২৪ জানুয়ারি ২০১৯

নেপালের পর এবার ভুটান হাতছাড়া!

নেপালের পর এবার ভুটান হাতছাড়া! - ছবি : সংগৃহীত

ভারতের জন্য সম্ভবত ‘আরেকটা উইকেট’ পড়তে যাচ্ছে। না ক্রিকেট খেলা নয়, ভুটানের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। ভুটানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১৫ সেপ্টেম্বর। প্রো-ইন্ডিয়ান যে দল ক্ষমতায় ছিল (পিডিপি), এবারের নির্বাচনে এর শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। ভোটের ফলাফলে দলটি নেমে গেছে তৃতীয় অবস্থানে। এটা অবশ্য প্রথম রাউন্ডের নির্বাচন। সেকেন্ড বা ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে ১৮ অক্টোবর। ২১ সেপ্টেম্বর ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার শেষ দিন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে ভারত ‘নিজের বাড়ির পিছনের বাগানবাড়ি মনে করতে ভালোবাসে; শুধু তাই নয়, নিজের কোনো মুরোদ থাকুক আর নাই থাকুক, চীন কেন সেখানে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে হাজির হবে এবং চীনের প্রভাব বাড়াবে তা নিয়ে আপত্তি কেউ শুনুক আর না শুনুক, ভারত নিয়মিত উষ্মা-অভিযোগ করে যেতে খুবই ভালোবাসে।

ভুটান এক দিকে ভারত ও অন্য দিকে চীন দিয়ে ঘেরা। পড়শি নেপাল রাষ্ট্রের মতোই ভুটানও ভূমিবেষ্টিত। সাম্প্রতিককালে ভারতের নাগপাশ ছিঁড়ে নেপালের সার্বভৌমত্বের চর্চা, সাহস এবং তার পদক্ষেপগুলো দেখে সম্ভবত ভুটানের মনেও অনেক সাহস জমা হয়ে থাকবে। প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফল অন্তত এর প্রকাশ ভারতের জন্য সম্ভবত আরেক উইকেটের পতনের ইঙ্গিত!
ভুটানে নির্বাচনব্যবস্থা দুই স্তরে সম্পন্ন হয়। তাই এবারের নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ করতে দ্বিতীয় স্তরের নির্বাচন হবে ১৮ অক্টোবর, যেখানে এবার প্রার্থী হতে পারবেন, ১৫ সেপ্টেম্বরের ফলাফলে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে যারা প্রথম ও দ্বিতীয়, সেই দুই দলের দুই প্রার্থী।

২০১৩ সালের নির্বাচনের ফলাফলের সাথে এবারের একটা তুলনার মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের মধ্যে তুলনা করে বলা চলে, গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে যে (পিডিপি) দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল সেই দল এবার ২০১৮ সালের প্রথম রাউন্ডে হয়ে গেছে তৃতীয়। আর ২০১৩ সালে যে দল দ্বিতীয় হয়েছিল (ডিপিটি), সে এবারো দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। কিন্তু তৃতীয় দল (ডিএনটি) এবার চমক দিয়ে উঠে এসে একেবারে প্রথম হয়ে গেছে। আর প্রথম হওয়া দলটা গঠিত হয়েছিল মাত্র গত ২০১৩ নির্বাচনের আগদিয়ে।

খুব ছোট দেশ ভুটানের লোকসংখ্যা মাত্র প্রায় আট লাখ, যার মধ্যে এবারের মোট ভোটার প্রায় তিন লাখ (২৯১,০৯৮)। এবার ভোটদানের হার বেশি; ভোট পড়েছে মোট ভোটারের ৬৬%, গতবার যা ছিল ৫৫.৩%। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ভুটানি মিডিয়া বলছে, পোস্টাল ভোট এবার অনেক বেশি পড়েছে। এর বেশির ভাগ পেয়েছে প্রথম হওয়া দল। সরকারি কর্মচারী আর প্রবাসী ভুটানি (যারা আগে থেকে রেজিস্টার্ড)- এরাই মূলত পোস্টাল ভোটার। ওই দিকে বাংলাদেশের কোনো কোনো পত্রিকায় খবর বের হয়েছে- প্রথম হওয়া ডিএনটি দলের প্রধান একজন এমবিবিএস ডাক্তার, তিনি আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট। যা হোক, তার দলের বিরাট জনপ্রিয়তা ও প্রথম হওয়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে যে, তিনি বিজয়ী হলে গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৌঁছে দেবেন, বিশেষ করে মা ও মেয়েদের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। এই প্রতিশ্রুতি তাদের মনে ধরেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো অবকাঠামো যেখানে খুবই অপ্রতুল যেমন- মোট মাত্র ১৮ হাজার বর্গমাইলের ভুটানের (তুলনায় ৫৭ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ) পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে যেতে আজো এক সপ্তাহ সময় লাগে।

