প্রাচীন থেকে প্রযুক্তি: চেনা-অচেনা চীনের গল্প

চীনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—এখানে ইতিহাস কোনো জাদুঘরের কাঁচের বাক্সে বন্দি নয়। বরং অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি হেঁটে চলে।

ইমরান হোসেন
কুয়াশাঘেরা ওয়েস্ট লেক থেকে সাংহাইয়ের আকাশছোঁয়া স্কাইলাইন—হাজার বছরের ঐতিহ্য আর আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এক সভ্যতার সন্ধানে চেনা-অচেনা চীন।

সকাল সাড়ে পাঁচটা। হাংঝুর বিখ্যাত ওয়েস্ট লেক—বাশিহুর পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হলো যেন কোনো জীবন্ত জলরঙের ছবির ভেতরে প্রবেশ করেছি। পাতলা কুয়াশার চাদরে মোড়া লেকের শান্ত জলে উইলো গাছের ঝুলন্ত ডাল নরম ছোঁয়া দিচ্ছে। দূরে আবছাভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বাওচু প্যাগোডা। চারপাশে এমন এক নৈঃশব্দ্য, যা প্রকৃতির নিজস্ব ভাষায় কথা বলে।

হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে ভেসে এলো বাঁশের বাঁশির সুর। লেকের ধারে এক বৃদ্ধ একমনে বাঁশি বাজাচ্ছেন, আর পাশে একদল প্রবীণ ধীরলয়ে অনুশীলন করছেন তাইচি। হাতে ধোঁয়া ওঠা লংজিং গ্রিন টি। চায়ের সুবাস, বাঁশির সুর আর সকালের কুয়াশা মিলেমিশে এক অনন্য অনুভূতির জন্ম দিল।

সেই মুহূর্তে মনে পড়ে গেল বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলের কুয়াশাঘেরা চা-বাগানের সকাল। দুই দেশের প্রকৃতি ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন—তবু কোথাও যেন এক অদ্ভুত আত্মীয়তা। সেই চেনা-অচেনার অনুভূতিই একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে আমাকে নতুন করে চীনকে আবিষ্কার করতে শিখিয়েছে। বুঝেছি, ভ্রমণ শুধু নতুন স্থান দেখা নয়; এটি একটি প্রাচীন সভ্যতার আত্মার স্পন্দন অনুভব করারও নাম।

ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সহাবস্থান
চীনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—এখানে ইতিহাস কোনো জাদুঘরের কাঁচের বাক্সে বন্দি নয়। বরং অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি হেঁটে চলে।

বেইজিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরের কেন্দ্রে গেলেই চোখে পড়ে এক অনন্য বৈপরীত্য। একদিকে আকাশছোঁয়া কাঁচের গগনচুম্বী ভবন, অন্যদিকে শত শত বছরের পুরোনো সিহেউয়ান—ঐতিহ্যবাহী উঠোনবাড়ি। আধুনিকতার ভিড়েও অতীতকে হারিয়ে যেতে দেয়নি চীন।

এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্রের পরিকল্পিত উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য। ইউনেস্কো স্বীকৃত ষাটেরও বেশি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান, প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যান, সাংস্কৃতিক পর্যটন রুট এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার—সব মিলিয়ে ইতিহাসকে তারা কেবল সংরক্ষণই করেনি, সাধারণ মানুষের জীবনের অংশে পরিণত করেছে। এখানে ঐতিহ্য মানে শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি অর্থনীতি, পর্যটন ও জাতীয় পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

নিষিদ্ধ নগরীতে ইতিহাসের মুখোমুখি
আমার ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতার একটি ছিল বেইজিংয়ের ফরবিডেন সিটি বা নিষিদ্ধ নগরী।

প্রায় ১৮০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই রাজপ্রাসাদ পাঁচ শতাব্দী ধরে ২৪ জন সম্রাটের আবাস ছিল। বিশাল লাল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হয়, ইতিহাস যেন নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি প্রাসাদ, প্রতিটি সোনালি ড্রাগনের নকশা, প্রতিটি স্তম্ভ যেন শতাব্দীর গল্প শোনায়।

এক কোণে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় এক প্রবীণ চীনা ভদ্রলোক বললেন, “এই হলুদ ছাদ পৃথিবীর প্রতীক, আর লাল দেয়াল জীবনের। এই প্রাসাদের প্রতিটি ইটের নিচে লুকিয়ে আছে একটি করে রাজকীয় গল্প।”

তাঁর কথা শুনে আমার মনে পড়ে যায় ঢাকার লালবাগ কেল্লার কথা। ইতিহাস ভিন্ন হলেও দুই দেশের ঐতিহ্য যেন একই ভাষায় অতীতের গল্প বলে।

৩৫০ কিলোমিটার গতির ট্রেন থেকে দুই হাজার বছরের সেনাবাহিনী

বেইজিং থেকে শিয়ানের পথে যখন হাই-স্পিড ট্রেনে উঠলাম, তখন গতিবেগ ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার। আধুনিক প্রযুক্তির এই বিস্ময় যেন চোখের পলকে শহর বদলে দিচ্ছিল।

