মেসুত ওজিলকে মনে আছে? অবশ্য তাকে ভুলবেন কী করে। সৃষ্টিশীল পায়ে যে সব কীর্তি গড়েছেন তিনি, তাতেই ইতিহাসে চির অম্লান থেকে যাবে তার নাম। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা প্লে-মেকার হিসেবে তার নাম আজও শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়।
কিন্তু যতটা আলোয় ভরা ছিল তার ক্যারিয়ার, শেষ অধ্যায়টি ছিল ততটাই অন্ধকার। প্রায় এক যুগ জার্মানির জার্সি গায়ে বিশ্ব ফুটবল শাসন করা এই ফুটবলারকে মাত্র ২৯ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ফুটবল ছেড়ে দিতে হয়।
আলো ঝলমলে তার ক্যারিয়ারের সমাপ্তি হয় বিতর্ক, অপমান ও অসংখ্য প্রশ্নের মধ্য দিয়ে। সহজ করে বললে শেষটা হয়েছে ‘নোংরা’ রাজনীতির শিকার হয়ে। আধুনিকতার জয় গান গাওয়া জার্মানির বর্ণবাদী-বৈষম্যের কবলে পড়ে।
জার্মান ফুটবল নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে খলনায়ক বানায় মেসুত ওজিলকে। তাকে বিদায় করে দশের বোঝা মাথায় নিয়ে। যেখানে তারা গুটির চাল বানায় ওজিলের ধর্মের প্রতি দুর্বলতাকে। মুসলিম হওয়াটাই যেন ওজিলের অপরাধ!
ঘটনাটা গত ২০১৮ বিশ্বকাপের। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে মাথা নিচু করে রাশিয়া ছাড়তে হয় জার্মান দলকে। আগের আসরের চ্যাম্পিয়নরা উঠতে পারেনি শেষ ষোলতেও, বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকেই।
এমন বাজে পারফরম্যান্সের প্রতিক্রিয়ায় আগুন জ্বলে উঠে সমর্থকদের মনে, রাস্তায় নেমে আসে তারা। বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা এক হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে জার্মান ফুটবলের বিপক্ষে। ফলে তখন দায় এড়াতে এই লজ্জাজনক চাল চালে জার্মান ফুটবল।
রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে জার্মানির বিদায়ের পর সব দোষ এসে পরে ওজিলের ঘাড়ে। জার্মান সমর্থক থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ সবাই প্রকাশ্যে ওজিলকে এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী করতে থাকেন।
তারা আঘাত করতে থাকেন ওজিলের ধর্মীয় অনুভূতিতে, আক্রমণ করে তার পিতৃ পরিচয় লক্ষ্য করে। এমনকি শরনার্থী ও বেইমানও বলা হয় তাকে। যে অপমান সহ্য করতে পারেননি ওজিল। টুইটারেই হঠাৎ ঘোষণা দেন অবসরের।
সেই সাথে উগড়ে দেন, তার ভেতরের ক্ষোভ, দুঃখ, অপমানের জ্বালা। সেই সাথে জার্মানের হয়ে তার আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা আর কীর্তির কথা তুলে ধরেন। বলেন, ‘আমি জন্মের পর থেকেই একটা দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছি। আমি ট্যাক্স দেই জার্মানিতে। আমার চ্যারিটেবল ট্রাস্টের কাজ হয় জার্মানিতে। কিন্তু তার পরেও জার্মানি আমাকে আপন করে নিতে পারল না। কারণ আমি মুসলিম বলে।’
মুসলিম হওয়ায় তার প্রতি এমন বিদ্বেষমূলক আচরণ- দাবি করে ওজিল বলেন, ‘যখন আমি দেশের হয়ে জিতেছি তখন আমাকে বলা হয়েছে জার্মান। কিন্তু যখন হেরেছি তখন বলা হয়েছে আমি অভিবাসী।’
তিনি বলেন, ‘এই দেশের জন্য আমি আমার সবটা নিংড়ে দিয়েছি। দলের ব্যর্থতার যন্ত্রণা বাকিদের মতো আমার কাছেও এক। কিন্তু আমাকেই সব দায় নিতে হলো। এত অপমান সহ্য করে আর জার্মানির জার্সি আমি পড়তে পারব না।’
আর সেই টুইটেই জার্মান ফুটবলের সাথে সম্পর্ক শেষ হয় ওজিলের। সম্পর্কচ্ছেদ হলেও জার্মানির জার্সি যে সব কীর্তি গড়েছেন ওজিল, তা কি মুছে দিতে পারবে ইতিহাস থেকে?
