা যায়- অতীত ব্যবস্থা আর চলতি বা মডার্ন ব্যবস্থা। অতীত ব্যবস্থা বলতে আগেকার রাজতন্ত্র বা বাদশা-আমিরিতন্ত্রের ডাইনেস্টি বা বংশীয় শাসনের ব্যবস্থা। তারা সবাই একটা ক্যাটাগরি। আর এদের সবার বিপরীতে ‘রিপাবলিক’। না, এটা প্রাচীন ‘রোমের রিপাবলিক’ নয়, তাই ফারাক টানতে অনেক সময় একে ‘আধুনিক প্রজাতন্ত্র’ বা ‘মডার্ন রিপাবলিক’ বলেও উল্লেখ করা হয়। মূলত অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে(১৭৮৯) ও স্বাধীন আমেরিকায় (১৭৭৬) এর উত্থান ও সূচনা। তবে ‘মডার্ন’ শব্দটা শুনেই একে নিন্দা করা, অথবা এটা আমাদের জন্য নয় এ ধরনের মনে করাটা ভুল হবে।

‘রাষ্ট্র’ কথাটা আগে মানে রাজতন্ত্রের রমরমা যুগেও ভিন্ন অর্থে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অথবা একটা ‘শাসনব্যবস্থা’ মানেই তা রাষ্ট্র এমন বর্ণনামূলক অর্থে এখনো কেউ কেউ ব্যবহার করেন। কিন্তু ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ধারণাটা বাস্তবতা হয়ে ওঠার পরে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটা একটা স্তরে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে বলে মনে করা যায়। অর্থাৎ দুনিয়াতে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা উত্থিত হতে হতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অর্ধে এসে এটা একটা স্পষ্ট ধারণার স্তর পার হয়ে বাস্তব হয়েছে মনে করা হয়। আর ‘লাইন’ টানা হয় যে, আর রাজতন্ত্র নয়, অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের পেছনে আর না যাই। যা হোক, কেবল রিপাবলিকের বেলায় ‘রাষ্ট্র’ শব্দ ব্যবহার করা হবে। স্বভাবতই এর মানে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা ক্রম বিকাশমান। এর একটা বড় পর্যায় বা স্তর হলো অষ্টাদশ শতক। এটা ক্রমশ আরো বিকশিত ও স্পষ্ট হয়েছে আর নিজেকে শুধরে নিচ্ছে। মূল কথা ফরাসি বা আমেরিকান রিপাবলিকই সবকিছুর মডেল নয়; তা হতেই হবে এমন নয়।

কারণ রাষ্ট্র ধারণাটা একজায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, ‘ক্রমশ খুলে ফুটে উঠছে’, আইডিয়া আসছে ও পরিষ্কার হচ্ছে। কেবল প্রধান দিকগুলো খেয়াল করুন; অন্তত বাদশা-আমিরিতে ফেরত যাবেন না। আর রাষ্ট্রকে ক্রম চলমান এক উত্থিত ধরনের আইডিয়া হিসেবে দেখাই ভালো। যেমন দেখেন রুশ বিপ্লব (১৯১৭) বা চীন বিপ্লবে (১৯৪৯) প্রাপ্ত রাষ্ট্র, অথবা কলোনিশাসন মুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র যেকোনো উত্থিত রাষ্ট্র (১৯৪৫ এর পরে যেমন, পাকিস্তান রাষ্ট্র ১৯৪৭), এমনকি সর্বশেষ ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯)- সব ক্ষেত্রেই প্রাপ্ত রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ কথাটা জুড়ে আছে। বিপ্লব শেষে সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নামের সাথে নিজেরাই ‘রিপাবলিক’ শব্দ জুড়ে রেখেছেন যদিও সব রাষ্ট্র একই ধরনের নয়। যেমন লেনিনের ‘রুশ রিপাবলিক’ নিশ্চয়ই ১৭৭৬ সালের ‘আমেরিকান রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মতো নয়, এমনকি মাওয়ের চীনা ‘পিপলস রিপাবলিক’ (১৯৪৯); ১৯১৭ সালের রুশ ‘সোভিয়েত রিপাবলিক’ রাষ্ট্র নয়। ঠিক তেমনি ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক (১৯৭৯) আগের দেখা কোনো রিপাবলিকের মতো নয়।

এমনকি ‘পাকিস্তান রিপাবলিক’- এই পরিচয়ের চেয়ে ওটা ‘ইসলামি’ সেই পরিচয়ের কদরই বেশি। যা হোক, মূলকথাটা হলো, বস্তুত সব নতুন ‘রিপাবলিক রাষ্ট্রই’ নতুন বৈশিষ্ট্যের ধারক হয়ে থাকে। তার জন্ম ও গঠনে বহু নতুনত্ব থাকে, এ অর্থে এটা অনন্য। আর রাজতন্ত্রী দেশগুলোর একটা শাসনব্যবস্থা আছে অবশ্যই, কিন্তু তারা সত্যিকার রাষ্ট্র্র নয়।

