‘মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন আপনি, খুবই হাস্যকর জেরা করছেন।’ গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ একটি মামলার সাক্ষীকে জেরার সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে এই কঠোর মন্তব্য করেছেন প্যানেলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জুলাই শহীদ মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়ার (ফারহান ফাইয়াজ) বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়ার পূর্ণাঙ্গ জবানবন্দী রেকর্ড করার পর এই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। এই মামলার মোট ২৮ জন আসামির মধ্যে চারজন বর্তমানে গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন- সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সাবেক সহসভাপতি মো: সাজ্জাদ হোসেন ও যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী। অন্য দিকে সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৪ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।
পলাতকদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য হলেন- তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি রৌশানুল হক সৈকত, ঢাকা উত্তরের আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সাত্তার, তোফায়েল আহম্মেদ, মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন, ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্টন, ইসমাইল হোসেন, মো: মাসুদুর রহমান বিপ্লব ও আহাদ হাসানসহ অজ্ঞাত আরো পাঁচ-সাতজন।
জবানবন্দী রেকর্ড শেষে আদালতে উপস্থিত আসামি নাঈমুল হাসান রাসেলের পক্ষে জেরা শুরু করেন অ্যাডভোকেট মো: সাহিদুর রহমান। এ সময় এই আইনজীবী শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়ার কাছে জানতে চান, ‘আপনি কি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে হেঁটে গিয়েছিলেন, নাকি দৌড়ে গেছেন?’ এমন অসংলগ্ন ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো: শফিউল আলম মাহমুদ সরাসরি আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এসব কী প্রশ্ন করেন আপনি? এই প্রশ্ন দিয়ে মামলার কী হবে? মানুষের জীবন নিয়ে খেলতে এসেছেন আপনি। হাস্যকর প্রশ্ন করছেন আপনি।’
এর আগে আইনজীবীর এক প্রশ্নের জবাবে শহীদ ফারহানের বাবা আদালতকে জানান, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই তাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। সে দিন পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রায় ৪০০ মানুষ নিহত হলেও সেখানে মাত্র ৩১টি বা ৩২টি পরিবারকে ডেকে অনুদান দেয়া হয়েছিল, যার বিরুদ্ধে তীব্র নৈতিক প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি সেই সরকারি অনুদান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এর আগে ট্রাইব্যুনালে দেয়া সুনির্দিষ্ট জবানবন্দীতে প্রায় ৫৪ বছর বয়সী সাক্ষী শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, তার একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে ফারহান ফাইয়াজ ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিল। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকাল ১০টায় সে বাসা থেকে বের হয়ে কলেজে যায় এবং সেখান থেকে বন্ধুদের সাথে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে মিছিলসহ মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে ধানমন্ডি-২৭ (পুরাতন) নম্বরে অবস্থান নেয়। তারা ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র এবং শান্তিপ্রিয়। কিন্তু তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের ওপর চড়াও হয় এবং পুলিশের সহযোগিতায় নির্বিচারে গুলি চালায়। বেলা আড়াইটার দিকে ফারহানের বুকে একটি বুলেট বিদ্ধ হয়।
তিনি আরো জানান, মালিবাগের অফিস থেকে ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং পরিবহন না পেয়ে কিছুটা পথ হেঁটে, কিছুটা পথ দৌড়ে এবং কিছুটা পথ রিকশায় করে প্রথমে নিজের কাকরাইল সার্কিট হাউজ রোডের বাসায় যান। সেখানে স্ত্রী ও মেয়েকে ঘটনাটি জানিয়ে একা ধানমন্ডির উদ্দেশে রওনা হন। পথে খবর পান ছেলেকে লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তিনি পৌঁছানোর আগেই ফারহানের মোহাম্মদপুর নিবাসী মামা মিজানুর রহমান ও তার স্ত্রী হাসপাতালে পৌঁছান। হাসপাতালে গিয়ে তিনি রক্তে রঞ্জিত বহু ছাত্রের এক বীভৎস অবস্থা দেখতে পান। পরে আইসিইউতে গিয়ে দেখেন ফারহানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার একপর্যায়ে চিকিৎসক মাস্কটি খুলে ওর মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। হসপিটাল কর্তৃপক্ষের দেয়া মৃত্যুসনদে লেখা ছিল- ফারহান ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছে।
লাশ দাফন ও পরবর্তী বাধার লোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া জবানবন্দীতে বলেন, ‘‘ফারহানের মৃত্যুর পর হাসপাতাল চত্বর পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী ঘিরে ফেলে এবং বাইরে অনবরত সাউন্ড গ্রেনেড, অগ্নিসংযোগ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। আহত শিশুদেরও তারা ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে দিচ্ছিল না। পরে অনেক কষ্টে হাসপাতালের পেছনের গেট দিয়ে লাশ বের করে ‘আল মারকাজুল’ লাশ দাফন কেন্দ্রে নিয়ে গোসল সম্পন্ন করাই। সেখান থেকে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ মাঠে নিয়ে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে প্রথম নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর ফ্রিজিং গাড়িতে গ্রামের বাড়ি বরপার উদ্দেশে রওনা হই এবং আমাদের পেছনে আরেকটি মাইক্রো বাসে আমার স্ত্রী ও কন্যা রওনা দেন। পথে কাকরাইল মোড় এবং যাত্রাবাড়ী মোড়ে দুই দফায় আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর বাধার মুখে পড়ি আমরা। তারা আমাদের গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করে এবং সম্ভবত লাশটি ছিনতাই করতে চেয়েছিল। এমনকি গ্রামে পৌঁছানোর পর সেখানকার স্থানীয় আওয়ামী বাহিনী লাশ দাফনের জন্য আমাদের মাত্র ৪০ মিনিট সময় বেঁধে দেয়। পরে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বরপা সামাজিক কবরস্থানে আমার একমাত্র ছেলেকে কবরস্থ করি।’’
তদন্তকারী কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদে এই পূর্ণাঙ্গ জবানবন্দী দেয়ার কথা উল্লেখ করে সাক্ষী তার ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী এবং ভিডিও ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিহ্নিত সব এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত আসামিদের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
গত ১০ মে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-১ এই ২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন। প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই তৎকালীন সরকারের উসকানি, প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলো নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে নৃশংসতা চালায়, যাতে ফারহান ফাইয়াজ ও মাহমুদুর রহমান সৈকতসহ মোট ৯ জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন।



