দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে ঢাকার সদরঘাট। বিশেষ করে কুলি নামের কিছু দুর্বৃত্ত যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচল বিষিয়ে তুলেছে। এরা যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো কারণ ছাড়াই অর্থকড়ি হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো যাত্রীদেরকে মারধরের শিকার হতে হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার ভোরের ঘটনা। সাখাওয়াত নামে এক সাংবাদিক যে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি ঘটনার ভিডিও করতে গিয়ে কুলি নামের সন্ত্রাসীদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হন। সাখাওয়াত বলেন, ‘সোমবার দুপুরে হাতিয়া থেকে ভোলার বিভিন্ন ঘাট হয়ে ছেড়ে আসা তাশরিফ-২ লঞ্চটি মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে ঢাকার সদরঘাটে পৌঁছায়। আমিও ওই লঞ্চের একজন যাত্রী ছিলাম। চালকের কেবিনের পাশের একটি সিট ৮০০ টাকায় ভাড়া নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলাম। লঞ্চের তিনতলা থেকে নিচে নেমে দেখি প্রায় ১০-১৫ জন যাত্রীর ভিড়। তাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন প্রবাসী। সাথে ছিল লাগেজ এবং পরিবারের সদস্যরা। হঠাৎ দেখি কয়েকজন কুলি তাদের ঘিরে ধরে লাগেজ নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে। যাত্রীদের দাবি ছিল, লঞ্চ থেকে প্রবাসীরা নিজ মালামাল নিজে নিয়ে নামাতে হলেও জনপ্রতি অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। একজন প্রবাসী আপত্তি করলে তাকে ধাক্কা দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। তাকে এই ঘাট থেকে কে ছুটিয়ে নিবে সেই হুমকিও দেয়া হয়।
ঘটনাটি দেখে আমি কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়াই এবং কাউকে বুঝতে না দিয়ে মোবাইলে কয়েকটি ছবি তুলি। কয়েক মিনিট পর একজন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার মালামাল কোথায়?’ আমি বলি, ‘আমার কোনো মালামাল নেই, একজনকে ফোন করছি।’
এরপর তিনি জানতে চান, ‘আপনি ছবি তুললেন কেন?’ তখন আমি বলি, ‘আপনারা কেন প্রবাসীদের এভাবে হয়রানি করছেন? সেই কারণেই ছবি তুলেছি।’
এরপর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তিনি আমাকে ছবিগুলো মুছে ফেলতে বলেন। আমি জানাই, একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রকাশ্য স্থানে ছবি তোলার অধিকার আমার আছে। নিজের অফিস আইডি কার্ড এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সদস্য পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তিনি একই কথা বলতে থাকেন- ছবি না মুছলে ‘সুস্থ অবস্থায় বাসায় ফিরতে পারবেন না’- বলে হুমকি দেন।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত ছবিগুলো মুছে ফেলতে বাধ্য হই। পরে প্রবাসীদের লাগেজ নিয়ে লঞ্চ থেকে নামার সুযোগ দেয়া হয়।
একাধিক যাত্রী অভিযোগ করেছেন, সদরঘাটের এই চিত্র প্রতিদিনের। এখানকার অঘোষিত ‘রাজা’ হলো কুলিরা। প্রশাসনের চোখের সামনে এরা যাত্রীদের সাথে যাচ্ছেতাই করে। মুরাদ নামে এক যাত্রী বলেন, কয়েক দিন আগে তার একটি হ্যান্ড লাগেজ তুলে দেয়ার নাম করে তার কাছ থেকে ১২০০ টাকা হাতিয়ে নেয়। যা তিনি নিজেই বহন করতে পারতেন। তাকে বাধ্য করা হয় ওই টাকা দিতে। কিশোর নামের অপর এক যাত্রী অভিযোগ করেন, এখানে কুলিদের আচরণ ডাকাতদের মতো। যাত্রীদেরকে তারা আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়।
সদরঘাটের বর্তমান ইজারাদার হচ্ছেন শ্রমিক দলের নেতা সুমন ভূইয়া। তিনি পরিচালনা করেন এই কুলিদেরকে। সদরঘাটে যাত্রী হয়রানির সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে তাকে ফোন দেয়া হলে তিনি ফোন ধরেননি। সদরঘাট নৌথানার ওসি মো: সোহাগ হোসেন বলেন, কেউ অভিযোগ না করলে পুলিশের কিছু করার নেই। অভিযোগ দিলেই পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারবে। অথচ যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশের চোখের সামনেই এই হয়রানির ঘটনা ঘটে। কিন্তু পুলিশ কিছুই বলে না। যাত্রী হয়রানির ব্যাপারে জানতে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ও সদরঘাট পোর্ট অফিসার মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, কুলিদের বিষয় দেখাশোনা করেন ইজারাদারেরা। তারপরও কোন অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।



