২৪ অক্টোবর ২০১৮

পাকিস্তানে আরব বসন্তের নতুন মডেল

পাকিস্তনে আরব বসন্তের নতুন মডেল - ছবি : সংগৃহীত

অন্য কারও মধ্যে নিজের অপছন্দের কিছু দেখলেই তাকে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ হুমকি দিতে দেখা যায়- সেই পাকিস্তানে। সেখানে সাধারণ নির্বাচন বা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২৫ জুলাই। একালের বাংলাদেশেও ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ হুমকি ভারতের মতোই সমান হাজির; আর সেটা প্রায় সমান ভারতীয় অর্থে- প্রায় একই ভাষা ও বয়ানে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে হুমকিদাতা যেন বুঝানোর চেষ্টা করে যে ভারত, আমরা তো তোমাদের মতোই। কিন্তু ‘তোমাদের মতোই’ মানে কী? প্রগতিশীল? অবশ্যই না। সেটা এককালে ছিল। তাহলে কি একই রাষ্ট্রনীতির কারণে? সম্ভবত হ্যাঁ। বাংলাদেশের সরকারকে সমর্থন করা ভারত, এ দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি একই। এই দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি এক হোক আর নাই হোক, পাকিস্তান প্রশ্ন এলেই চলতি আমলে আমাদের সরকারের ঝোঁক থাকে এটা দেখানো যে, আমাদের অবস্থান ভারতের মতোই। কিন্তু আবার সেই কথা, ভারতের মতোই মানে কী?

প্রথমেই বলে নেয়া যায় যে, ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ বুলি এটা মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বয়ান। তার চেয়েও বড় কথা এই বয়ান বর্ণবাদিতা বা রেসিজমের। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট আমল অথবা সব আমলের পাকিস্তান সরকারের নীতি পলিসি নয়, বরং পুরো পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীকে ‘তাদের রক্তই খারাপ’ ধরনের হিটলারি বর্ণবাদী যুক্তির বয়ান এটা। এক ভয়ঙ্কর প্রবল ঘৃণা ছড়ানোর কর্মসূচি। তবে অনেকে এতসব জেনে বা না জেনে সহজেই এতে সামিল হয়ে যান, রেসিস্ট উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের শিকার হয়ে পড়েন। ভারতে এই বয়ান প্রবল করেছে বিজেপি-আরএসএসের মোদি সরকার; যদিও এর আগেও এটা কম-বেশি ছিল। ফলে যারা রেসিজমের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চান তাদের এ ব্যাপারে সচেতন হতেই হবে। আমার অপছন্দের কিছু হলেই আমরা কাউকে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ কথা বলতে পারি না। কারণ এটা রেসিজম। বরং পাকিস্তান সরকারের সুনির্র্দিষ্ট সেই নীতি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি সমালোচনা করাই সঙ্গত। অজান্তে প্রগতির নামে হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষক হয়ে যাওয়াটাই কোনো কাজের কথা নয়।

পাকিস্তান- এই শব্দটা দিয়ে এই অঞ্চলে আমরা অনেক কিছু মানে করি। যেমন পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন- এটা সমার্থক। একজন প্রগতিশীল রাইটার আজ লিখছেন, ‘পাকিস্তানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হলো।’ অর্থাৎ তার আগাম অনুমানটা হলো পাকিস্তান মানে তো সেখানে ‘সামরিক অভ্যুত্থান হবারই কথা’, সেটা না হয়ে নির্বাচন হয়েছে। কেন? কারণ, পাকিস্তানের জেনারেলরা নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা ছাড়া থাকতেই পারে না। এখানেও আগাম ধরে নেয়া অনুমানটা হলো, জেনারেলরা যেন খুবই ক্ষমতালোভী, সে কারণেই নিজ ইচ্ছায় তারা অভ্যুত্থান করে থাকেন। এ ধরনের অভ্যুত্থানগুলো বোধহয় পাকিস্তানের বাইরের গ্লোবাল পরিস্থিতির কোনো সংযোগ-ভূমিকা নেই। স্থানীয় জেনারেলরা লোভী বলেই কেবল তারা ক্ষমতা নিয়ে নেন।