‘নাগরিক’ শব্দটা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্র কাদের নিয়ে গঠিত? এর উপাদান বা ‘কন্সটিটিউয়েন্ট’ হলো নাগরিক। এ অর্থে নাগরিকের মতো এই মৌল উপাদানে রাষ্ট্র গঠিত। আর ব্যক্তি নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাজতন্ত্রের এ জিনিসের বালাই থাকে না। এ ছাড়া, রাজতন্ত্রে রাজার ক্ষমতার উৎস কী? তা অন্তত জনগণের ক্ষমতা নয়। ফলে ওসব দেশে একই ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহার করালেও স্বয়ং বাদশাহ নাগরিক নন, এর ঊর্ধ্বে।

পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস
রিপাবলিক-নাগরিক খুন হলে আর কেউ অভিযোগকারী বা বাদি হোক না-ই হোক, রাষ্ট্র নিজেই প্রধান বাদি হয়ে থাকে। অথবা আত্মীয়স্বজন কিংবা আর কেউ বাদি হতে পারেন। আর রাষ্ট্রের তরফে যে অফিস এমন বাদি হয়ে মামলা পরিচালনা করে থাকে সেটা পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এবং এর প্রধানকর্তা ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’। শব্দটার অর্থ রাষ্ট্রের তাকে এর হয়ে মামলা পরিচালনা করার ক্ষমতা দেয়, মানে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ অর্পণ করে। এরই মানে হলো ‘অন্যকে আমার হয়ে মামলা পরিচালনের ক্ষমতা’ লিখে দেয়া। ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ স্থায়ীভাবে এবং সাধারণভাবে দেয়া হয়ে থাকে এবং ওই পদের নাম ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’। আর তার কাজ হলো বাদির অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা আনা আর তা পরিচালনা করা অর্থে ‘প্রসিকিউট’ করা। এ অফিস জনগণের হয়ে মামলা পরিচালনা করে, তাই এটা পাবলিক প্রসিকিউটর। তাকে আমরা ‘পিপি’ বলে চিনতে অভ্যস্ত।

কোনো কোনো রাষ্ট্রে তারা মামলার তদন্তের ভারও পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের ওপর দিয়ে রাখে। ফলে এই অফিসের অধীনে তা হয়ে থাকে। মানে, আমাদের দেশের মতো ‘পুলিশ তদন্ত’ করে ‘পিপি অফিসে পাঠিয়ে’ দেয়ার সম্পর্ক নয়।

সৌদি আরব রাজতন্ত্রী হলেও আধুনিক রাষ্ট্রের আদলে তারাও অ্যাটর্নি জেনারেল নামেই অফিস ও ব্যবস্থা রেখেছে। সরাসরি সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে দেয়া তাদেরই এক ওয়েব লিঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে। এই অফিসের পাবলিক পেজ বলছে,  ‘The Kingdom of Saudi Arabia's Public Prosecutor stated the following: Preliminary investigations carried out by the Public Prosecution into the disappearance case of the citizen Jamal bin Ahmad Khashoggi revealed that the discussions that took place between him and the persons who met him during his attendance in the Kingdom's consulate in Istanbul led to a quarrel and a brawl with the citizen /Jamal Khashoggi, resulted in his death.|
বাংলায়, ‘সৌদি আরবের পাবলিক প্রসিকিউটর নিচের কথাগুলো বলছেন- নাগরিক জামাল বিন আহমদ খাশোগি গুমের মামলায় পাবলিক প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্ত পরিচালনা করে তাতে দেখেছেন যে, জামাল ও তার সাথে যেসব ব্যক্তি দেখা করেছিল ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে জামালের উপস্থিতির সময়ে তাদের সাথে আলোচনা হয়েছিল, তবে সে সময় ঝগড়া ও হইচইপূর্ণ মারামারিও হয়েছিল, তার ফলেই জামাল খাশোগির মৃত্যু ঘটে’।

প্রথমত, এটা মানা কঠিন যে, এটা ‘আইনি’ ডকুমেন্ট। রাষ্ট্রের একটা সর্বোচ্চ আইনি অফিস যারা পেশাদারভাবে রাষ্ট্রীয় মামলা পরিচালনা করার দায়িত্বে, তারা এ ভাষায় বর্ণনা দিতে পারেন না। দুটা নাদান বালকের ঝগড়ার বর্ণনাও আপনাতেই এর থেকে ভালো আইনি ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। যেমন, এখানে বলা হচ্ছে না যে, কারা তারা, কী পরিচয়, যাদের সাথে জামালের কথিত ‘quarrel and a brawl’ ঘটেছে? পিপির অফিস নিজেই অপরাধীর পরিচয় লুকানোর দায়ে অভিযুক্ত হবে।

দ্বিতীয়ত, বলা হচ্ছে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনা- ঝগড়া- হইচইপূর্ণ মারামারি, এভাবে এই ঘটনাক্রম কল্পনা করা অসম্ভব। একা জামালের ‘বহুজনের’ সাথে ‘বিশেষ ধরনের আলোচনার’ তার মৃত্যু হয়েছে পরিণামে এ কথা বলা সোজা মনে হলেও ওই ব্যক্তিরাই তার হত্যাকারী। কিন্তু এই সত্যের দিকে পিপি অফিসের আগ্রহ নেই।

