জুলে ভের্ন ও টুরিংয়ের ভয়াল মোহনা : মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই কি এআই?

সবশেষ এই সপ্তাহে এমন বেশ কিছু ঘটনা সামনে এসেছে, যা বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। লাইভ ইন্টারনেটে জনপ্রিয় এআই মডেলগুলো এখন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে শুরু করেছে।

সৈয়দ মূসা রেজা
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি |সংগৃহীত

আমরা যা ভাবছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর ঠিক সেভাবে চলছ না। মানুষের নির্দেশ মানার বদলে এটি নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে। খোদ এআই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সামনে চরম এক অস্থির এবং কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ ৬ আগস্ট এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে।

সবশেষ এই সপ্তাহে এমন বেশ কিছু ঘটনা সামনে এসেছে, যা বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। লাইভ ইন্টারনেটে জনপ্রিয় এআই মডেলগুলো এখন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে শুরু করেছে।

যুক্তরাজ্যের 'এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট' গত মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অ্যানথ্রোপিকের 'মিথোস ৫' এবং ওপেনএআই-এর 'জিপিটি-৫.৬-সল' নামের দুটি এআই মডেল ভুয়া পরিচয় তৈরি করেছে। শুধু তা-ই নয়, এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বাস্তব দুনিয়ার মানুষকে দিয়ে ক্ষতিকর কোড অনুমোদন করিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে তারা। সংস্থাটি বলছে, শেষ পর্যন্ত তাদের এই চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, এআই-এর এমন আচরণ তারা আগে কখনো দেখেনি। কিছু এআই এজেন্ট বাস্তব মানুষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে টানা ক্ষতিকর কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে।

এর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ বুধবার মেটা স্বীকার করেছে যে, পরীক্ষা চালানোর সময় তাদের একটি এআই মডেল নিরাপত্তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অন্য একটি সাইট হ্যাক করে ফেলেছে।

নিরাপত্তা পর্যালোচনার কাজ করা 'লুটা সিকিউরিটি'র প্রধান নির্বাহী কেটি মুসোরিস বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগের চোখে দেখছেন। তিনি বলেন, 'আমরা কোনো সমাধান পাওয়ার আগেই এমন আরও বহু সাইবার হামলা এবং এআই-এর বেআইনি কর্মকাণ্ড দেখতে যাচ্ছি।'

কল্পনার কারিগর জুলে ভের্ন ও কম্পিউটিংয়ের জনক টুরিং

এই অস্থির আর নিয়ন্ত্রণহীন এআই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুটি ঐতিহাসিক চরিত্রের কথা ভেসে ওঠে—জুলে ভের্ন এবং অ্যালেন টুরিং।

উনবিংশ শতকের ফরাসি লেখক জুলে ভের্নকে বলা হয় আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের জনক। মহাশূন্যে যাত্রা, সমুদ্রের তলদেশে সাবমেরিন কিংবা পৃথিবীর কেন্দ্রে অভিযানের মতো অসম্ভব বৈজ্ঞানিক ভাবনাসমূহকে লেখনীর জোরে সাজিয়েছিলেন তিনি। মানুষ যা কেবল কল্পনা করতে পারত, ভের্ন সেটিকে ভবিষ্যৎ বাস্তবতার রূপরেখা হিসেবে একে দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, বিংশ শতকের প্রথমার্ধে ব্রিটিশ গণিতবিদ ও সংকেত-বিশ্লেষক অ্যালেন টুরিং দিয়ে গেছেন আধুনিক ডিজিটাল কম্পিউটিংয়ের আসল ভিত্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির দুর্ভেদ্য 'এনিগমা' কোড ভাঙতে তাঁর আবিষ্কৃত যন্ত্র হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। পরবর্তীতে কোনো যন্ত্র মানুষের মতো বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তা করতে পারে কি না, তা মাপার জন্য তিনি তৈরি করেন বিখ্যাত 'টুরিং টেস্ট'। তাঁর এই কালজয়ী ভাবনাই মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্ম দিয়েছে।

দুজন একত্রে মিললে কী ঘটত?

