বিবিএসের জরিপ

সহিংসতার শিকার নারীদের ৬৪ ভাগই নীরব থাকে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশে জীবনে অন্তত একবার : শতকরা ৭৬ ভাগ নারী এবং গত ১২ মাসে ৪৯ শতাংশ নারী জীবনসঙ্গী বা স্বামীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এভাবে সহিংসতার মাত্রা বেশি হলেও প্রায় ৬৪ ভাগ ভিকটিম এ কথা কাউকে কখনো বলেননি। সম্প্রতি সারা দেশে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগের নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছেন। আর সবচেয়ে কম নির্যাতিত হয়েছেন সিলেটের নারীরা।

জরিপে জানা গেছে, নারীদের অন্য কারো চাইতে স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা তিন গুণ এবং যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ১৪ গুণ বেশি। ফলে বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শারীরিক এবং যৌন সহিংসতার ঝুঁকি অত্যধিক বেশি।

গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবন অডিটোরিয়ামে যৌথভাবে বিবিএস এবং জাতিসঙ্ঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০২৪ এর মূল তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ।

বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, পরিসংখ্যান ও তথ্য বিজ্ঞান বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার, বাংলাদেশে ইউএনএফপিএর ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি মাসাকি ওয়াতাবে এবং অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে। সভাপতিত্ব করেন বিবিএস মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ২০২৪ সালের নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপের মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন বিবিএসের প্রকল্প পরিচালক ইফতেখাইরুল করিম। ২০১১ এবং ২০১৫ সালের জরিপের পরে তৃতীয়বারের মতো ২০২৪ সালে এই জরিপ করা হয় বলে জানিয়েছে বিবিএস।

জরিপে বলা হয়, দেশে জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭৫.৯ শতাংশ নারী। গ্রামে এই হার ৭৬ শতাংশ এবং শহরে ৭৫.৬ শতাংশ। তবে বিভাগওয়ারী বরিশালে নারী নির্যাতনের হার বেশি ৮১.৫ শতাংশ। সব থেকে কম সিলেটে ৭২.১ শতাংশ। বরিশালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নারী নির্যাতন হয় খুলনায় ৮১.৫ শতাংশ। এ ছাড়া ঢাকায় ৭২.৯ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৭৮.৫ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৭৫.১ শতাংশ, রাজশাহীতে ৭৪.৫ শতাংশ ও রংপুরে ৭৪.১ শতাংশ নারী জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

জরিপের তথ্য বলছে, সহিংসতার ঝুঁকির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তারতম্য যেমন- দুর্যোগপ্রবণ এলাকার নারীরা তাদের জীবদ্দশায় এবং বিগত ১২ মাসের মধ্যে অদুর্যোগ-প্রবণ এলাকার নারীদের তুলনায় জীবনসঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা বেশি মাত্রায় সহিংসতার সম্মুখীন হন। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সুনাম রক্ষা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ এবং এ ধরনের সহিংসতা স্বাভাবিক বলে মনে করার প্রবণতাসহ বিভিন্ন কারণে মূলত তারা নীরব থাকেন।

বিবিএস বলছে, নারীদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৪ শতাংশ) জীবদ্দশায় তাদের স্বামীর দ্বারা শারীরিক অথবা যৌন সহিংসতা বা উভয় সহিংসতার সম্মুখীন হলেও ১৬ শতাংশ নারী গত ১২ মাসে এ ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ এবং মানসিক সহিংসতা সর্বাধিক সংঘটিত সহিংসতার ধরন হিসেবে পাওয়া গেছে। ফলে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

বিবিএস বলছে, নারী সহিংসতা বাংলাদেশে এতটাই প্রকট যে প্রায় ৭০ ভাগ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়ে হয়েছেন। ৪১ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে গত ১২ মাসে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো জাতিসঙ্ঘের মানসম্পন্ন পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতার বিস্তার পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক এমন সহিংসতামূলক আচরণগুলো অন্তর্ভুক্ত করলে এই সহিংসতার ব্যাপকতা আরো বেশি হয়।