তাইওয়ানকে নতুনভাবে দেখার অনন্য যাত্রা

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল
  • খাদিজা পারভিন

তাইওয়ানের প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ‘হুয়ানদাও (Huandao)’ সাইকেলপথ ঘিরে দেশি-বিদেশি ভ্রমণকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। স্থানীয়দের কাছে এটি বহুদিন ধরেই জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি পর্যটকেরাও এই যাত্রায় অংশ নিয়ে দ্বীপটির প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ রূপ আবিষ্কার করছেন।

হুয়ানদাও’, যার অর্থ ‘দ্বীপ ঘুরে আসা’। সাধারণত তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেই থেকে শুরু হয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে পুরো দ্বীপ প্রদক্ষিণ করে আবার তাইপেইতে ফিরে আসে। প্রায় এক হাজার কিলোমিটারের এই পথ পাড়ি দিতে সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে। পথে সাইকেল আরোহীরা উত্তরাঞ্চলের পাথুরে উপকূল, পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ঘেরা সমুদ্রপথ, দক্ষিণের সাদা বালুর সৈকত এবং পশ্চিমাঞ্চলের ব্যস্ত নগরজীবনের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।

তাইওয়ানের অনেক শিক্ষার্থী স্কুলজীবন শেষে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে এই যাত্রা সম্পন্ন করেন। দেশটির মানুষের কাছে এটি কেবল একটি ভ্রমণ নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য এবং নিজের দেশকে কাছ থেকে জানার প্রতীক। তাইপেইয়ের সাইক্লিস্ট ইথান জানান, তিনি চারবারের বেশি এই যাত্রা সম্পন্ন করেছেন। তার ভাষায়, প্রতিবারই নতুন কোনো দৃশ্য, নতুন কোনো মানুষ কিংবা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে থাকে।

২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আইল্যান্ড এটুড’(Island Etude) চলচ্চিত্রে এক শিক্ষার্থীর সাইকেলে পুরো তাইওয়ান ঘুরে দেখার গল্প ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর থেকেই ‘হুয়ানদাও’ তরুণদের মধ্যে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ প্রবণতার ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে তাইওয়ান সরকার পুরো পথটিকে ‘তাইওয়ান সাইকেল রুট নং ১’ (Taiwan Cycle Route No. 1) হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং সাইকেলবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলে।

এই যাত্রার অন্যতম আকর্ষণ পূর্বাঞ্চলের নিরিবিলি উপকূল, যেখানে তাইওয়ানের আদিবাসী জনগোষ্ঠী—আমিস, ত্রুকু ও পুয়ুমা—এখনো তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ছোট ছোট গ্রাম, কাঠের টোটেম, স্থানীয় খাবার এবং পারিবারিক অতিথিশালাগুলো পর্যটকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করছে।

স্থানীয় মানুষের আন্তরিক আচরণও ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করছে। কেউ সাইকেলের চাকা মেরামতে সাহায্য করছেন, কেউ থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন, আবার কেউ নিজের হাতে রান্না করা খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের সমন্বয়ে ‘হুয়ানদাও’ এখন বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় সাইকেল রুটে পরিণত হয়েছে। ধীরে ধীরে পথচলা এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়েই এই যাত্রার প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করা সম্ভব। তাইওয়ানের এক ভ্রমণকারী ডরিস কুয়কের ভাষায়, “তাইওয়ান এতটাই সুন্দর যে, তাড়াহুড়ো করে দেখার কোনো অর্থ নেই; সময় নিয়ে দেখাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।