কিন্তু শিয়ানে পৌঁছে সেই আধুনিকতা মিলিয়ে গেল দুই হাজার বছরের ইতিহাসের সামনে।

টেরাকোটা আর্মির সামনে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। ১৯৭৪ সালে এক কৃষকের কূপ খননের সময় আবিষ্কৃত হাজার হাজার মাটির সৈন্য, ঘোড়া আর রথ আজও পাহারা দিচ্ছে চীনের প্রথম সম্রাট ছিন শি হুয়াংকে।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, কোনো দুটি সৈনিকের মুখ এক নয়। চুলের বিন্যাস, পোশাক, বর্ম—সবই আলাদা। যেন দুই হাজার বছর আগের এক বিশাল সেনাবাহিনী এখনও সময়ের প্রহর গুনছে।

প্রকৃতির বিস্ময় ঝাংজিয়াজিয়ে
ইতিহাসের পর প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছে ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্কে।

কুয়াশার বুক চিরে আকাশমুখী বিশাল পাথরের স্তম্ভগুলো দেখে মনে হয়, যেন পৃথিবীর নয়—অন্য কোনো গ্রহে এসে পড়েছি। পরিচালক জেমস ক্যামেরন তাঁর ‘অ্যাভাটার’ চলচ্চিত্রের ভাসমান পাহাড়ের অনুপ্রেরণা এখান থেকেই নিয়েছিলেন।

কাঁচের ঝুলন্ত সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে প্রথমে বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য সব ভয় ভুলিয়ে দেয়।

তখন মনে হয়, বাংলাদেশের বান্দরবানের পাহাড় কিংবা সাজেকের সৌন্দর্যও যদি একই পরিকল্পনায় বিশ্বদরবারে তুলে ধরা যেত, তাহলে আমাদের পর্যটন শিল্পও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারত।

সাংহাই: যেখানে গতকাল ও আগামীকাল পাশাপাশি
চীনের আরেকটি মুখ সাংহাই। হুয়াংপু নদীর তীরে দাঁড়ালে একপাশে দেখা যায় ঔপনিবেশিক আমলের ইউরোপীয় স্থাপত্য, অন্যপাশে ভবিষ্যতের শহরের মতো পুডংয়ের আকাশছোঁয়া অট্টালিকা।

রাত নামলে পার্ল টাওয়ার আর সাংহাই টাওয়ারের আলোর প্রতিফলন নদীর জলে এক স্বপ্নময় দৃশ্য তৈরি করে। মনে হয়, ইতিহাস আর ভবিষ্যৎ যেন একই শহরে পাশাপাশি বসবাস করছে।

খাবার, উৎসব ও মানুষের মিল
চীনের ভ্রমণ কেবল দর্শনীয় স্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার খাবার, উৎসব এবং মানুষের জীবনধারাও ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বেইজিংয়ের ধোঁয়া ওঠা জিয়াওজি, সিচুয়ানের ঝাল হটপট কিংবা সাংহাইয়ের শেংজিয়ানবাও—প্রথমে অচেনা মনে হলেও ধীরে ধীরে স্বাদের নতুন জগৎ খুলে দেয়। কোথাও কোথাও আবার আমাদের সমুচা, পুরি কিংবা ভাপা পিঠার সঙ্গে অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

চীনা বসন্ত উৎসবও আমাকে বিস্মিত করেছে। লাল লণ্ঠন, আতশবাজি, পরিবারের মিলন এবং শিশুদের লাল খামে উপহার দেওয়ার রীতি দেখে বারবার মনে হয়েছে—সংস্কৃতির ভাষা আসলে মানুষের হৃদয়ের ভাষা। ঈদ, পূজা কিংবা লুনার নিউ ইয়ার—উৎসবের আনন্দের আবেগ সর্বত্রই এক।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক আজ কেবল কূটনীতি বা অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও দিন দিন গভীর হচ্ছে।

চীন যেভাবে ঐতিহ্য, প্রযুক্তি ও পর্যটনকে একসঙ্গে যুক্ত করে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে, তা বাংলাদেশের জন্যও অনুসরণীয় হতে পারে। সুন্দরবন, কক্সবাজার, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, ষাট গম্বুজ মসজিদ কিংবা বান্দরবানের মতো সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে বিশ্বপর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

শেষকথা
চীনের এই দীর্ঘ ভ্রমণ আমাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে—ভ্রমণ মানে শুধু নতুন কোনো দেশ দেখা নয়; ভ্রমণ মানে অন্য একটি সংস্কৃতির আলোয় নিজের দেশকে নতুন করে চিনে নেওয়া।

ভাষা, খাদ্য কিংবা জীবনযাত্রায় পার্থক্য থাকলেও মানুষ হিসেবে আমাদের অনুভূতি, পরিবারপ্রেম, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উৎসবের আনন্দ একই। সেই মিলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ ও চীনের সাংস্কৃতিক বন্ধনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক: শিক্ষার্থী, বেইজিং জিয়াওথং ইউনিভার্সিটি

[email protected]