৯৬ শতাংশ কাজ শেষ করার দাবি কাগজে!
- কেন থামছে না মেয়াদের পর মেয়াদ বৃদ্ধি?
- ৩.৫ বছরের প্রকল্প এখন ৭.৫ বছরে উন্নীত
- ৪ শতাংশ কাজ শেষ করতে কত দিন আর?
সাড়ে ১৪ শ’কোটি টাকা খরচ শেষ। সরকারি নথিতে কাজের অগ্রগতি সাড়ে ৯৬ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা বন্দরনগরীর ছবিটা এতটুকু বদলায়নি। সামান্য বৃষ্টি আর জোয়ারের পানি এক হলেই এখনো থই থই করে বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ, জিইসি থেকে হালিশহর। জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার যে ‘স্বপ্ন’ চট্টগ্রামবাসীকে দেখানো হয়েছিল, তা এখন অন্তহীন মেয়াদের চক্রব্যূহে বন্দী। যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুনে, তা এখন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরকে অতিক্রম করছে। এবার পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আরো এক বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় চাইছে। যে প্রকল্পটি তিন বছর পাঁচ মাসে শেষ করার কথা ছিল, সেটি এখন সাত বছর পাঁচ মাসে গড়াচ্ছে বলে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে পাঠানো পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটির সংশোধিত প্রস্তাবনার দলিল থেকে জানা গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের এবং বিশ্লেষকদের জানতে চাওয়া, সাত বছর দুই মাসে যে প্রকল্পের ৯৬ শতাংশের বেশি ভৌত ও আর্থিক কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে, সে প্রকল্পের শেষ চার শতাংশ সারতে আর কত বছর লাগবে? আজ সোমবার প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবনা নিয়ে বসবে মূল্যায়ন কমিটি।
সাড়ে ৩ বছরের মেয়াদ বেড়ে সাড়ে ৭ বছরে!
প্রকল্প নথির তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা/জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ প্রকল্পের সূচনা হয়, তখন মূল বরাদ্দ ছিল এক হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। লক্ষ্য ছিল প্রায় সাড়ে তিন বছরে অর্থাৎ ২০২২ সালের জুনের মধ্যে কাজ খতম করা। কিন্তু সে লক্ষ্যের সলিল সমাধি ঘটেছে বহু আগেই। প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় (২০২২-২০২৪) খরচ না বাড়িয়ে এক বছর করে দু’বার সময় বাড়ানো হয়। তৃতীয় দফায় (২০২৪-২০২৬) প্রথম সংশোধনীতে বাজেট কমিয়ে এক হাজার ৫০৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা করা হলেও মেয়াদ এক লাফে বাড়িয়ে দেয়া হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। কাগজ-কলমে এখনো কাজ বাকি চার শতাংশ। আর (দ্বিতীয় সংশোধনী) এবার পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় ফের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে-মেয়াদ আরো এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন করা হোক। অর্থাৎ সাড়ে তিন বছরের প্রকল্প এখন সাড়ে সাত বছরে পরিণত হতে চলেছে। খরচ ১১২ কোটি টাকা কমলেও সময়ের হিসাবে এ যেন এক ‘অসীম প্রতীক্ষা’।
২১ রেগুলেটর, ৫১ পাম্প-তারপরও নতুন সংস্থান
সংশোধিত প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পটির আওতায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কাজ নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে খাল খনন ও ড্রেজিং, রেগুলেটর নির্মাণ, পাম্প স্থাপন, জলকপাট ও স্লুইচগেট নির্মাণ, প্রতিরক্ষা দেয়াল, ড্রেনেজ অবকাঠামো এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার পুনর্বাসন। প্রকল্পের আওতায় মোট ২১টি রেগুলেটর নির্মাণের কথা রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ১০টি রেগুলেটরের কাজ শেষ হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত আরো কয়েকটির কাজ শেষ হয় এবং মোট ১৯টি রেগুলেটরের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্মিত রেগুলেটরগুলোকে কয়েক বছর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কার্যপত্রে এ জন্য অপারেটর, নিরাপত্তাকর্মী, দিনমজুর, সুইপার, জ্বালানি, পাম্প ট্রাকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সংস্থানের বিষয়ও উঠে এসেছে। এমনকি প্রহরা, পরিচালনা এবং পলি ও আবর্জনা অপসারণের কাজের জন্য প্রায় দুই কোটি ৯৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকার একটি প্যাকেজ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা দেয়ালেও বাড়ছে কাজ
প্রকল্পের আওতায় নদীর তীর সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের কাজও রয়েছে। কার্যপত্রে বলা হয়েছে, প্রকল্পে মোট ৬ দশমিক ৮৮৫ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেয়ালের কাজের সংস্থান থাকলেও নদীর প্রকৃত অ্যালাইনমেন্টের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেয়ালের অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ করতে গিয়ে দৈর্ঘ্য ৮৮ মিটার বেড়েছে। এর ফলে এ কাজের নির্মাণ ব্যয় ১১ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা বেড়েছে বলে পিইসি থেকে জানা গেছে।
ভূমি অধিগ্রহণও কমেছে
প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণও কমানো হচ্ছে। প্রথম সংশোধিত আরডিপিপিতে ৬ দশমিক ৪২৩ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রায় ৪১৩ কোটি ৬৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা সংস্থান ছিল। জুন ২০২৬ পর্যন্ত এ খাতে প্রায় ৩৬৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। দ্বিতীয় সংশোধনের প্রস্তাবে জমির পরিমাণ দশমিক ০৭২ হেক্টর কমিয়ে ৬ দশমিক ৩৫৩ হেক্টর করা হয়েছে। এতে মোট সংস্থান কমিয়ে ৩৬৯ কোটি ২১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রামের নগরবাসীর কাছে জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে একের পর এক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। খাল খনন, রেগুলেটর, পাম্প, প্রতিরক্ষা দেয়াল, ড্রেনেজ-বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পের নথিতেই যখন দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত নেয়ার প্রয়োজন হচ্ছে, তখন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনার বাস্তবতা, কাজের মান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থ ব্যয় হয়ে যাওয়ার পরও যদি নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণ, পাম্পের স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন, প্রতিরক্ষা দেয়ালের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি এবং অন্যান্য অঙ্গ সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তাহলে শুরুতে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রস্তুতি কতটা যথাযথ ছিল- সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।



