২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন - ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। কিন্তু তার বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোনো রিপোর্ট ছাপলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোনো হোম-ওয়ার্ক বা কোনো বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা ধারণা ব্যবহার করছেন। তবে এরকম কোনো রিপোর্ট, তা চেনার কিছু নির্ণায়ক বলে দেয়া যায়। যেমন কোনো রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে- ‘ক্রিকেটার রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত’ অথবা ‘ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী’ অথবা ‘প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান’, ‘সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান’ ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে রিপোর্টারের কাছে একালের কোনো তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। এদের বাক্য শুরু হবে এমন- ‘পাকিস্তানি মনোভাব’, ‘পাকি জেনারেল’, ‘ক্ষমতালোভী জেনারেল’ ইত্যাদি। এদেরও এ কালের কোনো পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে। বাংলাদেশের একাত্তরের হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে আমাদের এই খারাপ অভিজ্ঞতা আছে অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী না করে বরং সব পাকিস্তানি নাগরিককে অভিযুক্ত করতে চায়। এরা হিটলারের মতো বলতে চায়, এই পাকিস্তানি ‘জাতটাই খারাপ’।

রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হলো এরা জাত মানে ইংরাজি রেস অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে- আর এই অভিযোগ তুলে কথা বলে। যেমন পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে দেশের সবাই)- কেন? কারণ তাদের ‘জাতটা’ খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। পিওর বা খাঁটি রক্তের নয় তারা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এটা। আর এই ঘৃণার প্রতীক হলো একটা ছোট শব্দ ‘পাকি’; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি, ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের প্রগতিবাদীদের ওপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক।

তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ান সেখানে ছেয়ে হাজির হয়। ফলে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বোঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

বিস্ময়কর ঘটনা হলো, বিবিসি বাংলার সর্বশেষ রিপোর্ট যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে অবলীলায় এক সাব-হেডিং লিখছে, ‘ইমরান খান আসলে কাদের লোক?’
ওদিকে মিডিয়ার নানা রিপোর্ট লিখছে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেইবা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের কথা রাজনীতি সচেতনদের জানার কথা। সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে কী রিপোর্ট পাঠায়, এগুলো ‘কেবল পাঠানো’ বলা হয়; মানে নকল শব্দে ‘কোডিফাই’ করে পাঠানো রিপোর্ট সেসব। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েবে প্রকাশ করে দিয়েছিল। ফলে যেমন- বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর সময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ রাশিয়া থেকে একটা রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।
গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে প্রকাশ করেছিল। সেটা পড়লে ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হলো এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়।

প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় ব্যতিক্রম ইমরান।

কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে স্টাডি করে দেখেছেনÑ সব জায়গায় ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন।

কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে সাধারণত পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন কারণ উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে আমি পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে প্রমাণ দেখা যায়, আক্ষরিকভাবেই রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, ‘দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন আমি তাই করে দেবো।’

কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভালোÑ এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।
মূল বিষয় হলো, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। বুশের আমেরিকা ৯/১১-এর পরে ওই হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তানজুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর এরই লঞ্চিং প্যাডÑ নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারি বা বিরোধী দলের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিলÑ রাজি না হলে বোমা মেরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন ‘পুরান প্রস্তর যুগের’ কোনো ভূমি। সেটা জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা অসম্ভব ছিল; তা করার চেয়ে, পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে সেই রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

তাহলে প্রথম সার কথাটা হচ্ছে রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। অর্থাৎ পাকিস্তান ‘আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা’ শুরু করেছিল। আর দ্বিতীয় কথাটা হলো, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে ‘আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা’- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে তার সব বক্তৃতা শুরু করত। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভালো কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত দেশে ‘কেবল পাঠিয়ে’ নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, "Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan's only team to win the International Cricket Championship into an effective political party'"। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

কিন্তু তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনো আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি মোশাররফকে বাধ্য করছেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি ‘মাফ করে দেয়ার আপসনামা’ বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (এনআরও), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে- এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে মারে। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ আর সাথে এনআরও অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা- ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও ‘পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায়- এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, তবে তা ভার্চ্যুয়াল। অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো হতো মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হতো টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এ এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর ওপর পাকিস্তানের কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের কার্যকারিতা ছিল না। তবে মোশাররফ তা পাকিস্তানে দেখতে দেবেন কি না, কেবল সেটা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত করে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা রাখা মানে মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা, যার পেছনের মূল কারণ হলো তা কোনো সরকারি নিষেধাজ্ঞাতেও টিভির যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না রাখা। তবে তখন মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালোই। আর এই ‘আপাত মুক্ত টিভির’ সুযোগ নিয়ে ওইসব টিভির সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল- পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তার পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু মোশাররফের সেই এনআরও যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে আদালত অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করে দেন। এতে মোশাররফ জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর মোশাররফের ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত ‘ওয়ার অন টেররে’ দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী আর প্রশ্রয় পাওয়া ‘দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও’ বিরোধী- জনগণের এক নতুন ‘রাজনৈতিক পরিসর’ তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।
ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না অর্থনৈতিক ফ্যাক্টস ফিগারও সাথে হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যুদ্ধের খরচ’ নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের আমেরিকান দায় নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

তিনি আওয়াজ তুললেন, ‘ওয়ার অন টেরর’ ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এ ছাড়া তিনি এক বোমসেলের মতো ফিগার বলা শুরু করেন যে ‘এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার’।
আসলে আমেরিকা এই অর্থটা দেয় কোনো দয়া বা দান করে নয়। এটা দেয় ‘কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)’ নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যবহারের ব্যয়ভার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানসহ সব পার্টনারকে অর্থ দিয়ে থাকে। আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো)। মানে বোঝা যাচ্ছে ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়, তবে ইমরানের হিসাব ২০১২ সাল পর্যন্ত, তাই কম।

সার কথা হলো ইমরানের এবারের বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি এরপর থেকে তার যেকোনো সভায় লাখের ওপর লোক সমাবেশ হতো। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে তিন ট্রিলিয়ন রুপির পাকিস্তানের বাজেটে ২.২ ট্রিলিয়নই দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। ফলে দেশ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। চুরি দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে। এই সঙ্কট প্রথম যাকে আক্রমণ করে তা হলো, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং। এর সোজা প্রভাবে মোট উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। তিনি বলছেন, ওই চার বছরে, ৬০ রুপির ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। এখন ২০১৮ সালে হয়েছে ১২৩ রুপি।

সার কথা হলো, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি তুলনা করে বলছেন, তিনি সারা জীবন বিদেশে কামিয়ে দেশে অর্থ এনেছেন, আর অন্যেরা অর্থ বিদেশে পাচার করে। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের ফারাক, এটাই সেনাবাহিনীকে তার কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে সাহায্য করেছে। কারণ, আমেরিকার যুদ্ধ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে এর ওপর পুরো হতাশ তারা। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হতো, আর ইমরানের অবস্থান তার ওপর সেনাদের আস্থা ও অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। আদালতও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

কিন্তু দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তার বিপক্ষে; ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে সৌদি রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা। আর কিছু অংশ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, কথা হয়েছে।
তবু পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের আশা এটা নতুন এক পাকিস্তান, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