আরেক ফ্যাক্ট হলো, ২০০৮ সালের নির্বাচনে এবারের দ্বিতীয় হওয়া দল ‘ডিপিটি’ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু ভারতের চোখে তার ‘অপরাধ’ ২০১২ সালে তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাওয়ের সাথে ব্রাজিলে দলের নেতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করেছিলেন। এতে ভারত খুবই নাখোশ হয় ওই দলের প্রতি। এখান থেকেই পড়শি সব দেশে ভারতের স্বভাব যেটা, যেকোনো একটি দলকে প্রভাবিত করে ওই দেশের রাজনীতি কলুষিত করে ফেলা, তা শুরু হয়। ভুটানের একটি দল- পিডিপি ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে পরের বছর হাজির হয়ে যায়।

সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘স্ট্রেইট টাইমস’। ইন্ডিয়ার ব্যুরো চিফ হলেন নির্মলা গণপতি। তিনি তার রিপোর্টে ভুটানিরা ভারত ও চীন ইস্যুকে কিভাবে দেখে তা বোঝাতে একটা সাবহেডিং বাক্য লিখেছেন এমন- ‘ভুটানিরা দিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে মূল্য দেয়, কিন্তু তারা একই সাথে বেইজিংয়ের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়।’

ব্যাপারটা হলো- ‘মূল্য দেয়’ অবশ্যই অগত্যা। কারণ, না দিলে আরো বিপদ। কিন্তু বেইজিংকেও খুঁজতে হয়। কারণ একতরফা ভারতের কর্তৃত্ব থেকে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতেই হবে।
চীনের সাথে এখনো ভুটানের রাষ্ট্রদূত বিনিময় হয়নি। সেটা এখন প্রক্রিয়াধীন। ইতোমধ্যেই ভারতে পরস্পরের অফিস বা অন্য কোথাও গিয়ে তারা দেখা করে কথা বলে। এ দিকে, ২০০৭ সালের পর থেকে ভুটান আর রাজার খেয়ালি শাসনের দেশ নয়, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের রাষ্ট্র। এবার নিয়ে সেখানে তৃতীয়বার পার্লামেন্ট নির্বাচন হলো। এর আগে প্রায় শত বছরের পুরনো স্বাধীন রাজতন্ত্র হলেও, ১৯৪৭ সালে নেহরুর আমল থেকে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতনির্ভর।

যেহেতু ভারতের ভূমির ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া ভুটানের ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্তি নেই- এটাকেই ভারত একরকম মুক্তিপণ বানিয়ে নিয়েছে; আর ভারতনির্ভর হতে বাধ্য করার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু কত দিন? ভুটানের নতুন প্রজন্ম এ থেকে মুক্তি পেতে যেন মরিয়া। তাই সতর্কভাবে ভারত-বিরোধিতা আর চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার হাতছানি। নেপাল ভারতের বিকল্প চীনা ট্রানজিট (রেল যোগাযোগ) জোগাড় করতে পারলে ভুটানেরও না পারার কোনো কারণ নেই। এটা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এটা অতীতে নেহরুর ‘ভাইসরয়’ ভাব ধরে থাকার খায়েশের ক্ষতিপূরণ। নেহরুর সেই আত্মঘাতী চিন্তার মূল্য ভারতকে চুকাতেই হবে।

খুব সম্ভবত এসব চিন্তা করেই ২০০৭ সালের পর থেকে রাজার আর খামখেয়ালি শাসন নয়। ভারতের হাত থেকে ভুটানকে বাঁচাতে তিনি একা পারবেন না, তাই জনগণকে শাসনের সাথে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বেচ্ছায় রাজা জননির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের সরকার আর রাজা নয়, কনস্টিটিউশনের অধীনে পরিচালিত সরকার- এমন রাজতন্ত্র চালু করে দেন; আর সেই সাথে রাজনৈতিক দল ও তৎপরতা চালু হওয়ায় সরকার গঠনে জনসম্পৃক্ততাও আসে। এখান থেকেই ভুটান সরকারের নিজেরা নিজের সার্বভৌমত্ব চর্চা ও নিজ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালে তদানীন্তন চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ ছিল এর অংশ। কিন্তু ভারত এতে অসন্তুষ্ট হলো। ভুটানের জ্বালানি তেলের সরবরাহকারী ভারত, আর এতে ভারত কিছু ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তাই ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগের দিন ওই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে, নিজের পক্ষে ভুটানিদের ওপর চাপ দিতে- ভারত ওই ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নেয়। হঠাৎ এই চাপের মুখে, জনমনে কিছুটা ভয়ে- সব মিলিয়ে এর প্রভাবে ভারতপন্থী দল পিডিপি ক্ষমতায় আসবে বলে মনে করা হয়েছিল।

কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রো-ইন্ডিয়ান দলের এক নম্বর অবস্থান থেকে তিনে চলে যাওয়াতে ভারতীয় মিডিয়ায় হইচই পড়ে যায়। এমনকি হস্তক্ষেপের আহ্বান, পরামর্শও আসতে থাকে। তেমনি এক রিপোর্ট হলো- টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। এতে কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রানী বাগচী এতে লিখছেন, ‘ভুটানে ভারতকে উদ্যোগ ও তৎপরতা দ্বিগুণ করতে হবে।’ কিন্তু ভুটানে ভারতকে কোন উদ্যোগ নিতে তিনি তাগিদ দিচ্ছেন সেটা উহ্য রাখছেন। ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি আগের মতো কোনো ভারতের হস্তক্ষেপের কথা বলছেন। লিখছেন, ‘পড়শিকে তার স্বার্থরক্ষার আকাক্সক্ষা অর্জন করতে ভারত যেন ভুটানে নিজ প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করে।’ এটা কি সাংবাদিকতা না উগ্র জাতীয়তাবাদী আধিপত্য কামনা? আবার ভাব ধরছেন বিরাট কূটনীতিকের। কোনো কায়দা ব্যবহার করে ‘ভারতকে হস্তক্ষেপ করতে’ আহ্বান করবেন যা কূটনৈতিক বা সাংবাদিকতার নর্মস অথবা আইনের বরখেলাপ।
পড়শির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে হবে- নেহরুর আমল থেকে এটাই ভারতের নিয়মনীতি, পড়শি পলিসি হয়ে আছে। এভাবেই বিশেষ করে ল্যান্ডলকড পড়শিদের নানা চুক্তিতে বাধ্য করে সুবিধা আদায় করা হয়, ব্রিটিশ কলোনি মাস্টার ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেপাল-ভুটানের মতো পড়শি দেশের বেলায় নেহরু যেন ‘ভাইসরয়’ হিসেবে ভূমিকা পালন করে গেছে। মোটকথা, পড়শিদের ভারতকে ‘ট্যাক্স’ দিয়ে চলতে হবে, যাতে নিধিরাম সর্দার ভারত দাবি করতে পারে যে- ‘এই চীন, এদিকে এসো না, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না; এটা আমার এরিয়া অফ ইন্টারেস্ট!

কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হলো, ভারতের যেমন অবকাঠামো ঋণের চাহিদা ও অভাব প্রবল- আর তা মেটাতে চীনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে; তেমনি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার মতো পড়শিরাও সেটাই করছে। কারণ কলোনি আমল থেকে ভারতসহ আমাদের সবার অর্থনীতি হাড় ভেঙে খেটে যা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়, যা আমার হবু বিনিয়োগ পুঁজি, তা লোপাট করেছে ব্রিটিশরা। সে অভাব, সেই বিরাট গ্যাপ (চাহিদা আর প্রাপ্তির) এখন একটু মনোযোগ পাচ্ছে- কারণ চীনের হাতে ব্যাপক উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হয়েছে, যা অবকাঠামো ঋণ হিসেবে দিতে চীনও আগ্রহী।

তাই ভারতসহ সবাই আমরা বুভুক্ষের মতো চীনা অবকাঠামো ঋণ ও প্রকল্প নেবো কারো বাধা না মেনে। তবে যাদের সরকার, রাজনীতি বা রাষ্ট্র শক্তপোক্ত হয়ে গেছে, তারা প্রকল্প ও শর্তগুলো ভালো বাছবিচার করতে পারবে। না হলে কিছু কষ্ট স্বীকার করবে, প্রকল্প লাটে উঠবে, চুরি দুর্নীতিতে ভরে যাবে।

সব ঘটনার মূল কারণ তা হলে, আমাদের সীমাহীন অবকাঠামো ঋণ চাহিদা এবং বিনিয়োগ না হওয়া। এই চাহিদা প্রসঙ্গে এডিবির এক স্টাডি বলছে- বিশ্বব্যাংক, এডিবি আর এআইআইবি (চীনের বিশ্বব্যাংক) সবাই মিলে তাদের সব সামর্থ্য ঢেলে অবকাঠামো বিনিয়োগ করলেও তাতে এশিয়ার এই অবকাঠামো বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। ঘাটতি থেকে যাবে। এ ব্যাপারে ভারতসহ আমরা সবাই ‘একই নৌকায়।’ ভারতের যেমন, আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের পড়শি সব রাষ্ট্রেরও একই অবস্থা। ভারতসহ সবাই এক কাতারে যে, চীন আমাদের সবার অবকাঠামো ঋণ চাহিদা পূরণকারী এবং দীর্ঘ দিনের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ না হওয়া খরা-দশায় ঋণদাতা। ফলে ‘আমার বাগানবাড়িতে চীন ঢুকে গেল’ এসব অর্থহীন কথা, মিথ্যা অহঙ্কার ভারতের বন্ধ করা উচিত। এগুলো আমাদের না বোঝার কিছু নেই। আসলে ভারতের উচিত সবার আগে নিজে ‘চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগ’ না নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক । চীন খোদ ভারতের অর্থনীতিতেই ঋণদাতা হয়ে ঢুকে বসে আছে ভারত চীনের এআইআইবির (চীনের বিশ্বব্যাংক) সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। মানে চীন ভারতের বাগানবাড়ি না খোদ মূল বাড়িতে ঢুকে বসে আছে।

চীনের সরকারি ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকারও নজর এড়ায়নি ভারতীয় মিডিয়া প্রসঙ্গটা। গ্লোবাল টাইমসের রিপোর্ট প্রশ্ন তুলেছে ভুটানের নির্বাচনী ইস্যুতে ইন্দ্রানী বাগচীর লেখাসহ ভারতীয় মিডিয়ার হইচই নিয়ে। আর বলেছে, ‘ভারত যেটাকেই উন্নয়নের আদর্শ মডেল মনে করুক, তা যেন সব জায়গায়ই একই থাকে, আর ভারত যেন সেই একই মডেলের পক্ষে থাকে।’ উদাহরণ হিসেবে বলছে, ভুটান পূর্ব-পশ্চিমব্যাপী হাইওয়ে তৈরিতে এডিবির একটা ঋণ পেতে যাচ্ছিল কিন্তু ভারতীয় প্ররোচনায় সেটা বাতিল হলো কেন? ভারত একচেটিয়াভাবে ভুটানের সস্তা জলবিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে; অথচ তৃতীয় দেশে এর বিক্রি বাণিজ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে। কিন্তু কেন?

আইএমএফের রেফারেন্স দিয়ে পত্রিকাটি প্রশ্ন করছে, ‘ভুটান কেন ঋণগ্রস্ত, এত আকণ্ঠে নিমজ্জিত? তার মোট ঋণ জিডিপি-এর চেয়েও বেশি হয়ে গেছে কেন? তাহলে ভুটান নিয়ে চাপাবাজি করছে কে? আর সেটা হয়েছে গত মাত্র ছয় বছরে- ভুটানের ঋণ জিডিপির ৬৭ শতাংশ থেকে ১১৮ শতাংশে উঠে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ভুটানের মোট ঋণের ৬৪ শতাংশ ঋণই হলো ভারতের প্রদত্ত?

আসলে ইন্দ্রানীর ভারত সরকারকে সরাসরি কিছু করার (হস্তক্ষেপের) আহ্বানÑ এটা এক বেপরোয়া কাজ হয়েছে। ইন্দ্রানী তার লেখার শুরুতে ‘হাইলাইট’ শিরোনামে তিনটি পয়েন্ট মানে তিনটি বাক্য লিখেছেন। যার দ্বিতীয় বাক্যে তিনি আক্ষেপ করে লিখছেন, ২০১৩ সালের মতো এবারের ২০১৮ সালে ভুটানের নির্বাচনে ভারত কোনো ইস্যুই হতে পারেনি। তৃতীয় বাক্য হলো, ভুটানে যে দুটো দল প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছে তারা ভারতের সাথে খাতিরের সম্পর্ক গড়ার কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই আমাদের খালি কিছু আশ্বাস শুনিয়েছে।

আসলে ভুটানের এই নির্বাচনের বহু আগে থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে ভুটানিদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল এবং করণীয় নিয়ে খুবই সংগঠিতভাবে আলোচনা ও প্রচার চলেছে। এ নিয়ে ‘ভুটানিজ ফোরাম’ নামে ফেসবুক গ্রুপ ছিল সবচেয়ে সরব। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় তারা একেবারে লো প্রোফাইল। কোনো দলের ক্ষোভ থাকুক আর ভালোবাসাই থাকুক নির্বাচনের মূল তিনটা দল ভুটানে ‘ভারতের তৎপরতা’ সম্পর্কে ছিল একেবারেই নিশ্চুপ। সম্ভবত তাদের ভয় ছিল, এতে ২০১৩ সালের মতো ভারতের কোনো পদক্ষেপ তাদের সাধারণ মানুষকে আরো কষ্টে ফেলে দিতে পারে। তাই তারা ভারতীয় মিডিয়ায় নয়, নিজ ভোটারের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছে, আর ভোটের বাক্সে ভোট দিয়ে আসল কাজটা করেছে; ভারতকে আসল জবাবটা দিয়েছে। বহু পুরনো এক প্রবাদ হলো, কারো ক্ষতি করে সেটা থেকে তোমার লাভ আসবে- সেটা আশা করো না কখনো।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