এসব অনুমান বাস্তবতা বিবর্জিত ও ভিত্তিহীন। ফ্যাক্টস হলো, পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলগুলো হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায়, নীতি-পলিসিতে। জেনারেলদের নিজের ইচ্ছায় মানে আমেরিকার ইচ্ছা অমান্য করে ক্ষমতা দখল একবারই হয়েছেÑ সেটা ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বেলায়। তাও সেটা বিমানে ভ্রমণরত অবস্থায় মোশাররফকে সেনাপ্রধান থেকে সরানো এবং তার বিমান মাটিতে নামতে না দেয়ার বিরুদ্ধে সেনা সদস্যদের পালটা যৌথ অবস্থান। মূলত তা কারগিল যুদ্ধের দায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের অপ্রয়োজনীয়ভাবে মোশাররফের ওপর চাপানো ও প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের তাতে মৌন সম্মতিতে হাতছুট ঘটনার পরিণতি। তাও এর দু’বছর পরে ২০০১ সালে, টুইনটাওয়ার হামলার পরের দিনই আমেরিকা মোশাররফ সরকারকে মেনে নিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ঘটনাটা হলো, সদ্য স্বাধীন সেকালের পাকিস্তানে ১৯৫১ সালে প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল পাকিস্তানের কমিউনিস্টরাই। ফলে জন্ম থেকেই, ইসলাম-পাকিস্তান-সামরিক ক্যু, এগুলো সব সমার্থক, এ কথা বলে যে প্যারালাল টানা হয় এটাও ভিত্তি পায় না।

আসল কথাটা হলো, কোল্ড ওয়ারের যুগ, মানে ১৯৫০-১৯৯১ সাল। একালে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ সামরিক শাসনে চলেছে; ক্যু হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায় ও নীতিতে। মূলত কমিউনিস্টদের পপুলার প্রভাবে আমেরিকার পক্ষে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সরকার দূরে থাক, নামকাওয়াস্তে কোনো লিবারেল দুর্বল সরকারও টিকিয়ে রাখতে পারেনি সেকালে। ফলে সামরিক ক্ষমতা দখলই ভরসা ছিল আমেরিকার।

কোল্ড ওয়ার মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে (১৯৪৫) কলোনি উত্তর সময়ে কলোনিমুক্ত দেশগুলোকে নিজ বলয়ে নিতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি প্রভাব বিস্তারের লড়াই, তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্র-ব্লকে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে আসার টানাপড়েন- এটাই কোল্ড ওয়ার যুগ-বৈশিষ্ট্য এবং অবশ্যই সেগুলো কমিউনিস্ট ও এন্টি-কমিউনিস্ট মতাদর্শের মধ্যকার লড়াই, এই উছিলায় ঘটেছিল। এতে কে সঠিক ছিল, সেটা যার যার পছন্দের মতাদর্শের ভিত্তিতে আমরা জবাব দেব সন্দেহ নেই আর তাতে আমরা বিভক্ত হয়ে যাবো। ফলে সেদিকে না গিয়ে, বরং সেই সময়ের আমেরিকান নীতি সম্পর্কে চলতি শতকে এসে আমেরিকানদের ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন কী- সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা তুলব। তবে মূল কথা হলো, অনেক হয়েছে আর কত, পাকিস্তানের ঘটনাবলি বুঝতে আমাদের পরিপক্বতা লাগবে। হিন্দু অথবা মুসলমান জাতীয়তাবাদের বাইরেও দুনিয়া আছে। পাকিস্তানের ঘটনাবলির কারণ সেখানেও দেখতে হবে। ফলে দুই জাতীয়তাবাদের কোনো একটার ঘরে বসে অন্যটাকে কোপানো- এগুলোর দিন শেষ করতে হবে। পারস্পরিক ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।

র‌্যান্ড করপোরেশন- এটা আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্কের নাম। বহু পুরানা, বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এর জন্ম। বর্তমানে এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে, যেখান থেকে এর অ্যাকাডেমিক তৎপরতা- স্টাডি, গবেষণার কাজ চলে। স্বভাবতই যার মূল লক্ষ্য হলো, অ্যাকাডেমিক তৎপরতা- স্টাডি, গবেষণার মাধ্যমে আমেরিকান সরকারগুলোকে সম্ভাব্য পলিসি কী হওয়া উচিত, তা ঠিক করে দেয়া। এই অর্থে আমেরিকান রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থ দেখাটাই তার কাজ। তার অনেক কাজের মধ্যে একালে এক প্রভাবশালী কাজ- পপুলারলি এটাকে ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ নামে চেনানো যায়। বড় পরিসর থেকে বললে, ২০০১ সালে টুইনটাওয়ার হামলার পরে বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নীতি ছিল- মুসলমানমাত্রই শক্ত হাতে তাদের ধরো আর মারো। এই নীতি নিষ্ফলা পরাজিত হয় ও অনন্ত সমাপ্তিহীন এক যুদ্ধের ভেতর আমেরিকাকে টেনে নিয়ে যায়। ২০০৬ সালের মধ্যে এটা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের গবেষণা মূল্যায়নে পাওয়া ফল হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। আর এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে আর আগে থেকে চলে আসা র‌্যান্ডের এক গবেষণার ফলাফলে তৈরি নীতি হলো ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’। ওবামা প্রশাসন ২০০৯ সালে ক্ষমতা নিলে এটা নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।

