ডালাসে শেষ বাঁশিতে শেষ হলো এক মহাকাব্য, থামলেন রোনালদো

স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দুই দশকের বিশ্বকাপ অধ্যায়। বিশ্বকাপ ট্রফি না জিতলেও রেকর্ড, অর্জন ও অনুপ্রেরণার উত্তরাধিকার রেখে বিদায় নিলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই কিংবদন্তি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো |সংগৃহীত

ডালাসের রাতটা ছিল অন্যরকম। শেষ বাঁশি বাজতেই কেউ উল্লাসে মেতে উঠল, কেউ চোখের জল লুকাল। আর একজন দাঁড়িয়ে রইলেন নিঃশব্দে। স্কোরবোর্ডের আড়ালে শেষ হয়ে গেল বিশ্ব ফুটবলে ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’ অধ্যায়।

একদিন না একদিন পর্দা নামবেই- এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু কিছু পর্দা নামার দৃশ্য এতটাই ভারী হয় যে, তাতে একটি যুগেরও অবসান হয়ে ওঠে। থমকে যায় সময়। ডালাসের এই রাতটি ছিল ঠিক তেমনই।

বিশ্বকাপে আর কখনো দেখা যাবে না রোনালদোকে। আর কখনো কোনো বিশ্বমঞ্চে সমর্থকেরা অপেক্ষায় থাকবেন না তার ‘সিউউ’ উদযাপনের জন্যে। সবকিছু থেমে গেছে গতরাতে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে।

স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। এর মধ্য দিয়েই শেষ হলো বিশ্বকাপে পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী রোনালদোর দুই দশকের দীর্ঘ পথচলা। যে যাত্রায় ছিল অসংখ্য রেকর্ড, ছিল অমর কিছু মুহূর্ত, কিন্তু ছিল না কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি।

ম্যাচের আগে তিনি নিজেই বলে দিয়েছিলেন, এটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। তাই স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াই ছিল শুধু একটি নকআউট ম্যাচ নয়, ছিল দুই দশকের এক যাত্রার শেষ অধ্যায়। ৯০ মিনিট ধরে লড়লেন, চেষ্টা করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্য আর তার পক্ষে কথা বলেনি।

যোগ করা সময়ে মিকেল মেরিনোর একমাত্র গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় স্পেন। আর বিশ্বকাপের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় রোনালদোর জন্য।

২০০৬ সালের জার্মানিতে শুরু হয়েছিল সেই পথচলা। তখন তিনি ছিলেন সম্ভাবনাময় এক তরুণ। ২০২৬ সালে এসে তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল এক কিংবদন্তি। এই দীর্ঘ সময়ে ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি- যা বিশ্ব ফুটবলে বিরল এক অর্জন।

প্রতিটি বিশ্বকাপেই গোল করার কীর্তি গড়ে নিজের নাম লিখেছেন ইতিহাসের পাতায়। তবু একটি অপূর্ণতা কখনো তাকে ছেড়ে যায়নি। সেটি বিশ্বকাপ ট্রফি। ২০০৬ সালে সেমিফাইনালে ওঠাই ছিল তার সেরা সাফল্য।

এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ কিংবা ২০২৬- কোনো আসরেই সোনালি ট্রফির এতটা কাছে পৌঁছাতে পারেননি তিনি। প্রতিবারই নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন, আর প্রতিবারই ফিরে যেতে হয়েছে অপূর্ণতা নিয়েই।

স্পেনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটিও ছিল প্রতীকী। প্রথমার্ধে উনাই সিমনকে পরীক্ষা নেয়া একটি শট ছাড়া খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। বয়সের ছাপ হয়তো গতিকে কমিয়ে দিয়েছে, কিন্তু জয়ের ক্ষুধা একটুও কমেনি। শেষ বাঁশির পর তার চোখে ছিল নীরবতা, মুখে ছিল ক্লান্তির রেখা। যেন বুঝে গিয়েছিলেন, এই মঞ্চে আর কখনো ফেরা হবে না।

তবু বিদায়ের মুহূর্তেও আক্ষেপকে নিজের পরিচয় বানাতে চাননি রোনালদো। ম্যাচ শেষে তিনি বললেন, ’আমি পরিষ্কার বিবেক নিয়েই বিদায় নিচ্ছি। দেশের জন্য যা করার, তার সবটাই করেছি।’

এরপর মনে করিয়ে দিলেন, ২০১৬ সালে পর্তুগালকে ইউরো চ্যাম্পিয়ন করার স্মৃতি তার কাছে বিশ্বকাপ জয়ের সমান মূল্যবান।

পরিসংখ্যান বলবে, তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা। বলবে, সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের একজন। বলবে, ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা এবং ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলার।

কিন্তু সংখ্যার বাইরেও রোনালদোর গল্প আছে। অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলা, অবিরাম পরিশ্রম, হার না মানা মানসিকতা আর কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠার গল্প। বিশ্বকাপ ট্রফি? সেটা তো বিলাসীতা মাত্র। ক’জনের ভাগ্যে জুটে এই স্বীকৃতি!

ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তির ক্যারিয়ার বিশ্বকাপ ট্রফি ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবু তাদের মহত্ত্ব কখনো ট্রফির সংখ্যায় মাপা হয়নি। রোনালদোও সেই কাতারেরই একজন। কারণ কিছু খেলোয়াড়ের পরিচয় গড়ে ওঠে না শুধু শিরোপায়, গড়ে ওঠে তারা একটি প্রজন্মকে কী স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কত মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন- সেই উত্তরাধিকার দিয়ে।

কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু কিছু কিংবদন্তিরা অপূর্ণ হয়েও পূর্ণতা পায়। রোনালদোর গল্প ঠিক তেমনই। বিশ্বকাপ ট্রফি হয়তো তিনি জিততে পারেননি, কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে যে জায়গা তিনি তৈরি করেছেন।