১৮ নভেম্বর ২০১৯

নতুন করে অনুমোদন পেল আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

১০৫টির মধ্যে একাডেমিক কার্যক্রম ৯৫টিতে
-

নতুন আরো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি’। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করবে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ নিয়ে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১০৫টি। বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্যোক্তা হিসেবে আছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী শিক্ষাবিদ ড. মোয়াজ্জেম হোসেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া প্রায় সব ক’টির বিরুদ্ধে রয়েছে আইনের শর্ত লঙ্ঘন, শিক্ষাবাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা একাধিক সভায় নতুন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন না দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এসব পরামর্শের কোনো মূল্যই দেয়া হচ্ছে না অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ এর ৩৬ ধারা অনুযায়ী ২৩ শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আইনের ৭ এর ১ ও ২ ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের নিজস্ব বা ভাড়া করা ভবন, অন্তত তিনটি অনুষদ ও ছয়টি বিভাগ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, ছাত্রছাত্রীদের জন্য কমন রুম, সেমিনার কক্ষসহ পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকতে হবে। সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া বিভাগ খোলা যাবে না। শর্তানুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক পূর্ণকালীন শিক্ষক থাকতে হবে। চ্যান্সেলরের (রাষ্ট্রপতি) পূর্ব অনুমোদন ছাড়া বিদেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা যাবে না। আরোপিত শর্তগুলোর ওপর ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
সর্বশেষ অনুমোদন দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়টিসহ দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াবে ১০৫টি। এটি দ্বিতীয়। সর্বশেষ ( টানা তৃতীয় দফার মেয়াদে) দফায় গত ৩১ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ক্ষমতা গ্রহণের পর অনুমোদন দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি হচ্ছে দ্বিতীয়। অর্থাৎ গত ৮ মাসে অনুমোদন পেল দু’টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদসহ গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চলছে ৯৫টিতে। সর্বশেষটিসহ অনুমোদন পাওয়া ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটির উদ্যোক্তা হচ্ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ঘরানা।
এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এমপি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এমপি নজরুল ইসলাম বাবু, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম, এ এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী, সিলেটের গোলাপগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ইকবাল আহমেদ চৌধুরী, সরকার দলীয় এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দার, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সাবেক সদস্য অধ্যাপক দুর্গাদাস ভট্টাচার্য, ব্যবসায়ী জয়নুল হক সিকদার, সাবেক আইনমন্ত্রী এবং এমপি আবদুল মতিন খসরু, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদ্য নির্বাচিত মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, বি এম শামসুল হক, কাজী রফিকুল আলম, ড. এম জুবায়েদুর রহমানসহ আরো কয়েকজন নেতা ও ব্যবসায়ী বিভিন্ন নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেয়েছেন। এ ছাড়া পুরনো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদারসহ কয়েকজন যুক্ত হয়েছেন।
একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগই আইনের শর্ত মেনে চলছে না বলে অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেরই (ইউজিসি)। ইউজিসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০টির বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যান্সেলরের নিয়োগ করা ভিসি নেই, প্রোভিসি নেই ৭০টিতে। বারবার সময় দিয়েও পুরোনো ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গভাবে নিজস্ব ক্যাম্পাসে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করছে। সব মিলিয়ে নিয়মের মধ্যে চলছে মাত্র ১০-১ টি বিশ্ববিদ্যালয়। বাকিগুলোর বিরুদ্ধে রয়েছে শিক্ষাবাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়ায় বেসরকারি পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা ঘিরে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে সনদ বাণিজ্যেরও। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যখন কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া উচিত, তখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। এসব অনুমোদনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রাধান্য। এতে অবৈধ মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যই মুখ্য।

 


আরো সংবাদ