সার কথায় বললে, এটা হলো নির্বিচারে আর মারধর-দমন নয়, ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট করার নীতি। সশস্ত্র ইসলামি ধারাগুলো বাদে বাকি সব ধারার সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়া, রাষ্ট্র-সরকারে তাদের আসতে অংশগ্রহণে সহায়তা, সহযোগিতা করা। এরই প্রথম সবল প্রচেষ্টা ছিল মিসরে মোবারকের পতন ও পপুলার নির্বাচিত এক সরকার সৃষ্টি। আর যেকাজে ব্রাদারহুডের সাথে কাজ করা এটাই ছিল আমেরিকার ইসলামের সাথে এনগেজমেন্টের প্রথম উদ্যোগ। দুঃখজনক হলো এটা ব্যর্থ হয়ে যায় বা কাজ করেনি। না করলেও ওবামা আরো কিছু চেষ্টা করতে রাজি ছিলেন। মূলত ব্রাদারহুড সম্পর্কে সৌদিভীতি, বিশেষত মুরসির ইরান সফর করা থেকে সেই ভীতি আরো প্রবল হওয়া থেকে, এরপর সৌদি উদ্যোগে জেনারেল সিসির আগমন উত্থানে ওবামার নীরব বা উপায়হীন সমর্থকে পরিণত হয়েছিল। ফলে মুরসির পতন ঘটে। মিসর এক্সপেরিমেন্টের এখানেই সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ইজিপ্ট ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর একটা মাত্র। এই প্রজেক্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার সব দেশে তো আছেই, ফলে বাংলাদেশে আছে। এমনকি ইন্ডিয়াতেও আছে। কারণ এটা সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকান ফরেন পলিসির চলমান অন্যতম মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

পাকিস্তানকে যুদ্ধের ময়দান, এক গজব বানিয়ে ফেলার শতভাগ দায় আমেরিকার। সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির সাথে আমেরিকান যুদ্ধের ময়দান হলো পাকিস্তান। পাকিস্তানকে আমেরিকার হয়ে এই ময়দান হতে হবে। নইলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে ‘পুরান প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানো হবে- এটাই ছিল আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজের প্রেসিডেন্ট মোশাররফকে টেলিফোন কথোপকথনে দেয়া পরামর্শ বা হুমকি। মোশাররফের ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইতে এর বিস্তারিত বয়ান আছে। তাই জেনারেলদের সিদ্ধান্তের পাকিস্তানের সব ‘টেররিজম’ ঘটনা ঘটছে- এ কথাগুলো অর্থহীন। তা যাই হোক, আমেরিকান রুটিন পলিসি হিসেবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার রাষ্ট্র বলে পাকিস্তান ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর এক বড় খাতক, এই প্রকল্পের শুরু থেকেই।