২০১৪ বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন জার্মান দলের মাঝমাঠের ভরসা। বিশ্বকাপও এনে দেন দেশকে। জার্মানির পাঁচ-পাঁচবারের বর্ষসেরা ফুটবলারের কীর্তি আছে ওজিলের। এমনকি ২০১০ বিশ্বকাপে ম্যান অফ টুর্নামেন্টের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।
এবার আসা যাক জার্মানির ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের অধ্যায়ে। ওজিলের বিদায়ের পর কি বদলেছে তাদের গল্প? উত্তরটা পরিসংখ্যানই দিচ্ছে।
ওজিল জার্মানির হয়ে যে তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন- ২০১০, ২০১৪ ও ২০১৮। সেই তিন আসরে জার্মানি মোট ১২টি ম্যাচে জয় পায়, একটি ম্যাচ ড্র করে। এর মাঝেই একবার বিশ্বকাপ শিরোপাও জেতে, আর একবার তৃতীয় স্থানে উঠে।
অন্যদিকে ওজিলের অবসরের পর অনুষ্ঠিত দুই বিশ্বকাপ ২০২২ ও ২০২৬- মিলিয়ে জার্মানির জয় মাত্র ৩টি।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয়বার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর এবার ২০২৬ বিশ্বকাপেও আশার আলো খুব বেশি দেখা যায়নি।
নকআউট পর্বে উঠলেও রাউন্ড অব ৩২-এ প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে জার্মানিকে। অর্থাৎ ওজিলের বিদায়ের পর টানা দুটি বিশ্বকাপেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি জার্মান ফুটবল।
অবশ্য ফুটবল কখনোই একজন খেলোয়াড়ের খেলা নয়। একটি দলের সাফল্য বা ব্যর্থতার দায় একজনের কাঁধে চাপানো যায় না।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, যে খেলোয়াড়কে ২০১৮ সালের ব্যর্থতার অন্যতম মুখ বানানো হয়েছিল, তার বিদায়ের পরও কেন জার্মানির বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স আরো নিম্নমুখী হলো?
সময়ের সাথে সাথে ট্রফিতে হয়তো ধুলো জমে, পরিসংখ্যান বদলে যায়, নতুন নায়ক আসে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন কখনো পুরোনো হয় না। মেসুত ওজিলও ঠিক তেমনই একটি প্রশ্ন। যার উত্তর হয়তো এখনো খুঁজে ফিরছে জার্মান ফুটবল।
কথায় আছে না, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আদালত- সময়। সেই সময়ই একদিন জার্মানিকে উপলব্ধি করাবে ওজিল কে ছিলেন, কী ছিলেন। হয়তো এখনি অনেকে উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন।
জার্মান ফুটবল তাকে খলনায়ক বানাতে চাইলেও তিনি নায়ক হয়েই আছেন। কেননা মাঠের বাহিরেও মেসুত ওজিল ছিলেন আরেক রকমের নায়ক।
২০১৪ বিশ্বকাপ জয়ের বোনাসের পুরো অর্থ তিনি দান করেছিলেন অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসায়। গাজা, ব্রাজিল, সিরিয়া, সোমালিয়া, রোহিঙ্গা শরণার্থী- মানুষের কষ্ট যেখানে, সেখানেই পৌঁছেছে তার সহায়তার হাত।
নিজের বিয়ের আনন্দও ভাগ করে নিয়েছিলেন শরণার্থী শিবিরের এক লাখ মানুষের সাথে। সব মিলিয়ে ওজিল এখনো জায়গা নিয়ে আছেন সবার মনে, তবে জার্মান ফুটবল এখনো নিজেদের খুঁজেই ফিরছে।



