- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান চলাকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ (আইসিটি) এক নাটকীয় বিচারিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মামলার ১১ নম্বর সাক্ষী মো: আল আমিন হোসেনের বয়ানে অসঙ্গতি দেখা দিলে তাকে ‘প্রতিকূল’ বা ‘হস্টাইল উইটনেস’ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছিল প্রসিকিউশন। পরবর্তীতে আইনি কৌশলগত দিক পর্যালোচনার পর সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছে তারা।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এই সাক্ষ্য ও জেরা গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে মামলার দুই মূল আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। কাঠগড়ায় তাদের উপস্থিতিতেই শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম।
আসামিপক্ষের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় সাক্ষীকে জেরা শুরু করলে বয়ানে বিভিন্ন আইনি ফাঁকফোকর ফুটে ওঠে। জবানবন্দীতে আল আমিন মিরপুর-১০ নম্বরে নিজ চোখে গুলিবর্ষণ ও সিয়াম সরদার নিহতের ঘটনা বর্ণনা করলেও জেরায় নানা বৈপরীত্য দেখা যায়। একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া তথ্যের সাথে আদালতে প্রদত্ত বয়ানের ফারাক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাক্ষী বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সব বলতে পারিনি, এখানে মন খুলে কথা বলতে পেরেছি।’ সাক্ষীর এই মন্তব্যের পরই ট্রাইব্যুনাল কক্ষে তাকে ‘হস্টাইল’ ঘোষণার আলোচনা ওঠে।
আইনি প্রক্রিয়া ও ‘হস্টাইল’ বিষয়টির সার্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ প্রথমে একটি দরখাস্ত দিয়ে এই সাক্ষীকে বৈরী বা হস্টাইল ঘোষণা করার ইঙ্গিত দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে সাক্ষীকে ‘হস্টাইল’ করার ঘটনা সম্ভবত এটিই প্রথম হতে পারত।
বিষয়টির স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, যে পক্ষ (এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ) আদালতে সাক্ষী উপস্থাপন করে, সাক্ষী যদি আদালতে এসে তাদের সমর্থিত বয়ানের বিপরীতে কথা বলে বা সত্য গোপন করে, তবে তাকে ‘বৈরী’ বা ‘হস্টাইল’ বলা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের তদন্তকারী কর্মকর্তার (আইও) কাছে সাক্ষী এক রকম বলে ট্রাইব্যুনালে এসে অন্য রকম বললে রাষ্ট্রপক্ষ তাকে নিজের পক্ষে আর বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না। তখন রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করে, যাতে ওই নিজ সাক্ষীকে আসামিপক্ষের মতো নিজেরাও জেরা করতে পারে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় নয়া দিগন্তকে বলেন, জেরার শেষ পর্যায়ে প্রসিকিউশন সাক্ষীকে ‘হস্টাইল’ ডিক্লেয়ার করার জন্য মৌখিকভাবে ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জবাবে আদালত তাদের একটি আনুষ্ঠানিক (ফরমাল) আবেদন দাখিল করতে বলেন।
পলাশ চন্দ্র রায় আরো জানান, প্রসিকিউশনের কাছে হয়তো মনে হয়েছে সাক্ষী তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কথা বলেননি। ফৌজদারি বিচারে নিজ পক্ষের বিরুদ্ধে সাক্ষী গেলে তাকে হস্টাইল ঘোষণা এবং আবার জেরা করার আবেদন করা একটি স্বীকৃত নিয়ম। তবে সেই আবেদন আদালত মঞ্জুর করবেন কী করবেন না, তা সম্পূর্ণ আদালতের ওপর নির্ভর করে।
জেরা ও আইনি বিতর্ক শেষে প্রসিকিউশন তাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামীম ও মার্জিনা রায়হান নয়া দিগন্তকে জানান, ট্রাইব্যুনাল কক্ষে প্রতিকূল ঘোষণার কথা বলা হলেও পরবর্তীতে তারা লিখিত দরখাস্ত না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ফলে সাক্ষীর দেয়া জবানবন্দী ও জেরা যেভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে, সেভাবেই বিচারে বিবেচিত হবে। শুনানি শেষে আদালত আগামী ২৫ আগস্ট মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন।
এর আগে পল্লবী থানা শাখা শ্রমিক দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও গার্মেন্ট ব্যবসায়ী মো: আল আমিন হোসেন তার জবানবন্দীতে আন্দোলনের দিনগুলোর ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। ১৮ জুলাইয়ের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, মিরপুর-১০-এর পপুলার ডায়াগনস্টিক হাসপাতালের সামনে রাত ১০টার পর পুলিশ ও সাদা পোশাকধারীরা গুলি চালায়। একটি গুলি আন্দোলনরত সিয়াম সরদারের চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে আল আমিনের মাথায় আঘাত করে। জ্ঞান ফিরলে তিনি দেখতে পান সিয়ামের মগজ ও রক্ত তার টি-শার্টে লেগে আছে। হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক সিয়ামকে মৃত ঘোষণা করেন।
১৯ জুলাই ও পরবর্তী সহিংসতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, জুটপট্টির আসিফ, পারভেজ, রুবেল শহীদ হওয়ার পর আন্দোলন আরো জোরালো হয়। এ দিন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের মোটরসাইকেল মিছিল থেকে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়।
কল রেকর্ড ও দায় নির্ধারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কল রেকর্ডে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হককে কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দেয়ার কথা বলতে শোনেন বলে তিনি দাবি করেন। এই গণহত্যার জন্য শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকসহ শীর্ষ নেতাদের দায়ী করেন তিনি।