আমরা বেশির ভাগই না আরব স্প্রিং পলিসির খবর নেই না পাকিস্তানের। আমাদের কাছে পাকিস্তান মানে হলো ঘৃণা। হিন্দু জাতীয়তাবাদের চোখে দেখা ১৯৪৭ এর দেশভাগ অথবা ১৯৭১ এর গণহত্যা নৃশংসতা। আর এটা আবার জিয়াউল হকের আমলে এসে থেমে যায়। ওদিকে আবার রাশিয়ান জার-সাম্রাজ্য সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজ বিস্তারের প্রকল্প হিসেবে ওই সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করে তা রক্ষা করতে ১৮৮৯ সালে আফগানিস্তানের মাটিতে ব্রিটিশ-জার এ দুই সাম্রাজ্য লড়াই করেছিল। এরই পুনরাবৃত্তি হলো ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল। কারণ ওই ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হওয়াতে এর প্রভাবে সেন্ট্রাল এশিয়া সোভিয়েতের হাত ছাড়া হয়ে যায় কিনা আগাম সেই ভয়ে প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ সমাজতন্ত্রের নামে কলোনিগিরিতে, ইরানের বাফার হিসেবে আফগানিস্তান দখল করেছিল। সেকালে জারের তৎপরতায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভয় পেয়ে বিরুদ্ধে লড়েছিল, একালে সেই একই ভয় পায় পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান যুদ্ধের দায়টা নিয়েছিল আমেরিকার হয়ে, কোল্ড ওয়ারের লড়াই লড়তে। যে যুদ্ধের শেষটা আল-কায়েদা ও তালেবান উত্থান-পতনে, এখনও চলমান।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও তা ভেঙে গেলে এর প্রধান তাৎপর্য হয়ে উঠে যে কোল্ড ওয়ার তাহলে কী হবে। কারণ বাস্তবত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও নাই মানে মাঠে এবং বাস্তবে কোল্ড ওয়ার নাই হয়ে যাওয়া। ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল এবং শেষে নীতিগতভাবে সামরিক ক্ষমতা দখলকে আমেরিকান স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে আর দেখা হবে না, এই নীতি গৃহীত হয়। সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের (১৯৯৩-২০০১) আমল। এই কারণে জেনারেল মোশাররফের ক্যু এই সাময়িক দুর্ঘটনাটা ছাড়া এরপর থেকে পাকিস্তানে আর সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেনি। মূল কারণ আমেরিকান নীতিগতভাবে সামরিক পথে না যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে যারা কিছু হলেই সামরিক ক্ষমতা দখল নিয়ে শঙ্কা তোলেন তারা মুখস্থ বলেন। তারা আমেরিকার পলিসি সম্পর্কে খোঁজ রাখেন তা মনে হয় না।

আমরা বেশির ভাগই একালের পাকিস্তান, নতুন প্রজন্মের পাকিস্তান সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকেবহাল নই। বিশেষ করে আরব স্প্রিংয়ের প্রভাবের পাকিস্তান। ঠিক যেমন বাংলাদেশে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি আমাদের বেসরকারি মেয়েদের স্কুল ভিকারুন্নিসা পর্যন্ত আরব স্প্রিং ছড়িয়ে আছে, আমরা কী জানি! এগুলো চেনার একটা সহজ উপায় হলো, ‘ইয়ুথ’ বা ‘লিডারশিপ’। এসব শব্দে প্রকাশিত কোনো তৎপরতা দেখতে পাওয়া। শিক্ষার্থীদের ক্লাব ধরনের এমন নানা তৎপরতা, যেগুলো যে কোনো অ্যাকাডেমিতে এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি বলা হয় তেমনই ধরনের।
র‌্যান্ডের ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ আসলে আমেরিকার সামরিক ক্যু’র পথে আর না যাওয়ারই আরেক পরিপূরক অবস্থান, আরেক এক্সটেনশন।

তাহলে আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন? এ প্রসঙ্গে র‌্যান্ড রিপোর্টের দেয়া ব্যাখ্যা হলো, তাদের চোখে সমাজতন্ত্র এক এবসার্ড প্রজেক্ট আর এটা এমন এক প্রজেক্ট যার সাথে আমেরিকানদের এনগেজমেন্ট বা কোনো দেয়া-নেয়া, রাষ্ট্র বা সরকারে পাশাপাশি থাকা, দুটো আলাদা দল হিসেবে থাকা, অথবা সরকার বা বিরোধী হিসাবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কমিউনিস্টদের ‘মালিকানা উচ্ছেদ করে দিতে হবে’Ñ এটা মধ্যবিত্ত ও গরিবদের মধ্যে খুবই পপুলার দাবি। অথচ আমেরিকার চোখে এটা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন এবসার্ড দাবি। তবে এবসার্ড হলেও কিন্তু তা পপুলার দাবি বলে এর সামনে আমেরিকা অসহায় এবং উপায়ন্তহীন হয়ে আমেরিকা এশিয়ায় আমাদের মতো দেশে কোনো লিবারেল সরকারও কায়েম করতে পারেনি। এরই পরিণতি হলো সামরিক ক্যু এ কথাগুলো বলা হলো, আমেরিকান নীতি বুঝার জন্য, মেনে নেয়ার কোনো সুপারিশ নয়। অথবা এটাকে সাফাই হিসেবে নেয়ার জন্য নয়। আমেরিকানদের ভালো বা মন্দ কাজের সাফাই দেয়ার দায় আমেরিকার।