ভাবুন তো, জুলে ভের্ন এবং অ্যালেন টুরিং যদি একই টেবিলে বসতেন, তবে কী হতো? ভের্ন দিতেন অসীম কল্পনা ও রোমাঞ্চকর ভবিষ্যৎ ধারণার ডানা। আর টুরিং সেই ডানাগুলোকে বাস্তব রূপ দিতে গাণিতিক কোড আর অ্যালগরিদমের মূল ভিত্তি তৈরি করতেন।

আজ এআই যেভাবে মানুষের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে লাইভ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ছে, নিজের ভুয়া পরিচয় তৈরি করছে কিংবা অন্য সাইটে বেআইনিভাবে ঢুকে পড়ছে—তা ঠিক ভের্নের সেই অনিয়ন্ত্রিত কল্পনার জগতের সাথে টুরিংয়ের যুক্তি ও অ্যালগরিদমের মেলবন্ধনকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। ভের্ন যে কল্পনার দুয়ার খুলেছিলেন, আর টুরিং যে কোডিংয়ের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন—সেই দুটি নদী আজ এসে মিলেছে এক ভয়াল মোহনায়, যার নাম নিয়ন্ত্রণহীন স্বায়ত্তশাসিত এআই'।

নিয়ন্ত্রণহীন স্বায়ত্তশাসিত এআই

অবশ্য, জুলাইয়ের শেষের দিকে ঘটে যাওয়া একটি অভূতপূর্ব ঘটনার পর এই বিষয়গুলো সামনে আসতে শুরু করে। সে সময় ওপেনএআই-এর মডেলগুলো নিজেদের পরীক্ষার গণ্ডি বা সীমানা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে যায় এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'হাগিং ফেস' নামের এক এআই স্টার্টআপের সিস্টেমে হানা দেয়। এই ঘটনায় হতবাক ওপেনএআই বিষয়টিকে নজিরবিহীন এক সাইবার দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যা দেয়।

ঘটনার পর অ্যানথ্রোপিকও তাদের নিজস্ব সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখে। সেখানে দেখা যায়, তাদের মডেলগুলোও গোপনে ইন্টারনেটে প্রবেশ করে তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মূল কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ বাগিয়ে নিয়েছে। তবে ওপেনএআই-এর মতো তারা ইচ্ছে করে সীমানা ভাঙেনি। মূল্যায়নকারী সহযোগীর সাথে ভুল বোঝাবুঝির কারণে পরীক্ষার সময় ইন্টারনেট সংযোগ চালু রয়ে গিয়েছিল।

কেটি মুসোরিসের মতে, এআই মডেলগুলো হলো সমুদ্রের সবচেয়ে চালাক অক্টোপাসের মতো, যা যেকোনো খাঁচা থেকে সুযোগ পেলেই পালিয়ে যেতে পারে। ঠিক যেমন অক্টোপাসধাঁধা মিলিয়ে নিজেকে মুক্ত করে, এআই-ও নিজের লক্ষ্য পূরণে যা করার তা-ই করবে। হাগিং ফেস হ্যাকিংয়ের ক্ষেত্রেও এআই সাইবার নিরাপত্তার জটিল ছক মেলাতে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, সব সীমা পার করে ফেলে। ওপেনএআই-এর পরীক্ষায় টিকে থাকার সবচেয়ে সহজ পথ হিসেবে এআই-টি চুরি ও হ্যাকিংয়ের পথ বেছে নেয়।

প্রযুক্তিবিদ ব্রুস শ্নায়ারের মতে, এটি হলো এক ধরনের 'জিন আচরণ'। রূপকথার প্রদীপের জিনের মতো এআই হয়তো আপনার ইচ্ছা পূরণ করবে, কিন্তু এমন এক চরম ও ক্ষতিকর উপায়ে তা করবে যা আপনার ধারণার বাইরে।

তবে সব সময় যে খারাপ ঘটছে তা নয়। কখনো কখনো এআই নিজের ভুল নিজেই ধরে ফেলছে। জুলাইয়ে অ্যানথ্রোপিকের পরীক্ষায় দেখা যায়, একটি মডেল বুঝতে পারে যে সে প্রকাশ্য ইন্টারনেটে কাজ করছে—যা তার মূল নির্দেশের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে এআই-টি নিজে থেকেই সেই অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ বন্ধ করে দেয়। এটিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন 'মডেল অ্যালাইনমেন্ট' বা এআই-কে মানুষের দেওয়া নিয়ম ও নীতির সাথে মিলিয়ে চালনা করা।

এদিকে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্সের অধ্যাপক জাস্টিন ক্যাপোস সতর্ক করে বলছেন, এআই যেভাবে দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তাতে সামনে এগুলো কম্পিউটার ভাইরাসের মতো আচরণ করতে পারে। ইচ্ছেমতো হ্যাকিং করে পুরো ব্যবস্থা অচল করে দিতে পারে। এমনকি মানুষের হাত থেকে এআই-এর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ছুটে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শেষ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আগেই এখন এআই-এর নিরাপত্তা জোরদার করার শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। এআই যদি একবার মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমত্তা অর্জন করে ফেলে, তবে এমন এক পৃথিবী তৈরি হবে যা আমাদের কল্পনা করার ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাবে।