সাক্ষাৎকার : প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা

ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্পন্ন পাঠ্যবই পৌঁছে যাবে

এবার আমাদের মূল তিনটি অগ্রাধিকার- গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও সময়ানুবর্তিতা। প্রায় চার শতাধিক বিশেষজ্ঞ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, সম্পাদক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ বই প্রস্তুতের কাজে যুক্ত রয়েছেন। প্রতিটি বই একাধিক ধাপে পর্যালোচনা করা হয়েছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা নির্ভুল, মানসম্মত ও সময়োপযোগী বই পাক।

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবার রেকর্ড সময়ের মধ্যে পাঠ্যবই প্রস্তুত, মুদ্রণ ও বিতরণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। একই সাথে নতুন চারটি বিষয় সংযোজন, পাঠ্যবইয়ের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং ইতিহাসের নিরপেক্ষ উপস্থাপনা নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। এসব বিষয় নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-

প্রশ্ন : ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই প্রস্তুতির কাজ এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে?

প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা : আলহামদুলিল্লাহ, আমরা নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছি। এ পর্যন্ত ১৩৭টি বইয়ের মধ্যে ১৩৩টির পরিমার্জন ও ইনডিজাইন সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ বেশির ভাগ বই এখন মুদ্রণের জন্য প্রস্তুত। অবশিষ্ট চারটি বই নতুন সংযোজন হওয়ায় সেগুলোর বিষয়বস্তু ও কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আশা করছি, দ্রুত এগুলোর কাজও শেষ হবে।

প্রশ্ন : আপনারা বলছেন ডিসেম্বরের মধ্যেই বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাবে। এ লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : এটি শুধু একটি ঘোষণা নয় বরং পরিকল্পিত কর্মসূচি। আমরা বই প্রস্তুত, টেন্ডার, মুদ্রণ ও বিতরণ- প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা সময়সূচি নির্ধারণ করেছি। সেই অনুযায়ী কাজ এগোচ্ছে। যদি সবকিছু পরিকল্পনামাফিক সম্পন্ন হয়, তাহলে ডিসেম্বরের প্রথম দিক থেকেই বই বিতরণ শুরু করা সম্ভব হবে। আমাদের লক্ষ্য, নতুন বছর শুরু হওয়ার আগেই বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই পৌঁছে দেয়া।

প্রশ্ন : অতীতে প্রায়ই দেখা গেছে বছরের শুরুতে অনেক শিক্ষার্থী বই পায়নি। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা নিয়েছেন?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : অতীতের অভিজ্ঞতাকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। এবার সময় ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- প্রস্তুতির কাজ অনেক আগেই শুরু করা হয়েছে। বইয়ের সম্পাদনা, পরিমার্জন, ডিজাইন ও টেন্ডার- সবকিছু নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করা হচ্ছে। ফলে শেষ মুহূর্তের চাপ অনেকটাই কমে এসেছে।

প্রশ্ন : বইয়ের মান নিয়ে প্রায়ই সমালোচনা হয়। এবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : এবার আমাদের মূল তিনটি অগ্রাধিকার- গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও সময়ানুবর্তিতা। প্রায় চার শতাধিক বিশেষজ্ঞ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, সম্পাদক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ বই প্রস্তুতের কাজে যুক্ত রয়েছেন। প্রতিটি বই একাধিক ধাপে পর্যালোচনা করা হয়েছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা নির্ভুল, মানসম্মত ও সময়োপযোগী বই পাক।

প্রশ্ন : বই মুদ্রণে সিন্ডিকেটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : আমরা বই মুদ্রণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছি। টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া এবং সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা। কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা বা সিন্ডিকেটের সুযোগ যেন না থাকে, সে বিষয়েও আমরা সতর্ক।

প্রশ্ন : নতুন শিক্ষাবর্ষে চারটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে। এর প্রয়োজনীয়তা কী?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : বর্তমানে শিক্ষা শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক থাকলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের জীবনদক্ষতা, মানসিক বিকাশ, সামাজিক মূল্যবোধ ও কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সেই লক্ষ্য থেকেই খেলাধুলা, সংস্কৃতি, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস এবং কর্মমুখী শিক্ষা বিষয়ে নতুন বই সংযোজন করা হচ্ছে। এগুলো শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রশ্ন : নতুন বইগুলোর বিষয়বস্তু কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : আমরা শুধু দেশীয় অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করছি না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিক্ষামডেল পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মতামতও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। আমরা চাই, বইগুলো বাস্তবজীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং ভবিষ্যতের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হোক।

প্রশ্ন : এত বিপুলসংখ্যক বই মুদ্রণ ও বিতরণে কী ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩০ কোটি ৮৩ লাখ ১২ হাজার ৬৮০ কপি বই মুদ্রণ করা হবে। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। এজন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। লজিস্টিক পরিকল্পনাও আগেভাগে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো বই পৌঁছে দেয়া যায়।

প্রশ্ন : পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস উপস্থাপন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে। এবার কী পরিবর্তন আসছে?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : আমাদের সবচেয়ে বড় সাহসের জায়গা হলো বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী একটি নির্মোহ, তথ্যনির্ভর ও সত্যভিত্তিক ইতিহাস উপস্থাপন করতে চান। আমাদের ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই। আমরা চাই, ইতিহাসে যার যে অবদান, তা যথাযথভাবে উপস্থাপিত হোক। কাউকে অযথা বড় করে দেখানো বা ছোট করে দেখানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন : আপনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়েও কথা বলেছেন। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : ইতিহাসের যেসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল, সেগুলো তথ্য ও দলিলের ভিত্তিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করছি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টিও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। অতীতে এটি যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি- এমন অভিযোগ ছিল। আমরা চেষ্টা করছি, যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে।

প্রশ্ন : এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কারা আপনাদের সহযোগিতা করছেন?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরাও আমাদের সহযোগিতা করছেন। শিক্ষাবিদ, সম্পাদক, বিষয়বিশেষজ্ঞ এবং কারিগরি টিম সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন।

প্রশ্ন : শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

প্রফেসর ফখরুল মাওলা : আমরা চাই, প্রতিটি শিক্ষার্থী সময়মতো একটি মানসম্পন্ন বই হাতে পাক। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। সবার সহযোগিতা পেলে ডিসেম্বর থেকেই বই বিতরণ শুরু করা যাবে এবং নতুন শিক্ষাবর্ষে বইসঙ্কটের পুরনো চিত্র আর থাকবে না এমন প্রত্যাশাই করছি।