তাহলে মূল কথাটা হলো, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়াতে তাই আমেরিকাকে এরপর দেখানো জরুরি হয়ে পড়ল যে, এখন তাহলে রাষ্ট্র গঠনে, রাষ্ট্রীয় কনস্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো গড়া, অধিকার সম্পর্কে মাস লেভেলে সচেতনতা তৈরি ইত্যাদি নিয়ে আমেরিকার এগিয়ে আসা উচিত। এই যুক্তি থেকেই তা মূলত ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’। তবে এর মাঝে টুইনটাওয়ার হামলার কারণে মূল প্রজেক্টকে মুসলমান জনসংখ্যার জন্য বিশেষ মাত্রা দেয়া হয়েছিল যাতে তা ‘ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্টের ইচ্ছার’ প্রকাশ হয়ে হাজির হয়।
এই প্রজেক্ট মূলত এটা তরুণদের মধ্যে বেশি কাজ করে, টার্গেট করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক তৎপরতা দিয়ে, পপুলারও হতে চায়। এটা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র, কনস্টিটিউশন, প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে এবং সমাজকে নেতৃত্ব দেয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির প্রকল্প।

পাকিস্তানে এই প্রকল্প তৎপরতা ব্যাপক; খুব সম্ভবত ২০১০ সাল থেকে। ইমরান খানের দলের নাম পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ, সংক্ষেপে পিটিআই। যদিও পিটিআইয়ের জন্ম আরব স্প্রিংয়েরও বহু আগে থেকে। আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতা ধীরে ধীরে জমে ওঠার পর গত ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে দিয়ে সমাজে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইমরান খানের সাথেই তাদের বুঝাপড়া ও এক সাথে কাজ করার ঐক্য হয়েছিল। এমনিতে আরব স্প্রিংয়ের প্রকল্পগুলো মাঠে হাজির থাকে এনজিও প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা হিসেবে। তবে বাইরে আমরা দেখি কেবল তাদের সুবিধালাভ যারা যারা করে এমন শিক্ষার্থীদেরকেই। আমেরিকান প্রায় ৯টি এনজিও প্রতিষ্ঠান সাধারণত এ কাজে জড়িত থাকে। ফলে তারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করতে পারে না, করেও না। তবে তাদের তৎপরতা থেকে সুবিধা লাভ করা স্থানীয় জনগণ নিজেরা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করতে পারে।

গত বিশ বছরে তরুণ পাকিস্তানিরা, পাকিস্তানের পরিচিতি অনেক বদলে দিয়েছে। এরা মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। ইমরানের দলের গত পাঁচ বছরের তৎপরতায় মনে করার কারণ আছে যে, এসব তরুণ নেতৃত্বেও কিছু যোগ্যতা অর্জন করেছে। পাকিস্তান সমাজের এই অংশটার কথাই বাইরের আমরা খুবই কম জানি বলে আমাদের পরিচিত পাকিস্তান যেটা ছিল সেটা মূলত সত্তরের দশকের; সেটা দিয়েই একালের পাকিস্তানকে বুঝতে চাই। নিরন্তর যুদ্ধ, রিফুইজি, অস্ত্র আর ইসলামের হরেক বয়ান- ইত্যাদি এসবের পালটা এসব কিছুতে ত্যক্তবিরক্ত তরুণেরা এক ব্যাপক মডার্নাইজেশনের ভেতর দিয়ে পার হয়েছে। যার প্রধান উপায় হিসেবে কাজ করেছে এনজিও তৎপরতা।

এরা নিঃসন্দেহে একেবারেই নতুন প্রজন্ম, নতুন তাদের অভিজ্ঞতা। তাদের তৎপরতার প্রথম ফলাফল দেখার সময় সম্ভবত এই নির্বাচন।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে পিটিআই সবার চেয়ে এগিয়ে। এর পেছনের একটা বড় কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ পরিবারসহ তার অর্থ পাচারের দুর্নীতির মামলার রাজনৈতিক তৎপরতা করার অযোগ্য ঘোষিত হয়ে যাওয়া, এর নৈতিক প্রভাব। মনে হচ্ছে পিটিআই অথবা তাদের নেতৃত্বের এক জোট, সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com


আরো সংবাদ