আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এখন আর শুধু বিশাল সৈন্যদল বা ভারী সাঁজোয়া যান দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনা যায় না—বিষয়টি বিশ্বজুড়ে দারুণভাবে প্রমাণিত। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের চলমান বর্বরতা ও নৃশংস আগ্রাসনের দিকে তাকালে দেখা যায়, কীভাবে দখলদার বাহিনী অত্যাধুনিক বিমান হামলার আড়ালে নির্বিচারে রক্তপাত ঘটাচ্ছে। তবে এই অসম ও পাশবিক বলপ্রয়োগের বিপরীতে আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নিজস্ব সক্ষমতার কোনো বিকল্প নেই। ঠিক এই জায়গায় বিশ্বমঞ্চে তুরস্কের অবস্থান আজ বেশ ঈর্ষণীয়। দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষায় ড্রোন প্রস্তুতকারক জায়ান্ট ‘বায়কার’ অর্থ ‘পতাকাবাহী’ —যে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখছে, তার অকপটে প্রশংসা করেছে তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
তুরস্কের দৈনিক সাবাহ শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এতে জানানো হয়, ড্রোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বায়কার কেবল তাদের আকাশসীমাকে শক্তিশালী করেনি, বরং বিশ্ব প্রতিরক্ষা বাজারে গেম-চেঞ্জার হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছে। আঙ্কারার প্রতিরক্ষাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি আধুনিক সব ড্রোন।
ইস্তাম্বুলের বায়কারের 'ওজদেমির বায়রাকতার ন্যাশনাল টেকনোলজি সেন্টারে' আয়োজিত মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র জেকি আক্তুরক বলেন, "উচ্চ প্রকৌশল ক্ষমতা, শক্তিশালী গবেষণা ও উন্নয়ন অবকাঠামো এবং উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বায়কার এমন সব সমাধান তৈরি করছে, যা যুদ্ধের ময়দানে পুরো হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয়।"
রপ্তানির বিশ্ব রেকর্ড ও দূরদর্শী উদ্ভাবন
তুর্কি সশস্ত্র বাহিনীর নজরদারি, বুদ্ধিমত্তা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বায়কার অভাবনীয় অবদান রাখছে। মুখপাত্র জেকি আক্তুরক জানান, বায়রাকতার টিবি২ (অর্থ: পতাকাবাহী), আকিনজি (অর্থ: অশ্বারোহী দ্রুতগামী সীমান্ত যোদ্ধা বা রেইডার), কিজিলএলমা ( তুর্কি রূপকথার কাঙ্ক্ষিত ও অধরা লক্ষ্য 'লাল আপেল') যুদ্ধবিমান, কেমানকেশ (অর্থ: উসমানীয় যুগের ওস্তাদ তীরন্দাজ) মিনি স্মার্ট ক্রুজ মিসাইল এবং কে২ কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোনের মতো প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। দেশীয় সম্পদে গড়া এসব প্রযুক্তি তুর্কি সামরিক বাহিনীকে প্রতিপক্ষের কাছে এক আতঙ্কের নামে পরিণত করেছে।
ব্যবসা ও অর্থনীতির বিচারেও বায়কার এক রূপকথার গল্প। ২০২১ সালে যেখানে তাদের রপ্তানি ছিল ৬৬৪ মিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা লাফিয়ে দাঁড়ায় ১.২ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ধারাবাহিকভাবে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করার পর, ২০২৫ সালে তা সর্বকালের রেকর্ড ২.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়!
সামরিক শক্তির সার্বিক সম্প্রসারণ ও নতুন জোট
ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, তুর্কি স্থলবাহিনীর জন্য তুরস্কের শীর্ষ সামরিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রোকেটসানের তৈরি একটি গাইডেড মিসাইল ওমতাস সাঁজোয়া বিধ্বংসী যান এবং কারিনালি বোট সিস্টেমের পরিদর্শন ও ছাড়পত্র প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হয়েছে। এছাড়া সামরিক শক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে তুরস্ক। সম্প্রতি বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় অনুষ্ঠিত বালকান শিল্ড ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফেয়ারে মিসরের সামরিক উৎপাদন মন্ত্রণালয়ের সাথে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এমকেইর একটি সমঝতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিস্ফোরক তৈরিসহ বিভিন্ন খাতে যৌথ উৎপাদনের নতুন পথ উন্মোচিত হলো।
অন্যদিকে, তুরস্কের জাতীয় যুদ্ধজাহাজ প্রকল্প মিলগেম ৬ থেকে ১২ জাহাজ সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দ্বিতীয় আই-ক্লাস ফ্রিগেট ইজমিরের সমুদ্র পরীক্ষা গত ৩১ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে। সামরিক নৌজাহাজ বা ফ্রিগেটের নাম নদীর নাম বা বিখ্যাত ঐতিহাসিক শহরের নাম অনুসারে রাখা একটি বৈশ্বিক রীতি। মিলগেম প্রকল্পের আওতায় নির্মিত আই-ক্লাস ফ্রিগেট সিরিজের দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজটির নাম তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী সমুদ্রবন্দর নগরী ইজমিরের নামানুসারে রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিরক্ষা ও বিমান প্রযুক্তির লক্ষ্যে বায়কারের কর্মীদের এই নিরলস আত্মত্যাগ তুর্কি প্রতিরক্ষাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।



