পম্পেইর ছাই আর পৃথিবীর পেটের গুপ্তধন

সেই ধ্বংসের গল্প আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু প্রকৃতির যে রূপ এত ভয়ঙ্কর, তার ভেতরেই কি লুকিয়ে থাকে জীবনের নতুন রসদ? বিজ্ঞানের উত্তর হলো—হ্যাঁ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
আগ্নেয়গিরি হতে পারে বিরল ধাতুর সমৃদ্ধ উৎস
আগ্নেয়গিরি হতে পারে বিরল ধাতুর সমৃদ্ধ উৎস |সংগৃহীত

দুই হাজার বছর আগের কথা।

ইতালির নেপলস উপসাগরের কোলেই শান্ত সুন্দর এক শহর ছিল, নাম তার পম্পেই। রোমান ধনকুবের আর সাধারণ মানুষের কোলাহলে গমগম করত পুরো শহর। কিন্তু কারও জানা ছিল না, পেছনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল সুবিশাল ভিসুভিয়াস পর্বত। তবে ওটা শান্ত কোনো পাহাড় নয়। ওটা আসলে এক ঘুমন্ত দানব।

খ্রিস্টাব্দ ৭৯ সালের এক সকালে হঠাৎ কেঁপে উঠল চারপাশ। বিকট শব্দে ফেটে পড়ল ভিসুভিয়াসের চূড়া। আকাশ ঢেকে গেল ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাসে। তারপর নামল গরম ছাই আর ফুটন্ত লাভার বৃষ্টি। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জীবন্ত পম্পেই শহরটা হারিয়ে গেল মাটির নিচে। স্তব্ধ হয়ে গেল হাজার হাজার মানুষের জীবন।

সেই ধ্বংসের গল্প আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু প্রকৃতির যে রূপ এত ভয়ঙ্কর, তার ভেতরেই কি লুকিয়ে থাকে জীবনের নতুন রসদ?

বিজ্ঞানের উত্তর হলো—হ্যাঁ।

বিজ্ঞানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'সায়েন্স অ্যালার্ট' (২৫ আগস্ট) আমাদের জানাচ্ছে এক নতুন খবর। যে আগ্নেয়গিরি একদিন আস্ত শহর উড়িয়ে দিয়েছিল, মাটির নিচে জমা রাখা তরল সোনা দিয়ে সে-ই নাকি গড়তে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ!

প্রকৃতির নিয়মটাই অদ্ভুত। আগ্নেয়গিরি যখন ক্ষোভে ফুসে ওঠে, তখন শুধু ধ্বংসই আনে না। বরং মাটির গভীর থেকে টেনে আনে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ধাতুর ভাণ্ডার। গলিত ম্যাগমা বা লাভার সাথে বুদবুদ তুলে ওপরে উঠে আসে তামা, দস্তা আর সিসার মতো প্রয়োজনীয় নানা খনিজ পদার্থ।

আমরা প্রতিদিন যে ব্যাটারি বা কম্পিউটার ব্যবহার করি, কিংবা পরিবেশ বাঁচাতে যেসব আধুনিক প্রযুক্তি তৈরি করছি, তার জন্য এসব খনিজ ধাতু কিন্তু খুবই দরকার। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানের ধারণা ছিল, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পুরানো আগ্নেয়গিরির ধ্বংসাবশেষ থেকেই কেবল এসব ধাতু পাওয়া সম্ভব।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবার চোখ ফিরিয়েছেন ঘুম ভাঙা জ্যান্ত আগ্নেয়গিরিগুলোর দিকে।

যুক্তরাজ্যের নামকরা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সম্প্রতি ক্যারিবীয় সাগরের এক জলন্ত আগ্নেয়গিরির গভীরে নজর দিয়েছেন। নাম তার 'সুফ্রিয়ের পাহাড়'। তারা দেখে চমকে গেছেন, পাহাড়টার তলদেশে একেবারে গভীরে জমে উঠছে ধাতুভরা তরলের এক বিশাল আধার। যেন নতুন এক খনির জন্ম হচ্ছে মাটির পেটে!

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে 'জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স' নামক বিখ্যাত সাময়িকীতে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, মাটির নিচে কোথায় কী আছে, তা জানার জন্য বিজ্ঞানীদের একটুও খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়নি। তারা সাহায্য নিয়েছেন ভূমিকম্পের!

বিজ্ঞানের এই জাদুটাও বেশ অবাক করার মতো। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ওই এলাকায় যত ছোট-বড় ভূমিকম্প হয়েছিল, সেগুলোর তরঙ্গের গতিপথ হিসাব করা হলো। মাটির ভেতরের পাথর, তরল আর গলিত লাভার ভেতর দিয়ে ভূ-কম্পনের তরঙ্গ একেক গতিতে ছোটে।

২৩টি মনিটরিং স্টেশন থেকে পাওয়া সেই তরঙ্গের হিসাব কষে তারা একটি নিখুঁত ৩ডি মানচিত্র বা ডিজিটাল ছবি বানিয়ে ফেললেন।

আর তাতেই দেখা গেল অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য!

ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে জমে আছে অতি-উত্তপ্ত, তীব্র লবণাক্ত এবং ধাতুতে ঠাসা এক তরল ভাণ্ডার। এলাকাটি চওড়ায় প্রায় দেড় কিলোমিটার। অতীতে সুফ্রিয়ের পাহাড় থেকে যে অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল, এই তরলই ছিল তার জ্বালানি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাটি থেকে শত শত ফুট উঁচুতে রোবট পাঠিয়ে বা ড্রিল মেশিন দিয়ে বিপজ্জনক ফুটন্ত পাহাড় খোঁড়ার ঝুঁকি এখন আর নিতে হবে না। ভূ-কম্পনের মানচিত্র দেখেই তারা বলে দিতে পারবেন, আগ্নেয়গিরির পেটের ঠিক কোথায় ধাতু বা শক্তির ভাণ্ডার জমে আছে।

ভিসুভিয়াস যেদিন পম্পেই শহরকে ছাইয়ে ঢেকে দিয়েছিল, মানুষ ভেবেছিল আগ্নেয়গিরি শুধুই অভিশাপ। প্রকৃতি যে এক হাতে কেড়ে নিয়ে অন্য হাতে পৃথিবীর গভীর কোণে নতুন শক্তির জন্ম দেয়, তা মানুষ শত শত বছর পর আজ বুঝতে পারছে। তাইতো প্রকৃতির প্রলয় হয়ে উঠতে পারে 'সৃষ্টি সুখের উল্লাস!'

পম্পেইর সেই ছাই চাপা ইতিহাসের আড়াল থেকে বের হয়ে আসা আজকের এই আবিষ্কার আমাদের নতুন এক দিনের আশা দেখাচ্ছে। ঘুমন্ত আর জ্যান্ত আগ্নেয়গিরি নামের এ দানবগুলোর পেটের ভেতরের গুপ্তধনই হয়তো আগামী দিনের আধুনিক পৃথিবীর নতুন পথ দেখাবে।