১৭ নভেম্বর ২০১৮

নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল

নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল - ছবি : নয়া দিগন্ত

তার নাম ব্রহ্মম চেলান। রাষ্ট্র পরিচালনের নীতি পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির এক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ’Ñ চালান তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথা তিনি আমাদের জানান দেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন এ কাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে এই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। যদিও তার অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারো সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমন সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি, তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন?

তার সাম্প্রতিক লেখা কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়, সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে যাওয়ায় আপসোস করেছেন। কেন এ সময়ে লিখলেন সে আপসোসের পটভূমিটা হলো, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার যোগ-সুযোগ না থাকায় এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে যে অর্থনৈতিক অসুবিধা- সেটাকে ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে পুরো উসুলি নিয়েছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে বাইরে কোনো দেশে সড়ক পথেও যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর এর ফায়দা তুলেছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা একচেটিয়াভাবে। অনেকটা নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ ভারতের সুযোগ আর ভারতে আমাদেরটাতে আমাদের সুযোগ তো আছেইÑ এই নীতিতে। যেমন এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে যেমন বাংলাদেশে বিক্রি করতে পারে না। অথচ ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে যেমন ভারতের কেন্দ্র দিল্লি বা কলকাতা থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে আর কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতি নেয় না। নেপালের সেই অসহায় ভারতের কাছে, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অন্তত আর ভারতের একটা বিকল্প হিসেবে চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহার শর্তহীন ট্রানজিট সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে।

এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে ট্রানজিট চুক্তি চূড়ান্ত হবে। ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল হলো চীনের তিব্বতের উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন নেপালের চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রহ্মম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিগি¦দিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র নয়, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হলো, একালের একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে!

শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন তা হলো, এরা কমিউনিস্ট। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলটাসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপরটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আবার, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের ক্ষমতাসীন জোট সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। আর তাই তিনি মনে করছেন, ‘এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে।’ চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব...।

সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধ। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট [ঃড় ধ ংরমহরভরপধহঃ বীঃবহঃ, ঃযরং রং ধ ংবষভ-পৎবধঃবফ ঢ়ৎড়নষবস]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, আর বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্মম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, ‘ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে।’

অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। এরপর তিনি এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হলো, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হওয়া। দ্বিতীয়টা, দাহালের দল মাওবাদীরা আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল ছিল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হলো, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন দেয়ার পরে তাদের বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল এটা মাধেসিদের বাধা। এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হওয়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়, তাদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসের বিরোধগুলোর মীমাংসা কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্মম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

তাহলে ঘটনা হলো, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে ঘটনাটা হলো, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। শকুন শকুনই হয়ে থাকে।
ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’ এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। আর বলেন, ‘২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে।’ আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকার কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

ভারতের নিজের স্বার্থ দেখা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাডেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্মম চেলানি, বেছে নিলেন! আসলে একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা এই ধারা শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিতÑ এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ। আর তাই ১৯৫০ সালে নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত বন্ধ্ত্বু চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়ার আর অন্যায্য হয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং কোনো প্রভাব পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় চুক্তিতে ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করেন।
আর আজকের ব্রহ্মম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি নেপালি অংশের অপর নাম নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল।

না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। ঠিক যেমন ইউরোপের সারা দুনিয়াকে কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধেই ১৯৪০-এর দশকে আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করতে। কিন্তু তাতে আমেরিকা স্বার্থহীন ছিল না। আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা- নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়া হবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্মম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি তা ঠেকানো যাবে না। ব্রহ্মম চেলানির চোখে ধরা পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন বড়ই মহান তা মোটেও বলকা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হলো, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।
আর চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে। ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে গোনার ধরার মধ্যে জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। সে ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিয়ে আমেরিকা নিশ্চিত অবসান যতদূর পারা যায় দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে কেবল।

তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।
তাই ব্রহ্মম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন। তবে নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন- বটম লাইন হলো নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এই নতুন নেপাল, মুক্ত নেপাল। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com


আরো সংবাদ