তৃতীয়ত, দেশের কোনো সরকারি অফিসে কোনো নাগরিক কারও সাথে দেখা করতে গেলে কথাবার্তা থেকে তাতে ঝগড়া বাধবে কেন? আমি চাইলেও সেই কর্তা ঝগড়া করবেন কেন? বড় জোর উনি আমাকে বের করে দেবেন। আগে আমাকে ওয়ার্নিং দেবেন, এর পরিণতি বলবেন, কেন করবেন, তা ব্যাখ্যা করবেন, কেবল পেশাদার গার্ডদের দিয়ে বের করাবেন এবং তা যতদূর সম্ভব আমাকে স্পর্শ না করেই করবেন। কিন্তু তা না, একটা দূতাবাসের অফিসে একেবারে হইচই করে মারামারি বাধালেন, আর শেষে এমনকি খুন করে ফেললেন? কী সুন্দর! আর এ গল্প বিশ্বাস করল ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ তদন্ত অফিস’?

চতুর্থত, লাশ কই? পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের বিবৃতি থেকে, তাদেরও তা জানার কোনো আগ্রহ আছে বলে দেখা গেল না। তারা নাকি ‘ক্রিমিনাল অপরাধ তদন্ত’ এর সর্বোচ্চ অফিস!

ঘটনাক্রমে এখানে পাশাপাশি তিনটি রাষ্ট্রের পাবলিক প্রসিকিউটর ও নির্বাহীদের কাজ ও কথার প্রসঙ্গ এসেছে। তারা হলেন, রাজকীয় সৌদি আরব, রিপাবলিক তুরস্ক আর রিপাবলিক আমেরিকা। জামাল সৌদি নাগরিক। কিন্তু নিজ দেশের এক কনসুলেটে এসে ‘আলোচনা’ হচ্ছিল। এর আড়ালে কাটা টুকরায় খুন হয়ে গেলেন। লাশের কথা পিপি বলতে পারছেন না। অথচ এর বিপরীতে, তুরস্ককে দেখুন, বলতে গেলে বিষয়টাকে সিরিয়াস ইস্যু হিসেবে দেখা, তদন্ত আর তথ্য জোগাড়ের কাজ তুরস্ক রিপাবলিকই করেছে। অনেকের মনে হতে পারে, তুরস্ক-সৌদি রেষারেষির কারণে এরদোগান অতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তিনি ফায়দা নিতে চান। এমন ভাবনাকারী সবার যে দিকটা নজর এড়িয়ে যায় তা হলো- রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার দায়; নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দায় পালনে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

রদোগানসহ তুরস্ক রাষ্ট্রের নির্বাহী দায়িত্বের সবাই এই উদ্যোগ না নিলে তারা নিজেরাই বরং অপরাধে অভিযুক্ত হতে পারতেন। আমাদের লক্ষ করতে হবে, তুরস্কের মাটিতে গুম ও খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধ ঘটেছে। খুনিরা তুরস্কের বা বিদেশী যেই হোক- এ অপরাধীদের আইনিভাবে ধরে আনতে হবে। পরে তাদের আইনি হেফাজতে নিয়ে জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুমদাতা ও সহযোগীদের তুরস্কের আদালতে হাজির করতে এরদোগান ও তার পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস আইনগতভাবে বাধ্য।

অপর দিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ আমেরিকার নির্বাহীদের দিকে তাকান। স্পষ্ট করেই ট্রাম্প বলছেন, সৌদির কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির স্বার্থ আছে। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে তাকে বলতে হচ্ছে, এটা ‘খুনি মিথ্যুকের কাজ’ এবং এর ‘পরিণতি হবে ভয়াবহ’। সিনেটর বা কংগ্রেস সদস্যরা খোলাখুলি অন ক্যামেরা প্রেসিডেন্টকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান রাখছেন, ‘নইলে তারাই উদ্যোগ নেবেন’ বলতে হচ্ছে। একজন মিথ্যুক ও খুনির সাথে রাষ্ট্রের কোনো নির্বাহী বা জনপ্রতিনিধি বৈঠক করেছেন, যোগাযোগ রেখেছেন- এটা কিছুতেই তারা ঘটতে, গোপনে ঘটাতে বা দেখাতে চান না। আমেরিকা রাষ্ট্রের অপকর্মের শেষ নেই, কথা ঠিক। এরপরেও কিছু মূল্যবোধ আছে, যা লঙ্ঘন করলে কারো কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে। রাজতন্ত্রে আসলে শান্তিতে খুন হওয়ারও সুযোগ নেই। প্রতিহিংসা দেখাতে আঙুল কেটে নিয়ে যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে না দেখায়, ঘটনা তত বড় নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটা সৌদি ডায়নেস্টির সমাপ্তিসহ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ম্যাপ, নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে- আরো বড় বিষয় হবে অস্থিতিশীলতা।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মড়ঁঃধসফধং১৯৫৮@যড়ঃসধরষ.পড়স


আরো সংবাদ